শ্রীংলার বিশ্লেষণ : দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গি ও বিএনপি সরকারের সামনে কঠিন অঙ্ক
নতুন সরকারের কূটনৈতিক পথচলায় সুযোগ, চাপ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
Printed Edition
বিশেষ প্রতিবেদন
ভারতের সংসদ সদস্য ও সাবেক পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রীংলা সম্প্রতি এক নিবন্ধে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সামনে রেখে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেছেন- নতুন নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) হয় পুরনো ভারতবিরোধী রাজনীতিতে ফিরবে, নয়তো দিল্লির সাথে বাস্তববাদী সমঝোতায় যাবে। তার মতে, দ্বিতীয় পথই বাংলাদেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য উত্তম।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই বিশ্লেষণ কতটা নিরপেক্ষ? আর বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ‘প্রাগম্যাটিক কমপ্যাক্ট’ আসলে সুযোগ, নাকি কৌশলগত চাপ?
এই প্রতিবেদনে শ্রীংলার লেখার মূল বক্তব্য, তার অন্তর্নিহিত বার্তা এবং বাংলাদেশের নতুন সরকারের সামনে থাকা বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্লেষণ করা হলো।
দিল্লির বার্তা : সহযোগিতা না হলে অনিশ্চয়তা
শ্রীংলার বক্তব্যের কেন্দ্রে তিনটি বিষয় স্পষ্ট- ১. বিএনপির অতীত (২০০১-০৬) ছিল ভারতবিরোধী; ২. বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কটে বাংলাদেশ ভারতের সহযোগিতা ছাড়া এগোতে পারবে না; আর ৩. দিল্লির নিরাপত্তা ‘রেড লাইন’ মানলে তবেই আস্থা সৃষ্টি হবে।
অর্থাৎ, সম্পর্কের কাঠামো নির্ধারণের ক্ষমতা দিল্লির হাতে- এমন একটি ইঙ্গিত তার লেখায় বারবার উঠে আসে। কূটনৈতিক ভাষায় এটি সহযোগিতার প্রস্তাব হলেও বাস্তবে এটি ‘শর্তযুক্ত অংশীদারিত্ব’-এর বার্তা।
বিএনপির জন্য বাস্তবতা : আবেগ নয়, অর্থনীতি
নির্বাচনে ‘নিরঙ্কুশ জয়’ নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। দলের নেতৃত্বে তারেক রহমান নির্বাচনী প্রচারণায় ভারতের বিষয়ে তুলনামূলক সংযত ভাষা ব্যবহার করেছেন।
কারণ পরিষ্কার- বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন কঠিন চাপে। বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধি; রিজার্ভ কমে যাওয়া; ব্যাংকিং খাতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা পরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দেখলেই ‘মব সন্ত্রাস’ সৃষ্টি করত। যার ফলে ড. ইউনূসের শাসনামলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কখনোই নিরাপদ ছিল না। এজন্য আত্মগোপনে জীবন পার করতে হয়েছে। এখন নতুন সরকার গঠন হয়েছে। কিছুটা হলেও নিরাপদ বোধ করছেন তৃণমূলসহ দেশের মধ্যে থাকা নেতাকর্মীরা। দেশের বেশ কিছু উপজেলা ও ইউনিয়নে দেড় বছর ধরে বন্ধ থাকা দলীয় কার্যালয় খুলে দেয়া হয়েছে এটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে আওয়ামী লীগ।
জানা গেছে, গেল শনিবার জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলেন দলটির কর্মীরা। এর আগে শুক্রবার আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ের ফটকের সামনে জাতীয় পতাকা ও শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি রেখে স্লোগান দেন যুব মহিলা লীগের কয়েকজন নেত্রী। এ ছাড়াও সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়া, হবিগঞ্জ, রাজবাড়ী, পাবনা, রাজশাহী ও যশোরের বাঘাইছড়িতেও আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনের পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি সর্বপ্রথম পঞ্চগড় সদরের চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের তালা খুলে দেয়ার সংবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এক ভিডিওতে দেখা যায়, তালা খুলে দেয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন চাকলাহাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আবু দাউদ প্রধান। ১৫ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন দলটির নেতাকর্মীরা। ১৬ ফেব্রুয়ারি বরগুনার বেতাগী উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের তালা ভেঙে ঢুকে পড়েন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বেতাগী উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিফাত সিকদার ওইদিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন, ধানমন্ডি ৩২সহ আমাদের স্থানীয় দলীয় কার্যালয়ে যাতায়াত শুরু করতে। ওই দিনই সকালে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলা কার্যালয়ও খোলা হয়। অফিস খোলার পর সেখানে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার নামে দোয়া ও মুনাজাত করেন। একই দিন বিকেলে খুলনা মহানগরীর শঙ্খ মার্কেটে আওয়ামী লীগ অফিস খুলে সেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রবেশ করেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি শরীয়তপুরের পালং বাজারে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়, একই দিন সকালে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে তালা ভেঙে প্রবেশ করেন নেতাকর্মীরা এবং এসব কার্যালয়ে দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন, শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবি টাঙানোসহ ব্যানার ঝুলিয়ে রাখা হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে লাগানো হয়েছে দলীয় পরিচিতি ফলক। এর আগে দলটির চট্টগ্রাম জেলা উত্তর কার্যালয়ে পরিচিত ফলক লাগানো হয়েছিল। শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আওয়ামী সমর্থিত সাংবাদিকরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে তাদের কার্যালয় খুলে দেয়ার দাবি জানান।
ক্ষমতাচ্যুত দলটির এক শীর্ষ নেতার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. ইউনূস ছিলেন একজন আপদ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তাদের আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠন হয়েছে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিদায়কে ‘আপদ বিদায়’ হিসেবে দেখছে আওয়ামী লীগ। ওই শীর্ষ নেতা মনে করেন, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার থাকাকালীন আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দলীয় কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়নি। নতুন সরকার গঠনে অন্তত কিছু জায়গায় দলীয় কার্যালয় খোলা হয়েছে। কিছু জায়গায় নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে নির্বিঘেœ চলাফেরা করতে পারছে। পেশাজীবী নেতৃবৃন্দও তাদের কথাগুলো বলতে পারছে। একটা স্পেস সৃষ্টি হয়েছে। আগের মতো মব ভায়োলেন্স নেই বলে মনে করেন পতিত দলটির শীর্ষ নেতা। ওই নেতা বলেন, সময়ই বলে দেবে কখন আওয়ামী লীগ আগের মতো রাজনীতিতে ফিরবে।
এ প্রসঙ্গে মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো: মিরাজ হোসেন বলেন, দলের কোনো নির্দেশনার ভিত্তিতে কোনো কার্যালয় খোলা হচ্ছে না। যে উপজেলা বা ইউনিয়নে দলীয় কার্যালয় খোলা হয়েছে সেখানকার স্থানীয় আওয়ামী লীগ স্থানীয় বিএনপির সাথে সমঝোতা করে খুলেছে। তবে কিছু জায়গায় খোলার পর আবার বন্ধও করে দেয়া হয়েছে। তিনি মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। এখন নতুন সরকার গঠন হয়েছে। সংসদ অধিবেশন বসলেই বোঝা যাবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকবে নাকি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া যাবে। অবশ্য নতুন সরকার গঠন হওয়ায় এলাকা ভেদে নেতাকর্মীদের আনাগোনা বেড়েছে বলে তিনি জানান।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি নয়া দিগন্তকে বলেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠন হওয়ায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা হলেও একটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। কারণ ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের জন্য একটি মহাবিপদ ছিল। উনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকলে আওয়ামী লীগ কখনোই ফিরে আসবে এমন স্বপ্ন তারা দেখতে পেত না। নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরপরই বেশ কয়েকজায়গায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলেছে, দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে একটা আশা কাজ করছে। কিছুদিন পরে হলেও আওয়ামী লীগ যে আবার রাজনীতিতে কামব্যাক করবে সেটা সহজেয় অনুমান করা যায়। তিনি বলেন, বিএনপির সাথে কোনো ধরনের সমঝোতা হয়েছে এটা আমি মনে করি না। এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা বিচ্ছিন্ন আলাপ আলোচনা। তবে আদর্শভিত্তিক দল আওয়ামী লীগ, তাদের দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়।