এক নজরে খামেনির সম্ভাব্য উত্তরসূরিরা
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যৌথ হামলায় সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করার পর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে ইরান। এ পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির এখনকার শাসনব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলতে ইরানিদের প্রতি আহ্বান জানালেও ইরানের শাসকগোষ্ঠীর পাহারাদার ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) দাপট এখনো বহাল রয়েছে, এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তারা একের পর এক হামলাও চালিয়ে যাচ্ছে। রয়টার্স।
এদিকে ইরানের দুই সরকারবিরোধী নেতাও ‘স্বপ্নের নতুন ইরানে’ নিজের অবস্থান পোক্ত করতে জোর কদমে ঝাঁটিয়ে পড়েছেন। মরিয়ম রাজাভি ও নির্বাসনে থাকা ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি আলাদা দু’টি বার্তায় ইরানিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানালেও ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের থদু’জনের দৃষ্টিভঙ্গিতে যে আকাশ-পাতাল ফারাক, বার্তাগুলোতে তাও স্পষ্ট হয়েছে। ইরানি বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, পরবর্তী নেতা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন আলেমের নেতৃত্বে গঠিত একটি অন্তর্বর্তী পরিষদ সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করবেন।
ট্রুথ সোশ্যালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনিকে হত্যার ঘোষণা দেয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তেহরানকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য ‘বেশ ক’জন ভালো প্রার্থী’ রয়েছে। ফোনে সিবিএস নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আমি জানি কারা, কিন্তু আপনাদের বলতে পারবো না।’ ইরানের নেতা হিসেবে কেউ তার পছন্দের তালিকায় আছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাব পেতে জোরাজুরি করা হলে মার্কিন এ প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘হ্যাঁ, আছে মনে হয়। ক’জন ভালো প্রার্থী আছে।’
কারা সেই প্রার্থী? এ ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিস্তারিত কিছু বলেননি। প্যারিসভিত্তিক ন্যাশনাল কাউন্সিল অব রেজিস্ট্যান্স অব ইরানের (এনসিআরআই) প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া মরিয়ম রাজাভি ইরানিদের প্রতি দেয়া এক বার্তায় দেশের এখনকার শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাত করে ইরানকে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
‘ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী শাসনের অধীনে আমাদের দেশ লাগাতারভাবে ভয়াবহ কষ্ট ও ধ্বংসযজ্ঞ সহ্য করে যাচ্ছে,’ মরিয়ম এমনটাই বলেছেন বলে জানিয়েছে নিউ ইয়র্ক পোস্ট। বাড়তে থাকা অস্থিরতার মধ্যে বেসামরিকদের সুরক্ষা দিতে তিনি ইরানিদের, বিশেষ করে ‘দেশের সাহসী তরুণদের’ প্রতি আহ্বানও জানিয়েছেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত এনসিআরআই নিজেদেরকে নির্বাসনে থাকা সরকার হিসেবে দেখে। দলটির দাবি অনুযায়ী, তাদের কাছে অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন ও সার্বভৌমত্ব জনগণের হাতে ফিরিয়ে দিতে ছয় মাসের একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের ছক তৈরিই আছে। ‘এখন সময় ঐক্যের। ইরানিরা শাহ ও মোল্লা উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করছে,’ রাজতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে বলেন মরিয়ম। ইরানের শেষ রাজার ছেলে রেজা পাহলভিও এক্সে দেয়া এক পোস্টে বলেছেন, ইসলামিক শাসনব্যবস্থার পতন ঘটলে ইরানে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পরিকল্পনা তারও রয়েছে।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে, ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে নয়। ‘চূড়ান্ত বিজয় আমাদের দ্বারাই অর্জিত হবে। আমরা, ইরানের জনগণই এই চূড়ান্ত লড়াইয়ে বিজয় অর্জনের কাজ শেষ করব। রাস্তায় ফেরার সময় ঘনিয়ে আসছে,’ বলেছেন তিনি। উভয় নেতাই দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথ করে দিতে ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। মরিয়ম ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অস্ত্র সমর্পণ করে জনতার পাশে দাঁড়াতে বলেছেন। আর রেজা পাহলভি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, তারা যদি এ শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে তাহলে তারাও ‘খামেনির নৌকার সাথে ডুবে যাবে’।
বিরোধীরা ইরানের শাসন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারলে ইরানের ধর্মীয় আলেমরাই খামেনির উত্তরসূরি বেছে নেবেন। পরিস্থিতি জটিল হলে এমনকি ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর হাতেও ক্ষমতা চলে যেতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন। শনিবার ইরানে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ হামলার আগে সিআইএ’র এক মূল্যায়নেও আইআরজিসির কট্টরপন্থীদের যে কেউ শীর্ষ নেতার আসনে বসে যেতে পারেন বলে ধারণা দেয়া হয়েছে। খামেনি নিজে কখনো তার উত্তরসূরি বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। তবে আপাতদৃষ্টিতে যে দু’জনের নাম বেশি শোনা যাচ্ছে তার মধ্যে তার মেঝ ছেলে মুজতবা খামেনিও আছেন, যাকে পিতার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে অনেকদিন ধরেই দেখা হচ্ছিল বলে বিষয়টি সম্বন্ধে অবগত একাধিক সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে ।
৫৬ বছর বয়সী মুজতবা তার বাবার কট্টরপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির ঘোর সমর্থক, ইরানের রাজনৈতিক মহলের অনেকেই রয়টার্সকে এ কথা বলেছেন। শীর্ষ পদে মুজতবার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন হাসান খোমেনি, তিনি ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের জনক রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি। ৫৩ বছর বয়সী হাসান খোমেনির প্রার্থীতার বিষয়টি গত এক মাস ধরে সামনে এসেছে এবং দেশের ভেতর-বাইরে তাকে তুলনামূলক উদারপন্থী বিবেচনা করা হচ্ছে, বলেছে নিউ ইয়র্ক পোস্ট। এ দু’জনের বাইরে গার্ডিয়ান কাউন্সিল ও অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট বা বিশেষজ্ঞ পরিষদের প্রভাবশালী সদস্য আলি রেজা আরাফি, খামেনির কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা হুজ্জাত-উল-ইসলাম মোহসেন কোমি, বিশেষজ্ঞ পরিষদের দীর্ঘ দিনের সদস্য মোহসেন আরাকি, বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেইন মোহসেনি, বিশেষজ্ঞ পরিষদের আরেক প্রভাবশালী সদস্য হাশেম হুসেইনি বুশেহরির নামও সম্ভাব্য উত্তরসূরির তালিকায় আছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনস।