সময় শেষ হলেও নির্মাণ হয়নি ফসল রক্ষা বাঁধ
তাহিরপুরের হাওরে বোরো ফসল নিয়ে শঙ্কা
Printed Edition
মেহেদী হাসান তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ)
প্রতি বছরের মতো এবারো সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় বোরো ধানচাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। আশা করছেন, ফলন ভালো হবে। কিন্তু সেই ফসল ঘরে তোলার আগেই মনে দোলা দিচ্ছে উৎকণ্ঠা। কারণ হাওরের পানি থেকে ফসল রক্ষা করতে যে বাঁধগুলোর ওপর ভরসা করতে হয় কৃষকদের, সেগুলোরই কাজ এখনো শেষ হয়নি।
কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারির (গতকাল শনিবার) মধ্যে এসব ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও এখনও অনেক বাঁধেই চলছে মাটির কাজ। ফলে অসমাপ্ত এসব বাঁধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হাওরপাড়ের হাজার হাজার কৃষক।
তাহিরপুর উপজেলায় ছোট-বড় ২৩টি হাওর রয়েছে। এসব হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য এ বছর ৮৮টি পিআইসি (পানি ব্যবস্থাপনা সমিতি) গঠন করা হয়েছে। সরকার এসব পিআইসির মাধ্যমে বাঁধ মেরামত ও নির্মাণে বরাদ্দ দিয়েছে প্রায় ১৭ কোটি টাকা, যা গত বছর ছিল ১৩ কোটি টাকা। তবে বরাদ্দ বাড়লেও বাস্তবে কাজের অগ্রগতি নিয়ে সন্তুষ্ট নন কেউই।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলার ২৩টি হাওরে ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বেশির ভাগই উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান। এখানে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু অসমাপ্ত বাঁধের কারণে অতি বৃষ্টি বা আগাম বন্যা এলেই এসব ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হাওরের এসব জমি এক ফসলি হওয়ায় কৃষকদের কাছে বোরো ফসলই সারা বছরের ভরসা।
সরেজমিনে উপজেলার কয়েকটি হাওর ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ স্থানেই বাঁধ নির্মাণের কাজ এখনো চলছে। কোনো কোনো স্থানে মাটি দিয়ে বাঁধ উঁচু করা হচ্ছে, কোনো স্থানে চলছে সংস্কার কাজ। তবে বেশির ভাগ বাঁধই এখনো নির্ধারিত উচ্চতায় পৌঁছায়নি। কৃষকরা বলছেন, বাঁধের কাজ শেষ করতে দেরি হওয়ায় তাদের মনে একধরনের ভয় কাজ করছে। পানি বাড়লেই অরক্ষিত এই বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যাবে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক তোজাম্মিল হক নাসরুম জানান, আমরা দিনভর বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখেছি। বাঁধের কাজ সন্তোষজনক মনে হয়নি। কাজ শেষ না হওয়ার জন্য দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতাই দায়ী। তিনি অভিযোগ করেন, পিআইসির দায়িত্বে যারা থাকেন তারা কাজ না করে বরং পানি আসার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। তারা অপেক্ষায় থাকেন কাজ না করেই যাতে বিল তুলতে পারা যায়। তিনি বোরো ফসল রক্ষায় দ্রুত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ করার দাবি জানান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। শনির হাওরের কৃষক লতিফ মিয়া জানান, এবার ধান ভালো হবে বলে আশা করছি। কিন্তু ধান রক্ষা করার জন্য যে বাঁধ নির্মাণ কাজ চলছে, তা এখনো শেষ হয়নি। ধান যদি পানিতে তলিয়ে যায়, তাহলে আমরা ধানচাষিরা সপরিবারে কোথায় যাব?’ মাটিয়ান হাওরের কৃষক শাকিল মিয়া বলেন, ‘প্রতি বছর বাঁধ ভেঙে ফসল ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকি। বাঁধ নির্মাণ কাজ ঠিকমতো না করায় এমন আশঙ্কার সৃষ্টি হয়।’
পিআইসির দায়িত্বে থাকা কয়েকজনের মধ্যে কেউ কেউ দাবি করছেন, তাদের অংশের কাজ শেষ পর্যায়ে। ৮১ নম্বর পিআইসির দায়িত্বে থাকা রায়হান উদ্দিন জানান, তার দায়িত্বে থাকা বাঁধের কাজ প্রায় শেষ। বাকিটুকু খুব শিঘ্রই শেষ হবে।
তবে সাধারণ কৃষকদের ভাষ্য, অধিকাংশ পিআইসি সদস্যই কাজে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। অনেক জায়গায় পিআইসি সদস্য সচিব নিজের দায়িত্ব সম্পর্কেই ওয়াকিবহাল নন। এমনকি কারো কারো নাম ব্যবহার করে অন্য লোক কাজ করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো: ওবায়দুল হক মিলন বলেন, ‘পিআইসি গঠন প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি থাকে। গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দেরিতে কাজ শুরু হয়। বেশির ভাগ জায়গায় পুরনো মাটিকে ঘষামাজা করে দেখানো হয়। শুধু তাহিরপুর নয়, মধ্যনগর, ধর্মপাশা, শাল্লা, দিরাই, জগন্নাথপুর, শান্তিগঞ্জ ও দোয়ারাবাজার উপজেলার ফসল রক্ষা বাঁধের কাজের অবস্থাও বেগতিক।’ তিনি আরো জানান, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে চাষযোগ্য জমি ও সংরক্ষিত এলাকা থেকে মাটি কেটে বাঁধ নির্মাণ করায় প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।
তাহিরপুর উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বে থাকা এসও মনির হোসেন জানান, বরাদ্দকৃত টাকার মাত্র ২৫ শতাংশ পিআইসিগুলোকে দেয়া হয়েছে। ফলে হাতে টাকা না থাকায় ধীরগতিতে কাজ হচ্ছে। তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই মাটির কাজ শেষ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু বাকি কাজ শেষ হবে কবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।’
এ দিকে উপজেলা কৃষি অফিসার মো: শরিফুল ইসলাম জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চলতি মৌসুমে বোরো ধানের ফলন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে বাঁধের কাজ শেষ না হওয়া নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ধান চাষাবাদে এখনো কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু বাঁধ অসম্পূর্ণ থাকলে যেকোনো সময় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। কর্তৃপক্ষের দ্রুত এ বিষয়ে নজর দেয়া দরকার।’ সময় যত এগোচ্ছে, ততই শঙ্কা বাড়ছে হাওরপাড়ের কৃষকদের মনে। এক ফসলি এই জমিতে সারা বছরের খোরাক নির্ভর করে বোরো ধানের ওপর। অসমাপ্ত বাঁধের কারণে সেই খোরাক ডুবির আশঙ্কায় কৃষকরা যেন ঘুমাতে পারেন না।