মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে
সবচেয়ে লাভবান ইসরাইল
Printed Edition
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আক্রমণের মূল লক্ষ্য রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সবচেয়ে লাভবান দেশ ইসরাইল। ইরানের রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন আনা গেলে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের সবচেয়ে বড় হুমকিকে সরিয়ে দেয়া যাবে। তবে যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানে রাষ্ট্রক্ষমতা পরির্বতন সম্ভব না হলে তার বিরূপ প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পড়বে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের জন্য তা নেতিবাচক হতে পারে।
অন্য দিকে বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনায় ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে কাতার, কুয়েত ও বাহরাইন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেননা এই পথেই তাদের জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজগুলো চলাচল করে। গলফ কো-অপারেশন কান্ট্রিভুক্ত (জিসিসি) এসব দেশ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইতোমধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। তাদের স্বার্থে বড় ধরনের আঘাত এলে মধ্যপ্রাচ্যের এসব দেশ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিতে পারে। সেক্ষেত্রে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান এই অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সম্মিলিতভাবে ইরানের ওপর যে হামলা চালিয়েছে তা পূর্বপরিকল্পিত। অনেক দিন ধরেই তারা এই পরিকল্পনা করেছে। এটা যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের দীর্ঘদিনের ইচ্ছার একটি প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্রের অন্য অনেক রাষ্ট্রপ্রধান ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যা সাহস করেনি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তা করেছেন। ১০ বছর আগেও যুক্তরাষ্ট্র মনে করেনি ইরানকে আক্রমণ করে তারা সফলতা লাভ করবে। এখন তারা আঁটঘাট বেঁধেই ইরান আক্রমণ করেছে। বর্তমান আক্রমণের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ইরানের রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন আনা। এই পরিবর্তনের লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সম্ভবত তারা ইরানের ওপর আক্রমণ অব্যাহত রাখবে। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইরান পাল্টা জবাব দেয়ার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ইরানের মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক বিরোধী গ্রুপ রয়েছে। এর অনেকগুলো স্থানীয়, আবার অনেকগুলো আঞ্চলিক। কিন্তু এই গ্রুপগুলোর মধ্যে ইরানের ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তোলার মতো অভিন্ন নেতৃত্ব নেই। গ্রুপগুলোর নেতৃবৃন্দের অনেকেই ইরানের বাইরে অবস্থান করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে তাদের সমর্থকদের নিদের্শনা দিয়ে থাকে। রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন সম্ভব হলে যুক্তরাষ্ট্র হয়ত এদের মধ্যে কাউকে ইরানের নেতৃত্বে বসিয়ে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করতে পারে, যেমনটা বিশ্বের অনেক দেশেই তারা করে থাকে।
ইরানের সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত নয় মন্তব্য করে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, ইরানের সামরিক বাহিনী বা ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কোর্পের (আইআরজিসি) নেতৃত্বের মধ্যে যদি কোনো চির না ধরে অথবা কেউ পক্ষ ত্যাগ না করে তবে রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন অত সহজ হবে না, এমনকি অসম্ভবও হতে পারে। সেক্ষেত্রে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
মাহফুজুর রহমান বলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালীতে বিশেষ করে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল কার্যকরভাবে বন্ধ করে দিতে পারে তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। ইয়েমেনের হুতিদের সহায়তায় ইরান লোহিত সাগরেও জাহাজ চলাচলের বিঘœ ঘটাতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এসব সম্ভাবনার জন্য তৈরি হয়েই ইরানে আক্রমণ চালিয়েছে। তাই এই কাজগুলো করা ইরানের জন্য সহজ হবে না। ইরান এখন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাষ্ট্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোতে মিসাইল ছুড়ে আক্রমণ করছে। তবে এই ক্ষতি মেনে নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ চালিয়ে যেতে তৈরি আছে। বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনায় ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে বিশেষ করে কাতার, কুয়েত ও বাহরাইন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেননা এই পথেই তাদের জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজগুলো চলাচল করে। গলফ কো-অপারেশন কান্ট্রিভুক্ত (জিসিসি) এ সব দেশ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইতোমধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। তাদের স্বার্থে বড় ধরনের আঘাত এলে মধ্যপ্রাচ্যের এসব দেশ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিতে পারে। সেক্ষেত্রে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। তবে ইরানে রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন না এলে এটা স্বল্পমেয়াদি হতে পারে।
‘ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সবচেয়ে বড় লাভবান দেশ ইসরাইল’ মন্তব্য করে মাহফুজুর রহমান বলেন, চলমান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ইরানতো ধ্বংস হবে, একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্যও তা ধ্বংসাত্মক পরিণতি ডেকে আনবে। যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তন সম্ভব না হলে তার বিরূপ প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ, মিত্র দেশগুলো ও জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তোপের মুখে পড়তে পারেন। চলতি বছরের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের জন্য তা নেতিবাচক হতে পারে।
ইরান যুদ্ধে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রথমত, জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে এর দাম বাড়বে, যার প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয়সহ অন্যান্য পণ্যের ওপর পড়বে। দ্বিতীয়ত, রেমিটেন্সের ওপর প্রভাব পড়বে। কেননা মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশীদের আয় কমে যেতে পারে। অনেকে কাজের অভাবে বেকারও হতে পারেন। অনেক বাংলাদেশী নিরাপত্তার কারণে নিজ দেশে ফেরত চলে আসতে পারেন। এসব কারণে অর্থনীতিতে মন্দাবস্থা দেখা দিতে পারে। ইরান যুদ্ধে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ফেরামগুলোতে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকবে, না আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে- তার প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতি ও কূটনীতিতে পারতে পারে।