বিলুপ্তির পথে দৃষ্টিনন্দন ঢোল কলমি
Printed Edition
মাকসুদুর রহমান পারভেজ লালমোহন (ভোলা)
দ্বীপজেলা ভোলার লালমোহনসহ দক্ষিণাঞ্চলের খাল-বিল, নদীতীর ও গ্রামীণ সড়কের পাশে একসময় চোখে পড়ত দৃষ্টিনন্দন ঢোল কলমি গ্রাম্য ভাষায় ‘বেদমা’ বা ‘বেড়ালতা’। আজ সেই পরিচিত সবুজ ঝাড় প্রায় বিলুপ্তির পথে। আধুনিকতার চাপ, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং অতীতের এক ভয়াবহ গুজব সব মিলিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়ের সহজলভ্য দেশজ উদ্ভিদ।
ঢোল কলমি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। দ্রুত বর্ধনশীল এই গাছ অল্পদিনেই ঘন ঝাড়ে পরিণত হয়। ছয় থেকে দশ ইঞ্চি লম্বা সবুজ পাতা আর পাঁচ পাপড়ির হালকা বেগুনি বা গোলাপি ফানেল-আকৃতির ফুল এর সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে। একটি মঞ্জরিতে চার থেকে আটটি ফুল ফোটে। সারা বছরই ফুল দেখা গেলেও বর্ষার শেষভাগ থেকে শরৎ-শীতে প্রস্ফুটনের আধিক্য থাকে। ফুলে মধুর টানে কালো ভোমরার আনাগোনা, আর ডালে বসে কীটপতঙ্গভুক পাখির বিচরণ সব মিলিয়ে গ্রামীণ জীববৈচিত্র্যের অংশ ছিল এ গাছ।
কেবল সৌন্দর্য নয়, উপযোগিতার দিক থেকেও ঢোল কলমি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এর বীজ ও পাতায় তেতো কষ থাকায় গরু-ছাগল খায় না। ফলে গ্রামাঞ্চলে বসতভিটা, পুকুরপাড় কিংবা নতুন রোপণ করা গাছ রক্ষায় প্রাকৃতিক বেড়া হিসেবে এর ব্যবহার ছিল ব্যাপক। অনেকেই বাঁশ বা নেটের সাথে মিলিয়ে মজবুত বেড়া তৈরি করতেন। অতিরিক্ত অংশ জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। খরা ও বন্যা সহনশীল হওয়ায় প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারত এই উদ্ভিদ। নদীতীর ও খালপাড়ে জন্মে মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখার মাধ্যমে ভাঙন রোধেও ভূমিকা রাখত।
তবে নব্বইয়ের দশকে এক অদ্ভুত গুজব ঢোল কলমির ভাগ্য বদলে দেয়। গাছে থাকা একধরনের পোকাকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক কামড় বা স্পর্শে নাকি মৃত্যু অবধারিত! গ্রাম থেকে শহর এমনকি ঢাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে ভীতি। সাধারণ মানুষ গণহারে গাছ কাটতে শুরু করে; কোথাও কোথাও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগেও নিধন চলে। পরে টেলিভিশনে এক বিশেষজ্ঞ সরাসরি পোকাটি হাতে নিয়ে দেখিয়ে প্রমাণ করেন, এটি মোটেও প্রাণঘাতী নয়; নিরীহ এক কীটমাত্র। আতঙ্ক কেটে গেলেও ততদিনে অনেক এলাকায় ঢোল কলমির বিস্তার মারাত্মকভাবে কমে যায়।
লালমোহন উপজেলার লর্ড হার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের প্রবীণ কৃষক ইদ্রিস মিয়া (৭৮), আব্দুর রসিদ (৬৫) ও রতন হাওলাদার জানান, ‘ঢোল কলমি খুবই উপকারী গাছ। গরু-ছাগল না খাওয়ায় বেড়া হিসেবে এর জুড়ি ছিল না। নদীতীর রক্ষা করত, আবার প্রয়োজন হলে জ্বালানিও হতো।’ পূর্ব চরউমেদ গ্রামের গৃহস্থ আবুল কালাম বলেন, ‘নতুন বাড়ি করলে চারপাশে ঢোল কলমির বেড়া দেয়া ছিল নিয়মের মতো।’
বিশ্লেষকরা মনে করেন, গুজব-নির্ভর সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনাহীন নিধন এবং গ্রামজীবনের দ্রুত পরিবর্তন সব মিলিয়ে দেশজ অনেক উদ্ভিদের মতো ঢোল কলমিও হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ পরিবেশ সংরক্ষণ, মাটির ক্ষয়রোধ ও জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে এমন উদ্ভিদের গুরুত্ব নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
প্রকৃতি ও প্রাণের স্বার্থে প্রাকৃতিক বেড়া হিসেবে পরিচিত ঢোল কলমির সংরক্ষণ ও পুনরায় বিস্তারে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া এখন জরুরি নইলে গ্রামবাংলার চেনা সবুজের আরেকটি অধ্যায় ইতিহাস হয়ে যাবে।