বিএনপি দুর্নীতিগ্রস্ত হলে তাদের ২ নেতা পদত্যাগ করেননি কেন

ময়মনসিংহে তারেক রহমানের প্রশ্ন

Printed Edition
first-2
ময়মনসিংহ সার্কিট হাউজ মাঠে বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখেন তারেক রহমান : নয়া দিগন্ত

ময়মনসিংহ অফিস

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ময়মনসিংহের জনসভায় বলেছেন, একটি দল স্বৈরাচারী ভাষায় বিএনপির বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত মিথ্যাচার করে যাচ্ছে। তারা বলে আমরা নাকি দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন। অথচ বিএনপি সরকারের সময়ে তাদেরই দু’জন নেতা মন্ত্রিসভায় ছিলেন। আমরা যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হতাম, তবে তারা তখন পদত্যাগ করলেন না কেন? আসলে তাদের কোনো রাজনৈতিক জনভিত্তি নেই বলেই তারা মিথ্যাচারের আশ্রয় নিচ্ছে। বিএনপি চেয়ারম্যান আরো বলেন, ভোটাধিকার হরণ করে কোনো সরকার বৈধ থাকতে পারে না। জনগণের রায় ছাড়া রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা দেশের গণতন্ত্র ও সংবিধানের প্রতি চরম অবজ্ঞা।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টায় ময়মনসিংহ সার্কিট হাউজ মাঠে বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। ২৫ মিনিটের বক্তব্যে তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং আগামী নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

বক্তব্যের শুরুতেই তারেক রহমান মানুষের মৌলিক অধিকারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘মানুষের কথা বলার অধিকার তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে যখন তাদের ভোটের অধিকার নিশ্চিত হবে। বিগত ১৭ বছর এ দেশের মানুষ ভোট দিতে পারেনি। দিনের ভোট রাতে হয়েছে। দেশের মানুষ আজ একজন যোগ্য অভিভাবক চায়, যারা তাদের সন্তানদের সুশিক্ষিত করবে এবং বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে।’ এর আগে বিকেল সাড়ে ৩টায় তারেক রহমান মঞ্চে উঠলে মুহুর্মুহু করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে সমাবেশস্থল। এ সময় হাত নেড়ে নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছার জবাব দেন তিনি।

সারা দেশে নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে দুপুরে সড়কপথে ময়মনসিংহ পৌঁছান তিনি, তার সাথে রয়েছেন সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান। ২০০৩ সালের পর দীর্ঘ ২২ বছর পর এদিন ময়মনসিংহ সফরে এলেন তিনি।

এ নির্বাচনী সমাবেশ ঘিরে ময়মনসিংহ উত্তর ও দক্ষিণ জেলা, মহানগরের বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে নেতাকর্মী-সমর্থকরা মিছিল নিয়ে আসেন সমাবেশে। এর বাইরে জামালপুর, নেত্রকোনা ও শেরপুর থেকে বাসে করে বিপুল সংখ্যক দলীয় নেতাকর্মী এসেছেন। বেলা আড়াইটার পর সার্কিট হাউজ মাঠ কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। সমাবেশে ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪টি আসনের ধানের শীষের প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

ময়মনসিংহ ও জামালপুর অঞ্চলের সুনির্দিষ্ট সমস্যাগুলো তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, এই এলাকায় দীর্ঘদিন কোনো উন্নয়ন হয়নি। বিশেষ করে যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কৃষি খাতে স্থবিরতা নেমে এসেছে। তিনি ঘোষণা করেন, এ অঞ্চলে মাছ চাষকে শিল্পে রূপান্তর করা হবে যাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। কৃষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাদেরকে সরাসরি সেবা দিতে ‘কৃষি কার্ড’ দেয়া হবে। এর মাধ্যমে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই কৃষক সরাসরি সরকারি সার, বীজ ও কৃষি উপকরণ হাতে পাবেন। জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচির কথা মনে করিয়ে তিনি বলেন, কৃষির পানির অভাব দূর করতে খাল পুনর্খনন করা হবে। তিনি স্লোগান দিয়ে বলেন, ‘নির্বাচনের পর আপনারা কোদাল ধরলে আমিও আপনাদের সাথে থাকব।’

নারীদের বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া মেয়েদের প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। আমরা সেই ধারা বজায় রেখে নারীদের অভাব অনটন দূর করার জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করব, যা প্রতিটি পরিবারের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মাদকের অভিশাপ থেকে যুবসমাজকে বাঁচাতে হলে কর্মসংস্থান জরুরি। আমরা আইটি সেক্টরে ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করব যাতে আমাদের তরুণরা ঘরে বসেই বিশ্ব জয় করতে পারে।

স্বাস্থ্যসেবা ও মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, জেলা হাসপাতালের ওপর চাপ কমাতে ইউনিয়ন পর্যায়ে পল্লী চিকিৎসকদের মাধ্যমে উন্নত সেবার ব্যবস্থা করা হবে। শিশু ও মা-বোনদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ঘরে ঘরে হেলথকেয়ার সেবা পৌঁছে দেয়া হবে। এ ছাড়াও তিনি ঘোষণা করেন, ক্ষমতায় এলে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের সেবায় নিয়োজিত ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনদের বিশেষ প্রশিক্ষণ ও সম্মানজনক বেতনের ব্যবস্থা করবে বিএনপি সরকার।

তারেক রহমান আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪ জন বিএনপি প্রার্থীকে ধানের শীষ মার্কায় ভোট দিয়ে বিজয়ী করার আহ্বান জানান। ভোটারদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ভোট শুরুর আগে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে এলাকার মানুষকে সাথে নিয়ে ফজর বাদ ভোটকেন্দ্রে যাবেন। শুধু ভোট দিয়ে চলে আসলে হবে না। বিগত দিনে আমাদের ভোট লুটপাট হয়েছে। তাই এবার ভোট দিয়ে কেন্দ্র পাহারা দিতে হবে। বিজয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্র ছাড়া যাবে না।

ময়মনসিংহের সার্কিট হাউজ ময়দানে দেয়া ভাষণের শেষ অংশে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, আর ২০২৪ সালে স্বৈরাচারকে বিদায় করে জনগণ সেই স্বাধীনতা রক্ষা করেছে। এখন সময় দেশ গড়ার। ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’-এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে আমরা সব ধর্ম-বর্ণের মানুষকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যাবো।

ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জাকির হোসেন বাবলুর সভাপতিত্বে সমাবেশ পরিচালনা করেন বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবু ওয়াহাব আকন্দ, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব রোকনুজ্জামান সরকার, উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদার। এতে বক্তব্য রাখেন, কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্স, রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শরিফুল আলম, বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, সাংগঠনিক সম্পাদক (ময়মনসিংহ বিভাগ) অ্যাডভোকেট ওয়ারেছ আলী মামুন, শেরপুর জেলা বিএনপির আহবায়ক সিরাজুল ইসলাম, ময়মনসিংহ, উত্তর জেলা বিএনপির আহবায়ক অধ্যাপক এনায়েত উল্লাহ কালাম, মহানগর বিএনপির আহবায়ক অধ্যাপক এ কে এম শফিকুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সম্পাদক নিলুফার ইয়াসমিন মণি, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আরিফা জেসমিন, সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আফজাল এইচ খানসহ ২৪ আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থীরা।