দলীয় নির্বাচনী ইশতেহার

যুক্তরাজ্যের আদলে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ গড়ে তুলতে চায় বিএনপি

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)-এর আদলে বাংলাদেশে একটি সর্বজনীন, রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। দলটির দাবি, ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির ভিত্তিতে কল্যাণরাষ্ট্রের মডেল অনুসরণ করে প্রতিটি নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে ও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে।

বিএনপির ঘোষিত ‘রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা রূপরেখা’-এর ২৬তম ধারায় স্বাস্থ্য খাতের এই সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। এতে স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে সর্বজনীন কাভারেজ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে কাঠামোগত ব্যর্থতার অভিযোগ : বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়েও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয়নি। চিকিৎসাশিক্ষা পরিকল্পনাহীন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা অদক্ষ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মানের সাথে আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে।’

তিনি বলেন, দেশে সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের বড় অংশ আজও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হচ্ছে। এতে প্রতি বছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।

ড. মোশাররফ অভিযোগ করেন, গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি, প্রশাসনিক দুর্বৃত্তায়ন ও দলীয়করণের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাত কার্যত কুক্ষিগত করা হয়েছে। এর ফলে চিকিৎসক-রোগী সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে, হাসপাতালগুলোতে আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বর্তমান স্বাস্থ্য নীতিমালায় কেবল রেজিস্টার্ড চিকিৎসকদের কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে দেশের ঐতিহ্যবাহী ইউনানি, আয়ুর্বেদিক, হোমিওপ্যাথিক, কবিরাজি ও ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন ব্যবস্থা অবহেলিত রয়েছে। বিএনপির প্রস্তাবনায় এসব চিকিৎসাব্যবস্থার আধুনিকায়ন, গবেষণা ও মাননিয়ন্ত্রণে সমান গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

তিন ধাপে স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের রূপরেখা : বিএনপির প্রস্তাবনায় স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার পরিকল্পনাকে তিন ধাপে ভাগ করা হয়েছে-

স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা (১-৩ বছর) : গ্রামীণ স্বাস্থ্য সহকারী ও পল্লী চিকিৎসা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও মানোন্নয়ন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে কার্যকর প্রাথমিক রেফারেন্স সেন্টারে রূপান্তর, পরিকল্পিত পরিবার ও জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা জোরদার, প্রত্যেক নাগরিককে একজন সরকারি রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের অধীনে রাষ্ট্রীয় খরচে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, জেলা হাসপাতাল ও বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, কার্যকর রেফারেন্স ও রেফারাল সিস্টেম বাস্তবায়ন, ২৪ ঘণ্টার স্বাস্থ্য হেল্পলাইন, জরুরি চিকিৎসা, দুর্ঘটনা-পরবর্তী সেবা ও দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু, রোগী ও সেবা প্রদানকারীর অধিকার ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে সমতাভিত্তিক স্বাস্থ্য আইনপ্রণয়ন এবং চিকিৎসক-রোগী সম্পর্ক উন্নয়নে সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে জবাবদিহিমূলক কাঠামো বিনির্মাণ।

মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা (১-৫ বছর) : সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা ও প্রতিরোধে বিশেষায়িত কেন্দ্র স্থাপন, চিকিৎসাশিক্ষা, গবেষণা ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন, মেডিক্যাল কলেজ ও নার্সিং ইনস্টিটিউটের মানোন্নয়ন, ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড ও ই-হেলথ সিস্টেম চালু করা।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা (১০ বছর পর্যন্ত) : স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশে উন্নীত করা, দারিদ্র্যবিমোচন না হওয়া পর্যন্ত সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিস্তৃত সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী, প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত নারী-পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য এবং বার্ধক্যজনিত রোগে রাষ্ট্রীয় সহায়তা জোরদার এবং কল্যাণরাষ্ট্রের পথে স্বাস্থ্য খাতকে ভিত্তি করার অঙ্গীকার।

বিএনপির নেতারা দাবি করেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে কল্যাণরাষ্ট্রভিত্তিক সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হবে। এতে স্বাস্থ্যসেবাকে আর পণ্য নয়; বরং নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

দলটির মতে, যুক্তরাজ্যের এনএইচএস মডেলের মতো রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন ও সার্বজনীন কাভারেজ নিশ্চিত করা গেলে স্বাস্থ্য খাতে বৈষম্য কমবে, বিদেশমুখী চিকিৎসানির্ভরতা হ্রাস পাবে এবং জনগণের জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।