ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ

তারেকের মালয়েশিয়া সফরের ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে চীন সফরে রয়েছেন। কিন্তু দেশের চায়ের দোকান থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম- সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মালয়েশিয়া সফর। বিশেষ করে, সফরকে ঘিরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি ২ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের ভিডিও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আনোয়ার ইব্রাহিমের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওটির পটভূমিতে বাজছিল জনপ্রিয় বাংলা গান “আমার বন্ধু মহা জাদু জানে”। এতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দেয়া উষ্ণ অভ্যর্থনা, দুই নেতার আন্তরিকতা এবং পুত্রজায়ার পারদানা পুত্র ভবনে লালগালিচা সংবর্ধনার দৃশ্য তুলে ধরা হয়। একই সাথে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকার বিষয়ে আনোয়ার ইব্রাহিমের বক্তব্যও এতে স্থান পায়।

সফর শেষে প্রকাশিত ৩৩ দফার যৌথ বিবৃতিতে শ্রম, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, শিক্ষা ও আঞ্চলিক সহযোগিতাসহ ৯টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার ছিল মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ফের চালু করা। বৈঠকে তারেক রহমান শ্রমবাজার আবার উন্মুক্ত করা, অভিবাসন ব্যয় কমানো, নিয়োগ সিন্ডিকেটের প্রভাব দূর করা এবং নথিবিহীন বাংলাদেশী শ্রমিকদের বৈধতার আওতায় আনার অনুরোধ জানান। জবাবে আনোয়ার ইব্রাহিম শ্রমিক শোষণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। উভয় দেশ শ্রম সহযোগিতাসংক্রান্ত বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক সংশোধন এবং নতুন কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে দ্রুত যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়।

তবে সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য সম্ভবত ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রেই। মালয়েশিয়া প্রকাশ্যে বাংলাদেশের আসিয়ান ‘সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার’ হওয়ার প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানিয়েছে। পাশাপাশি রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) যোগদানের ক্ষেত্রেও ঢাকার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কাঠামোর সাথে বাংলাদেশের গভীরতর সংযুক্তির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

রোহিঙ্গা সঙ্কটেও মালয়েশিয়া বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য আসিয়ান ও আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোকে সক্রিয়ভাবে ব্যবহারের আশ্বাস দিয়েছে কুয়ালালামপুর। একই সাথে ফিলিস্তিন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানবপাচার প্রতিরোধের মতো বৈশ্বিক ইস্যুতে জাতিসঙ্ঘ ও ওআইসিতে যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

শিক্ষা, গবেষণা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, পর্যটন এবং মেডিক্যাল ট্যুরিজম খাতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া সাংস্কৃতিক বিনিময়, বিনিয়োগ, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে একাধিক সমঝোতা ও নোট বিনিময় সম্পন্ন হয়েছে। দুই দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করতে একটি যৌথ কমিটি গঠন এবং ‘প্রতিরক্ষা রোডম্যাপ’ প্রণয়নের বিষয়েও একমত হয়েছে। সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের এই সংক্ষিপ্ত সফর ছিল কেবল একটি সৌজন্য সফর নয়; বরং শ্রমবাজার, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের নতুন অগ্রাধিকারের একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি হয়তো সফরের জনকূটনৈতিক সাফল্যের প্রতীক, কিন্তু এর প্রকৃত গুরুত্ব নিহিত রয়েছে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ককে নতুন কৌশলগত উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার মধ্যে। এখন দেখার বিষয়, ঘোষণাগুলো কত দ্রুত বাস্তব অগ্রগতিতে রূপ নেয় এবং এই ‘মহা জাদু’ বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে কতটা কার্যকর প্রমাণিত হয়।