রাবিতে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী ও দুর্লভ জীবাশ্মের বিরল সংগ্রহশালা
Printed Edition
রাজশাহী ব্যুরো
সারি সারি আলমারিতে সাজানো অসংখ্য প্রাণীর সংরক্ষিত নমুনা নীরবে সাক্ষ্য দিচ্ছে পৃথিবীর রহস্যময় প্রাণিবৈচিত্র্যের। বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী থেকে শুরু করে দুর্লভ জীবাশ্ম- সব মিলিয়ে দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ প্রাণিবিদ্যা জাদুঘরটি অবস্থিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি)। সুবর্ণজয়ন্তী অতিক্রান্ত হলেও এত বড় পরিসরের এই প্রাণী জাদুঘরের কথা এখনো অনেকেরই অজানা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু অ্যাকাডেমিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একটি বিস্তৃত কক্ষে অবস্থিত এই জাদুঘর। ১৯৭২ সালে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মরহুম শিক্ষক মুস্তাফিজুর রহমানের উদ্যোগে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তার নামানুসারেই জাদুঘরটির নাম রাখা হয়েছে ‘অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান মেমোরিয়াল মিউজিয়াম’।
এই জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে পরিফেরা থেকে শুরু করে ম্যামালস শ্রেণির হাজার হাজার প্রাণীর নমুনা। এর মধ্যে রয়েছে বনরুই, শজারু, উদবিড়াল, বিভিন্ন প্রজাতির বিলুপ্ত সাপ, সামুদ্রিক ও মিঠাপানির মাছ, কোরাল, মলাস্কা, কীটপতঙ্গ, নানা প্রজাতির পাখি এবং স্তন্যপায়ী প্রাণী। কোনো কোনো প্রাণী শুকনো অবস্থায় মমি করে সংরক্ষণ করা হয়েছে, আবার কিছু প্রাণী রাখা হয়েছে ফরমালিনে ডুবিয়ে। স্বচ্ছ কাচের জার ও বাক্সে সারিবদ্ধভাবে রাখা এসব নমুনা গবেষকদের জন্য অমূল্য সম্পদ।
জাদুঘরটিতে বর্তমানে এক হাজার ৫৪৩টি প্রাণীর প্রক্রিয়াজাত দেহ এবং ১৪২টি দুর্লভ ফসিল সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৯ প্রজাতির ৩৩টি কোরাল, ৪৫ ধরনের মলাস্কার শেল, জীবন্ত ফসিল হিসেবে পরিচিত পেট্রোমাইজন ও মেক্রিন প্রজাতি। শুধু বন্য ও গৃহপালিত প্রাণীই নয়, এখানে রয়েছে দু’টি মানবকঙ্কাল- একটি পুরুষের ও একটি নারীর। এ ছাড়া হাতি, ঘোড়া ও কুমিরের কঙ্কাল, শুশুক ও ডলফিনের মমি, এমনকি মানবভ্রƒণও সংরক্ষিত আছে। জাদুঘরের দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধা রয়েছে বিভাগের শিক্ষকদের তোলা বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আলোকচিত্র। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শুধু বাংলাদেশের নয়- বিদেশ থেকেও সংগ্রহ করা হয়েছে কিছু দুর্লভ প্রাণীর নমুনা। পাশাপাশি রাজশাহী মহানগর ও আশপাশের এলাকা থেকে এ পর্যন্ত ৯৬ প্রজাতির মাছ সংগ্রহ করা হয়েছে।
জাদুঘরটি প্রতি সপ্তাহে শুক্র ও শনিবার ছাড়া বাকি পাঁচ দিন সকাল ৮টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত খোলা থাকে এবং দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। তবে এত সমৃদ্ধ সংগ্রহ থাকা সত্ত্বেও এটি সাধারণ মানুষের নজরের বাইরে রয়ে গেছে। এমনকি অনেক গবেষক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর কাছেও জাদুঘরটির পরিচিতি সীমিত। বর্তমানে এই কক্ষটি শুধু জাদুঘর হিসেবেই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি বিভাগের ব্যবহারিক ও গবেষণার কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে। কক্ষের মাঝখানে রয়েছে টেবিল-চেয়ার ও বিভিন্ন রাসায়নিক পরীক্ষার সরঞ্জাম।
জাদুঘরের মিউজিয়াম অ্যাটেনডেন্ট কেতাব বলেন, ‘এখানে পাঁচ শতাধিক প্রজাতির প্রাণী সংরক্ষিত আছে, যা দেশের অন্য কোনো প্রাণিবিদ্যা জাদুঘরে নেই। এটি বাংলাদেশের প্রাণিবিদ্যার ক্ষেত্রে অদ্বিতীয়। তবে প্রাণী সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত ফরমালিন, দক্ষ ট্যাক্সিডার্মিস্ট ও প্রদর্শনের জন্য পর্যাপ্ত জায়গার সঙ্কট রয়েছে।’
প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিনুজ্জামান মো: সালেহ্ রেজা বলেন, ‘এই মিউজিয়ামের সংগ্রহ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানে স্থলজ, জলজ ও সামুদ্রিক প্রাণীর পাশাপাশি বিলুপ্তপ্রায় জীবাশ্মও রয়েছে। সংগ্রহের দিক থেকে এটি দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ প্রাণিবিদ্যা জাদুঘর।’
প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো: নজরুল ইসলাম জানান, পরিফেরা থেকে শুরু করে মলাস্কা, মাছ ও স্তন্যপায়ী প্রাণী- প্রায় সব পর্বের প্রতিনিধিত্বকারী প্রাণীর সংগ্রহ এখানে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের মিউজিয়াম সংগ্রহের দিক থেকে দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় বড় ও সমৃদ্ধ। তবে জায়গার সঙ্কট রয়েছে। এটিকে আরো আধুনিক ও সমৃদ্ধ করতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও প্রকল্প প্রয়োজন।’
গবেষণা ও শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাণিবিদ্যা জাদুঘর এখনো পরিচিতির আড়ালে। যথাযথ উদ্যোগ ও প্রচারণা পেলে এটি দেশের প্রাণিবিজ্ঞান ও বন্যপ্রাণী গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।