শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হঠাৎ নজিরবিহীন অস্থিরতায় বিব্রত সরকার

Printed Edition

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল

দেশব্যাপী তীব্র জ্বালানি সঙ্কট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জুলাই সনদ ও গণভোট ইস্যুতে রাজপথে বিরোধীদের আন্দোলন ও প্রশাসনিক নানা সংস্কারের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার মধ্যেই হঠাৎ করে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শুরু হয়েছে নজিরবিহীন অস্থিরতা। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারকে চরম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, যখন দেশ একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার চেষ্টা করছে, তখন ক্যাম্পাসে এই অস্থিতিশীলতা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে। ছাত্রদল অভিযোগ করছে, দীর্ঘ সময় ধরে আত্মগোপনে থাকা ছাত্রশিবির এখন হঠাৎ করেই ‘আক্রমণাত্মক’ ভঙ্গিতে ক্যাম্পাস দখল করতে চাইছে। অন্য দিকে ছাত্রশিবিরের দাবি, ছাত্রদল ‘ফ্যাসিস্ট’ আমলের কায়দায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর খবরদারি করছে। আদর্শিকভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়ে সরকারের নির্দেশেই ছাত্রদল ক্যাম্পসগুলোতে আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

এ দিকে শিক্ষাঙ্গনে এই হঠাৎ অস্থিরতায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে ‘রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস’ বা ‘সুস্থ রাজনীতি’র দাবি তুলছেন। যদিও বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতারা শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে মাঠ পর্যায়ে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যেকার এই মুখোমুখি অবস্থান ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলেছে। প্রশাসন বলছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

সূত্র মতে দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে একসাথে গত আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে ছাত্রদল ও ছাত্র শিবির। ’২৪-এর জুলাই গণ-অভূত্থানেও সংগঠন দু’টির ভূমিকা ছিল লক্ষণীয়। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দূরত্ব বাড়ে। তবে বিএনপি সরকার গঠন করার দুই মাস পর সেই দূরত্ব যেন যোজনযোজন দূরত্বে রূপ নিতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন ক্যাম্পসে ছাত্রদলের দ্বারা শিবিরের একাধিক নেতা মারাত্মকভাবে জখম হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সবশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

জানা গেছে, মূলত আধিপত্য বিস্তার, দেয়াল লিখন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অপরের বিরুদ্ধে সমালোচনার জেরে এই সঙ্ঘাতের সূত্রপাত হয়। এর ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর অন্তত পাঁচটি বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। গত ২১ এপ্রিল চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে দুই ছাত্র সংগঠনের মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষ ঘটে। দেয়ালের গ্রাফিতিতে ‘ছাত্র রাজনীতি’ শব্দটির পরিবর্তে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ লেখাকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনার শুরু হয়। এতে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাদের ধারালো অস্ত্র ও লাঠির ব্যবহার করতে দেখা যায়। যদিও ছাত্রদল বলছে, মিডিয়ায় দেখানো ধারালো অস্ত্র তাদের নয়। চট্টগ্রামের ঘটনার রেশ ধরে গত ২৩ এপ্রিল রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শাহবাগ থানার ভেতরেই ডাকসুর দুই নেতাকে বেদম মারধর করা হয়। ঘটনার সংবাদ সংগ্রহে গেলে অন্তত দশজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন বলে খবরে প্রকাশ। রাজধানীর ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ শাহবাগ থানার ভেতরে পুলিশের উপস্থিতিতে এমন হামলার ঘটনায় অনেকটাই বিব্রত সরকারি দল বিএনপি। ফেসবুক পোস্ট এবং দেয়াল লিখনকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছিল। এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগের পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজেও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ছাত্রদল ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে। অন্য দিকে রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি সরকারি কলেজে পরীক্ষা চলাকালে ভাঙচুর এবং নারী শিক্ষিকার সাথে অশোভন আচরণের অভিযোগে স্থানীয় এক বিএনপি নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

সূত্র মতে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানাপড়েন চলছিল। তবে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে গত সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কক্ষ দখলকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সংঘর্ষের পর। এরপর সেই আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে দেশের অন্যান্য প্রান্তে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম সিটি কলেজ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর ছাত্রদলের হামলার ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, ক্যাম্পাসগুলোতে দীর্ঘ দিনের ‘লেজুড়বৃত্তি’ রাজনীতির অবসান ঘটবে বলে আশা করা হলেও, এখন আবার আধিপত্য বিস্তারের পুরনো খেলা শুরু হয়েছে।

