প্রতারিত হয়েই ভাগ্য বদলায় সৌদি প্রবাসী আমির হোসেনের

Printed Edition

রফিকুল হায়দার ফরহাদ সৌদি আরব থেকে ফিরে

প্রথমে আদম ব্যবসায়ী কর্তৃক প্রতারিত হওয়া। এরপর মালিকপক্ষের বিশ^াসঘাতকতা। সৌদি আরবে গিয়ে অন্য অনেক বাংলাদেশীর মতোই এমন করুন পরিণতির শিকার চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আমির হোসেন। তবে এরপরও তিনি দমে যাননি। নিজে যে বাজে পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন তা যেন এখন আর কেউ না হন সে বিষয়ে সক্রিয় তিনি। এই নীতি আদর্শের সাথে ছিল মহান আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমত। ফলে ১৯৯৩ সালে সৌদি আরবে যাওয়া এই ব্যক্তি শ্রমিক থেকে এখন কোটি পতি। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে তার ৯টি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করছেন ৫০-৬০ জনের মতো বাংলাদেশী। শুধু চাকরি দিয়েই ক্ষান্ত নন, বিভিন্ন সেবামূলক কাজেও তার দান-অনুদান। রিয়াদের আল বাথা এলাকায় নিজের রায়হান হোটেলে বসে এভাবেই তথ্যগুলো দিয়ে যাচ্ছিলেন আমির হোসেন।

ভাগ্যের অন্মেষণে বাংলাদেশ ছেড়ে সৌদি আরবে পাড়ি দেয়া তার। কিন্তু আদম ব্যবসায়ী তথা দালাল তাকে সৌদি আরবে নিয়ে সাত দিন পরই বের করে দেয় বাসা থেকে। জানিয়ে দেয়, ‘তোমার কোনো দায়দায়িত্ব আর আমার নেই। তুমি বের হয়ে যাও আমার বাসা থেকে।’ এভাবেই মরুর বুকে তাকে ছেড়ে দেয় বাংলাদেশী প্রতারকটি। আমির হোসেনের কোনো আকুতি মিনতিই কানে ঢোকেনি ওই দালালের। অবশ্য তারা ইকামা বা কাজের অনুমতিপত্র জোগাড় করে দিয়েছিল।

বেশ হতাশ হলেও ভেঙে পড়েননি তিনি। নেমে পড়েন ভাগ্যবদলের কঠিন সংগ্রামে। সাথে ছিল মহান আল্লাহ তায়ালার রহমত। ফলে আজ আমির হোসেনই অন্যকে চাকরি দিচ্ছেন। পাশাপাশি করছেন দান খয়রাতও। তবে কোনোভাবেই ভুলে যাননি মহান আল্লাহ তায়ালকে। ইসলামের জন্য সাধ্য মতো অর্থ ব্যয় করছেন। এক সময় মাতৃভূমি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন আমির হোসেন। কিন্তু এ দেশীয় কিছু অসৎ ব্যক্তির প্রতারণার কারণে তিনি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। জানান, বাংলাদেশে কিছু করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আমানতের খেয়ানত করায় বহু টাকা লোকসান হয়। অবশ্য এরপরও ভবিষ্যতে বাংলাদেশে একটি ভালো মানের খাবারের হোটেল ও একটি পেট্রোল পাম্প দেয়ার ইচ্ছে তার।

আমির হোসেনের প্রতিষ্ঠানে এখন অন্য দেশের কোনো শ্রমিকই নেই। যারা কাজ করেন সবাই বাংলাদেশী। তিনি জানান, ‘আমি আমার দেশের লোকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতেই শুধু বাংলাদেশীদের চাকরি দিচ্ছি। যদিও আগে অন্য দেশের শ্রমিকও ছিল।’ এদের বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে নেয়ার কাজও করছেন তিনি। এতে এই প্রবাসীরা যাতে কোনো দালালের খপ্পরে পড়ে বেশি অর্থ ব্যয় না করেন তাই তাদের মধ্য প্রাচ্যের দেশটিতে নেয়ার পুরো কাজই নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। ফলে অন্য বাংলাদেশীরা যেখানে ৫-৬ লাখ টাকা খরচ করে সৌদি আরবে আসছেন সেখানে আমির হোসেন দুই-আড়াই লাখ টাকায় দেশ থেকে লোক নিচ্ছেন। কেন এই কম টাকা নেয়া। আমির হোসেনের জবাব, বাংলাদেশ থেকে লোক আনতে যতটুকু টাকা খরচ হয় আমি সেই টাকাই নিয়ে থাকি। বাড়তি কোনো টাকা নেই না।

