একক অভিনয়ে দর্শক মাতালেন এরশাদ হাসান
Printed Edition
বিনোদন প্রতিবেদক
দস্তয়েভস্কির ছোটগল্প ‘দ্য জেন্টাল স্পিরিট’ অবলম্বনে নির্মিত বিবেকানন্দ থিয়েটারের ২৫তম প্রযোজনা ‘ভাসানে উজান’ বাংলাদেশের সমকালীন মঞ্চধারায় এক তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন। একক নাটক মানেই নারীর পারফরম্যান্স, এমন চলমান ধারণাকে ভেঙে পুরুষ অভিনেতার একক অভিনয়ের সম্ভাবনা যে আরো বিস্তৃত হতে পারে, এই নাটকটি তারই শক্ত প্রমাণ। একক অভিনয়ের শিল্পরূপে নতুন ভাষার সন্ধানে যে প্রযোজনা সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে, তার মধ্যে অভিনেতা এরশাদ হাসানের ‘ভাসানে উজান’ নিঃসন্দেহে অন্যতম। গত ২১ নভেম্বর উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের একক অভিনয়ের কিংবদন্তি ফেরদৌসী মজুমদারের উপস্থিতি নাটকের গুরুত্বকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। স্টুডিও থিয়েটারের ঘনিষ্ঠ পরিবেশে বিপুল দর্শক, গণমাধ্যম ও থিয়েটারপ্রেমীদের আগ্রহ এ নাটককে আরো আলাদা মর্যাদা দেয়। কিন্তু আসল বিস্ময়টি ছিল মঞ্চে, যেখানে প্রায় এক ঘণ্টা ১০ মিনিট ধরে একা একজন অভিনেতা দশের অধিক বহুমাত্রিক চরিত্রের জীবন, অনুভূতি, স্মৃতি আর মানবিক দ্বন্দ্ব দর্শকের সামনে উন্মোচন করে যান।
নাট্যকার অপূর্ব কুমার কুণ্ডুুর নাট্যরূপ এবং নির্দেশক শুভাশীষ দত্ত তন্ময়ের সূক্ষ্ম ও মননশীল নির্দেশনা নাটকটিকে দিয়েছে বিশেষ নান্দনিক স্থাপত্য। দুই শিল্পীর কারিগরি নির্মাণের পরিপূর্ণতা দেখা যায় নাট্যভাষার নিয়ন্ত্রিত গতি, দৃশ্য-পরিকল্পনার মিতব্যয়িতা এবং চরিত্রচিত্রণের গভীরতায়। তবে সব কিছুর কেন্দ্রে ছিলেন অভিনেতা মো: এরশাদ হাসান, যিনি তার দীর্ঘ অভিনয়-অভিজ্ঞতাকে সার্থকভাবে পরিণত করেছেন একক অভিনয়ের চূড়ান্ত পরীক্ষায়। নাটকের মূল চরিত্র এক নিঃসঙ্গ মানুষের আত্মকথন, একটি ভাঙা সম্পর্ক, অব্যক্ত অনুতাপ, অতীতের চাপা ব্যথা এবং বিবেকবোধের দহনে দিশেহারা এক প্রাণের ক্রান্তিকাল। খুব সীমিত সেট এবং ন্যূনতম প্রপস ব্যবহার করা হলেও আলো, ছায়া ও শব্দ পরিকল্পনার নিখুঁত মেলবন্ধন চরিত্রটির মানসিক অস্থিরতা ও অন্তর্দহনকে দর্শকের কাছে করে তুলেছে স্পষ্ট ও তীক্ষè। বিশেষ করে দৃশ্যান্তরে আলো পরিবর্তনের আক্রমণাত্মক গতি চরিত্রের মানসিক ওঠানামার প্রতিফলন হয়ে উঠেছে।
একক নাটকে দর্শক ধরে রাখা নিছক অভিনয়দক্ষতা নয়, এটি অভিনেতার উপস্থিতি, কণ্ঠ-নিয়ন্ত্রণ, শরীরী ভাষা ও মানসিক শক্তির সম্মিলিত প্রকাশ। এই চ্যালেঞ্জটি এরশাদ হাসান সামলেছেন অনন্য সংযত আবেগ ও শক্তিশালী নান্দনিকতায়।