জনতার স্র্রোত নীরব শোক

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

ঢাকার আকাশে সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়ার আগেই যেন শহরটি তার রাস্তা ছেড়ে দিয়েছিল শোকার্ত জনতার হাতে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে শাহবাগ পর্যন্ত লাখ লাখ মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে- কোনো স্লোগান নেই, কোনো চিৎকার নেই, শুধু ধীর পায়ে চলা এক গভীর নীরবতা। এ নীরবতা ছিল এমন, যা শব্দের চেয়েও বেশি কথা বলে। এটি কেবল একটি জানাজা নয়, ছিল রাজপথে লেখা এক মানবিক গল্প।

শহীদ শরিফ ওসমান হাদির লাশ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল, আর চারপাশে মানুষের শোক যেন নদীর মতো বইছিল। বৃদ্ধরা পাঞ্জাবির কোনায় চোখ মুচছিলেন। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে নারীরা হাত তুলে চোখ বন্ধ করে দোয়া করছিলেন। চিরচেনা কোলাহলের ঢাকা যেন থমকে গিয়েছিল। হাদি ছিলেন প্রতিবাদের প্রতীক, কারো কাছে আশার নাম, আবার কারো কাছে নিছক সাহস। মৃত্যু সব পার্থক্য মুছে দেয়।

সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার কাছে এক রিকশাচালক মাঝ রাস্তায় রিকশা ফেলে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। তিনি ফিসফিস করে বললেন, ‘আমি তার রাজনীতি বুঝি না, কিন্তু এত মানুষ এমনি এমনি বের হয় না।’ পাশে এক চা-দোকানি বিনা পয়সায় চা বিলাচ্ছিলেন। বললেন, ‘আজ বেচাকেনার দিন না, আজ দোয়ার দিন।’

জানাজা শেষে ভিড়ের শেষ দেখা যাচ্ছিল না। নামাজ শেষ হতেই ভেসে এলো একধরনের শব্দ-না তালি, না স্লোগান বরং চাপা কান্নার গুঞ্জন। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষরাও নির্বিকারভাবে কাঁদছিলেন। তরুণ কর্মীরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরছিলেন, যেন তারা কেবল একজন নেতাকেই নয়, নিজেদের নিরাপত্তাবোধকেও হারাচ্ছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যাত্রা ছিল আরো তাৎপর্যপূর্ণ ইতিহাসে ভারী এক স্থান। অ্যাম্বুলেন্স ক্যাম্পাসে ঢুকতেই চুপ হয়ে গেল সব কোলাহল। হাদির এ অসময়ে চলে যাওয়া কেউ মেনে নিতে পারছিল না।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিসৌধের পাশে কবর প্রস্তুত ছিল, লাখো জনতার অশ্রুস্্েরাতে শেষ বিদায় ছিল আরো করুণ। ভিড়ের মধ্যে এক মা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, তারপর লুটিয়ে পড়লেন। অপরিচিত মানুষ ছুটে এসে তাকে ধরলেন। সেই মুহূর্তে শোকের কোনো পরিচয় ছিল না-তা সবার হয়ে গিয়েছিল।

ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় একটি গুলিতে ওসমান হাদির জীবন থেমে যায়। কিন্তু তার মৃত্যু দেখিয়ে দেয় আরো গভীর কিছু-এই শহর এখনো একসাথে অনুভব করতে জানে, নির্দেশ ছাড়াই একসাথে হাঁটতে পারে, রাজনীতির কোলাহলের নিচেও এখনো মানবিক। সন্ধ্যা নামলে মানুষ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। রাস্তা ফাঁকা হয়, কিন্তু ভারটা থেকে যায়। ঢাকা আবার চলতে শুরু করে- কিন্তু আর আগের মতো থাকে না। এক দীর্ঘ বিকেলে শহরটি মনে করে নেয়, কীভাবে একসাথে শোক করতে হয়।

কিছু জিজ্ঞাসা : জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হাদিকে সামনে নিয়ে আসে। নেতৃত্ব নয়, দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকেই জন্ম নেয় ‘ইনকিলাব মঞ্চ’- কোনো দল নয়, কোনো ক্ষমতার সিঁড়ি নয়, বরং একটি অবস্থান। ‘আমরা ক্ষমতা চাই না, আমরা ইনসাফ চাই’- এটাই ছিল তার কথা। জাতীয় নাগরিক কমিটিতে যুক্ত হলেও দলীয় রাজনীতিতে নিজেকে আটকে রাখেননি। জাতীয় নাগরিক পার্টিতে যোগ না দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন- তার লড়াই চেয়ার নয়, চেতনার। হাদি কখনো মাঝামাঝি অবস্থানে থাকেননি। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, রাষ্ট্র সংস্কার-সব প্রশ্নে তিনি ছিলেন স্পষ্ট। ভারতীয় আধিপত্যবাদ, সীমান্ত হত্যা, শাপলা চত্বর, পিলখানা- যেখানে অন্যরা নীরব, সেখানে হাদি উচ্চকণ্ঠ। এই উচ্চকণ্ঠই তার বিপদ হয়ে দাঁড়ায়।

গত সেপ্টেম্বর থেকে তিনি নিয়মিত হত্যার হুমকি পেতে থাকেন। ৩০টির বেশি নম্বর। শুধু তাকেই নয়-তার পরিবারকে হেনস্থা, ঘর পুড়িয়ে দেয়ার ভয়। বন্ধুদের অনেকে বলেছিলেন, ‘কিছুদিন চুপ থাকো।’ হাদি হেসে বলেছিলেন, ‘চুপ থাকলে তো ওরাই জিতে যাবে।’ শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু একটি নামের মৃত্যু নয়। এটি একটি প্রশ্ন রেখে যাওয়া- কেন একজন তরুণকে এভাবে মরতে হয়? কেন হুমকি জানা থাকার পরও নিরাপত্তা আসে না? আর কেন সত্য বলা এখনো বিপজ্জনক? তার সহযোদ্ধারা বলেন, ‘হাদি চলে গেছে, কিন্তু জুলাই তো রয়ে গেছে।’ আজ রাজপথে কেউ যখন বলে-‘জান দেবো, জুলাই দেবো না’ তখন সেটি আর শুধু স্লোগান নয়। ওটি একটি মানুষের জীবন।