সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়ে মিশ্র আচরণে গত সপ্তাহের পুঁজিবাজার

নতুন বছরের প্রথম দিনের বাজার আচরণকে খুবই ইতিবাচক মনে করছেন বাজারের সবগুলো স্টেক হোল্ডার

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

নতুন বছরে সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়ে সূচকের মিশ্র আচরণে সপ্তাহ শেষ করেছে পুঁজিবাজার। দীর্ঘ দরপতনের পর বছরের প্রথম কার্যদিবসে পুঁজিবাজারে সূচক ও লেনদেন থেকে এই সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাচ্ছেন বিনিয়োগকারিরা। মোট চারটি কার্যদিবসের তিনটিকে সূচকের পতনের পর সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে বাজার সূচকের এ উত্থান সামনের দিনগুলোর জন্য ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে এমনটিই মনে করেন তারা। চলমান রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি পুঁজিবাজারের বর্তমান মূল্যস্তর বিবেচনায় রেখে বিনিয়োগকারীরা তাদের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

বিগত সপ্তাহে (২৭ ডিসেম্বর-১ জানুয়ারি) দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটি ২৭ দশমিক ০৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। রোববার ৪ হাজার ৮৮৩ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার সপ্তাহান্তে ৪ হাজার ৯১০ দশমিক ৬১ পয়েন্টে স্থির হয়। এক দিন সরকারি সাধারণ ছুটি ঘোষণার কারণে চার কার্যদিবেস প্রথম তিনটিতে সূচকের কমবেশি অবনতি ঘটলেও শেষ কর্মদিবসে তথা নতুন বছরের প্রথম দিন বাজারটিতে সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটে। তবে একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১৩ দশমিক ১৩ ও ২ দশমিক ৬৭ পয়েন্ট।

সপ্তাহের শেষ দিনের তথা নতুন বছরের প্রথম দিনের বাজার আচরণকে খুবই ইতিবাচক মনে করছেন বাজারের সবগুলো স্টেক হোল্ডার। তারা মনে করেন, এমনিতেই পুঁজিবাজার একটি পয়েন্ট থেকে টেক-অফের অপেক্ষায় ছিল। এবার হয়তো সে সময় এসেছে। সামনে বড় কোনো অঘটন না ঘটলে এ সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। গত ১ জানুয়ারির বাজার আচরণ বিশ্লেষণ করে তারা বলেন, দীর্ঘদিন মন্দা বাজারে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ বাজার থেকে হাত গুটিয়ে নেন। তারা অপেক্ষায় ছিলেন ভালো সময়ের। নতুন বছর তাদের অনেকেই বাজারে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এমন ইঙ্গিত দিলেন কয়েকটি ব্রোকার হাউজের নির্বাহীরা। কারণ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে একটি উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতে পারে। ওই সময় বিনিয়োগেও একই ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে পারে। এটি ঘটলে পুঁজিবাজার নতুন করে গতি ফিরে পাবে বলে মনে করেন তারা।

প্রধান সূচকটির উন্নতি ঘটলেও গত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনের কিছুটা অবনতি ঘটে। এ সময় বাজারটি এক হাজার ৪১৭ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ১ দশমিক ২১ শতাংশ কম। আগের সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। একইভাবে বাজারটির গড় লেনদেনেও ঘটে অবনতি। আগের সপ্তাহের ৩৫৮ কোটি টাকার স্থলে গত সপ্তাহে ডিএসইর গড় লেনদেন দাঁড়ায় ৩৫১ কোটি টাকা।

তবে এ সময় ডিএসইর বাজার মূলধনের কিছুটা উন্নতি ঘটে। ছয় লাখ ৭৬ হাজার ৮৭৩ কোটি মূলধন নিয়ে সপ্তাহ শুরু করা বাজারটির মূলধন সপ্তাহান্তে দাঁড়ায় ছয় লাখ ৮০ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা। এতে ডিএসই মূলধনে যোগ হয়েছে তিন হাজার ৯০৬ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি। তবে এ ক্ষেত্রে বড় অবদান ছিল শেষ কর্মদিবসে ব্যাংকিং খাতের বেশ কয়েকটি কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি। ওই দিন ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ দশে জায়গা করে নেয় ব্যাংকিং খাতের বেশ কয়েকটি কোম্পানি, যা ওই দিন বাজারটির সূচককেও এগিয়ে রাখতে সাহায্য করে।

মূল্যস্তরের বৃদ্ধি গত সপ্তাহে ডিএসইর মূল্য-আয় অনুপাতও (পিই) বাড়িয়ে দেয়। সপ্তাহ শেষে বাাজরটির পিই দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৬৬, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি। আগের সপ্তাহে বাজারটির পিই ছিল ৮ দশমিক ৬৩। সচরাচর কোনো পুঁজিবাজারের জন্য ঝুঁকিমুক্ত পিই মনে করা হয় ২০। সে হিসাবে এর অর্ধেকেরও কম অবস্থানে ডিএসইর পিই। মোট ১৯টি খাতের মধ্যে কমপক্ষে ১৫টি খাতের পিই অবস্থান করছে ২০ এর নিচে। আবার ব্যাংক, মিউচুয়াল ফান্ড ও জ্বালানি খাতের পিই ৩ থেকে ৬ এর মধ্যে। সেই বিবেচনা সামনে রাখলে এ মুহূর্তে অতীতের যেকোনো সময়ের থেকে ভালো মূল্যস্তরে রয়েছে দেশের পুঁজিবাজার।

গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে ছিল ব্যাংকিং কোম্পানি সিটি ব্যাংক। গড়ে প্রতিদিন কোম্পানিটির ১৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে; যা ছিল পুঁজিবাজারটির মোট লেনদেনের ৪ দশমিক ৭১ শতাংশ। গড়ে ১১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা লেনদেন করে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল ওরিয়ন ইনফিউশন। সপ্তাহিক লেনদেনে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে উত্তরা ব্যাংক, রহিমা ফুড করপোরেশন, সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, সায়হাম কটন মিলস, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও ফাইন ফুডস।

এ সময় ডিএসইতে মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল বিডি ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোড। গত সপ্তাহে কোম্পানিটির ২৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। ২৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল টেক্সটাইল খাতের থাল্লু স্পিনিং। সপ্তাহটিতে ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ইসলামিক ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, এপেক্স স্পিনিং, রিজেন্ট টেক্সটাইলস, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন্স, পেনিনসুলা হোটেল, আমরাটেক, সায়হাম টেক্সটাইলস ও বিডি ফিন্যান্স।

সপ্তাহটিতে ডিএসইর দরপতনে শীর্ষ কোম্পানি ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স। ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল ঝিল বাংলা সুগার মিলস। ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আইএফআইসি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, পপুলার লাইফ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ট্রাস্ট ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ফার্স্ট ফিন্যান্স, ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, আরামিট লি. ও নর্দার্ন জুট মিলস।