বিএনপির একাধিক নেতার সাথে আলাপে জানা গেছে, সরকারি দল হিসেবে বিএনপি এখন দ্বিমুখী চাপে রয়েছে। এক দিকে দলের অঙ্গসংগঠন ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের শান্ত রাখা, অন্য দিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করছেন, এই অস্থিরতা কেবল ছাত্র রাজনীতির ক্ষমতার লড়াই নয়। এর পেছনে পরাজিত শক্তির হাত থাকতে পারে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে, অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে সরকারকে অকার্যকর প্রমাণ করার একটি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় চক্রান্ত কাজ করছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এই অস্থিরতা কেবল ছাত্র রাজনীতির কোন্দল নয়, এটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্পষ্ট বলতে চাই, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, কোনো ছাড় দেবেন না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্ত্রধারী বা বিশৃঙ্খলাকারীর ঠাঁই নেই।

বিএনপির প্রভাবশালী স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, এই সংঘর্ষের ফলে জনমনে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে, যা সরকারকে বিব্রত করছে। ক্ষমতায় আসার পরপরই এ ধরনের ঘটনা আমাদের ইমেজের ক্ষতি করছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে আছে। আমাদের নেতাকর্মীদের বুঝতে হবে, এখন আমরা বিরোধী দল নই, আমরা সরকারে। আমাদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। কেউ যদি দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি বা হলে সিট বাণিজ্য বা দখল নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়ায়, তাদের চিহ্নিত করে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে।

জামায়াতে ইসলামীর নেতারা বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে দায়ী করে বলছেন, আমরা রাজপথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছি একটি বৈষম্যহীন দেশের জন্য। কিন্তু আজ ক্যাম্পাসে আমাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের ওপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা যেভাবে বর্বরোচিত হামলা চালাচ্ছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। সর্বত্রই ছাত্রদল একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। তারা দিনে-দুপুরে অস্ত্র নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। দলটির নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছে, সরকার যদি মনে করে প্রশাসনকে ব্যবহার করে বা ভয় দেখিয়ে বিরোধী কণ্ঠস্বর চেপে ধরবে, তবে তারা ভুল করছে।

এ দিকে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এবং অন্যান্য বিরোধী ছাত্র শক্তিগুলোও ছাত্রদলের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, বিএনপি সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেয়ে ‘দখলদারিত্ব’ নিশ্চিত করতে বেশি আগ্রহী। একটি বামপন্থী দলের নেতা বলেন, আমরা দেখছি এক ফ্যাসিস্টের বিদায় হয়েছে অন্য এক ফ্যাসিস্টকে জায়গা করে দিতে। ক্যাম্পাসে যে অস্থিরতা সরকারের যেন মাথা ব্যথা নেই।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নয়া দিগন্তকে বলেন, পরাজিত শক্তি দেশকে আবারো অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যেতে চায়। দীর্ঘ দেড় দশকের দুঃশাসন শেষে দেশ যখন গণতন্ত্রের পথে হাঁটছে, যখন সাধারণ মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে, তখনই একটি চক্র শিক্ষাঙ্গনকে অশান্ত করে তুলছে। তিনি বলেন, বিএনপি সরকার কোনো অস্থিতিশীলতা সহ্য করবে না। ছাত্রদলকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তারা যেন কোনো উসকানিতে পা না দেয়। কিন্তু কেউ যদি গুপ্ত রাজনীতির আড়ালে ক্যাম্পাসের সার্বভৌমত্ব নষ্ট করতে চায়, তবে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।

বিশিষ্টজনরা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এই অস্থিরতা বিএনপির জন্য কেবল একটি আইনশৃঙ্খলা জনিত সমস্যা নয়, বরং এটি তাদের রাজনৈতিক অগ্নিপরীক্ষা। জনগণের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তারা যদি ক্যাম্পাসগুলোতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারে, তবে দীর্ঘ লড়াইয়ের ফসল হিসেবে পাওয়া জনসমর্থন হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রদলের কর্মকাণ্ড নিয়ে সৃষ্টি হওয়া ক্ষোভ যদি সরকার প্রশমিত করতে না পারে, তবে অচিরেই রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। সরকার এখন কঠোরভাবে পরিস্থিতি দমনের পথে হাঁটবে নাকি আলোচনার মাধ্যমে সব ছাত্র সংগঠনের মধ্যে একটি ঐকমত্য তৈরি করবে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।