১৯৯৩ সালে লেবার ভিসায় সৌদি আরবে যান আমির হোসেন। গরিব বাবা বহু কষ্টে এই টাকা জোগাড় করে ছেলেকে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশে পাঠান। কিছু নিজের টাকা, কিছু জমি বিক্রি করে, কিছু জমি বন্ধক রেখে, কিছু টাকা ঋণ করেই ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠান তার বাবা। এতে ব্যয় হয়েছিল এক লাখ ২০ হাজার টাকা। তবে যার মাধ্যমে সৌদি আরবে গিয়েছেন সেই ব্যক্তি সাত দিন পরই বাসা থেকে বের করে দেন। ফলে অপর এক বাংলাদেশীর সহায়তায় একটি খাবারের হোটেলে কাজ শুরু করেন। এরপর মুদি দোকান ও গাড়ির যন্ত্রাংশের দোকানে কাজ করেছেন। এই গাড়ির যন্ত্রাংশের দোকানে কাজ করার সময়ই নিজের জমানো টাকা আর বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিজেই দেন গাড়ির যন্ত্রাংশের দোকান। আমির হোসেন জানান, ২০০১ সালে এই গাড়ির যন্ত্রাংশের দোকান দেয়ার পর থেকেই আমরা ভাগ্য পরিবর্তন হতে থাকে। এরপর আমি যে কাজেই হাত দিয়েছি, আল্লাহর অশেষ রহমতে সেই কাজেই সফল। সেই ধারাক্রমেরই আমার এখন ৯টি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরবে। ইতোমধ্যে সৌদি আরবে বিনিয়োগকারী হওয়ার অনুমতিও পেয়েছি।

বিনিয়োগকারীর মর্যাদা পাওয়ার ফলে সৌদি আরবে কোনো প্রতিষ্ঠান খুলতে হলে কোনো সৌদি নাগরিককে টাকা দিতে হয় না। সাধারণ নিয়মে সৌদি আরবে কোনো প্রতিষ্ঠান করতে গেলে প্রথমে একজন সৌদি নাগরিকের নামে নিতে হয়। এ জন্য প্রতি মাসে ওই সৌদি নাগরিককে টাকা দিতে হয়। আমির হোসেন তথ্য দেন, আগে আমাকে প্রতি দোকানের জন্য মাসে দুই হাজার রিয়াল করে ওই সৌদি নাগরিককে দিতে হতো। বিনিয়োগকারী হওয়ার ফলে এখন আর কোনো টাকাই দিতে হয় না সৌদি কোনো নাগরিককে। স্বাধীন ব্যবসায়ী আমির হোসেনের এখন সৌদি আরবে দু’টি খাবার হোটেল, তিনটি সুপার মার্কেট, একটি মাছের ফিশারিজ, একটি ট্র্যাভেল এজেন্সি, একটি সেলুন, একটি পেট্রোলপাম্প এবং একটি মেশিন পার্টসের দোকান। আমির অ্যান্ড রায়হান কোম্পানি লিমিটেড নামে তার এই প্রতিষ্ঠানগুলো। রায়হান তার বড় ছেলে। তিন মেয়ে আর দুই ছেলের জনক এই বাংলাদেশী সফল ব্যবসায়ী। ৯টি প্রতিষ্ঠান থেকে মাসে প্রায় এক লাখ রিয়াল বা ৩৩ লাখ টাকা লাভ হয় তার। এই অর্থের যে জাকাত হয় তা তিনি চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় গরিব লোকদের মধ্যে বিতরণ করেন।