ব্যাটিং মড়কে হার বাংলাদেশের

জসিম উদ্দিন রানা
Printed Edition

এক উইকেটে ৯৯ রান। কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে ডেব্যু অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজের হৃদয়ে জয়ের আলো উঁকি দেয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। পরে শতরানে হারায় দুই উইকেট। বাকি সময়টা নিশ্চই পুনরাবৃত্তি করতে চাইবেন না বাংলাদেশ দলের কেউই। হঠাৎ করেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং অর্ডার। ১০০ থেকে ১০৫ রানে নেই ৮ উইকেট। ১৭.২ ওভার থেকে ২০.৫ ওভার অর্থাৎ ১৫ বল খেলতেই মড়ক লেগেছে ব্যাটিং অর্ডারে। শেষদিকে জাকের আলি ও অভিষিক্ত তানভীর কিছুটা ব্যবধানই কমাতে পেরেছেন। প্রথমে ব্যাট করে বাংলাদেশের পেসারদের বিপরীতে ৪৯.২ ওভারে সব ক’টি উইকেট হারিয়ে অধিনায়ক আসালাঙ্কার সেঞ্চুরিতে ২৪৪ রানই করতে পারে স্বাগতিক শ্রীলঙ্কা। জবাবে জাকের আলি অনিক বুকচিতিয়ে লড়াই করলেও ৩৫.৫ ওভারে ১৬৭ রানেই গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। তাতে ৭৭ রানের জয়ে তিন ম্যাচের সিরিজে ১-০তে এগিয়ে রইল শ্রীলঙ্কা। দ্বিতীয় ম্যাচ আগামী শনিবার।

জবাবে তানজিদ হাসান তামিমের সাথে ওপেন করতে নেমে অভিষিক্ত পারভেজ হোসেন ইমনের ব্যাট পক্ষে কথা বলেনি। ১৬ বলে ৩ চারে ১৩ রান করে আসিথা ফার্নান্দোর বলে ক্যাচ আউট হয়ে সাজঘরে ফিরেন। ৪.৪ ওভারে দলীয় ২৯ রানে প্রথম উইকেটের পতন হয়। এরপর দেখেশুনে লঙ্কান বোলারদের শাসন করতে থাকেন তানজিদ হাসান তামিম ও ওয়ানডাউনে নামা টেস্ট অধিনায়কত্বকে বিদায় বলা নাজমুল হোসেন শান্ত। ২৩ রানে মেন্ডিজের বলে ছন্দপতন। এ সময় ১৬.৩ ওভারে দুই উইকেটে দলীয় শতরান পূর্ণ হয়।

৫১ বলে ৮ চার ও এক ছক্কায় হাফসেঞ্চুরি তুলে নেন তানজিদ। পরে আর বেশি দূর যেতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ৬১ বলে ৬২ রানে রান আউট হয়ে সাজঘরে ফেরেন। তারপরই যেন মড়ক লাগে বাংলাদেশ শিবিরে। ৫ রানের মাঝে হারায় ছয়টি উইকেট। পরের সময়টুকু ভুলে যেতে চাইবেন লিটন দাস (০) ও তৌহিদ হৃদয় (১)। হাসারাঙ্গার ৪ বল মোকাবেলা করে শূন্য রানে ফেরেন এলবিডব্লিউ হয়ে। আম্পায়ার শুরুতে আঙুল না তুললে রিভিউ নিয়ে লিটনকে ফেরায় লঙ্কান ইউনিট। তাদের ক্যাপ্টেন সেঞ্চুরি তুললেও বাংলাদেশ ক্যাপ্টেন ২ বল মোকাবেলায় ফেরেন খালি হাতে। তানজিম ১, তাসকিন ০, তানভীর ৫ রান করেন। একপ্রান্ত আগলে রেখে জাকের আলি অনিক শেষ ব্যাটার মোস্তাফিজকে নিয়ে নিভু নিভু দমে ক্রিকেটে থাকেন। ৬৪ বলে সমান চারটি করে চার ছক্কায় ৫১ রান করে বিদায় নেন জাকের। মোস্তাফিজ অপরাজিত থাকেন ০ রানে। শেষ পর্যন্ত ৩৫.৫ ওভারে ১৬৭ রানে থামে মিরাজ বাহিনী। বাংলাদেশকে চেপে ধরতে সাতজন বোলার ব্যাবহার করে শ্রীলঙ্কা। হাসারাঙ্গা চারটি, মেন্ডিস তিনটি, ফার্নান্দো ও থিকসানা একটি করে উইকেট নেন। এর আগে টস জিতে ব্যাট করতে নেমে শ্রীলঙ্কা ভেবেছিল উইকেট থাকবে ব্যাটিং-স্বর্গের মতো; কিন্তু শুরুতেই তাদের সেই ধারণা ভেঙে দেয় বাংলাদেশের পেসাররা। নতুন বলে বাউন্স ও গ্রিপ পাওয়া পেসারদের বুদ্ধিদীপ্ত বোলিংয়ে ধুঁকতে থাকে লঙ্কান ব্যাটিং লাইনআপ। তবে চারিথ আসালাঙ্কার দুর্দান্ত সেঞ্চুরি (১০৬) দলকে এনে দেয় লড়াইয়ের মতো সংগ্রহ। দলীয় ২৪৪ রান করতে আসালাঙ্কার সাথে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন কুসাল মেন্ডিস (৪৫), লিয়ানাগে (২৯), মিলান (২২) ও হাসারাঙ্গা (২২)।

টস হারলেও নতুন বলে ফ্রেশ উইকেটের সুবিধা দারুণভাবে কাজে লাগায় বাংলাদেশ। দুই পেসার তাসকিন আহমেদ ও তানজিম সাকিব ২৯ রানে লঙ্কানদের ৩ উইকেট তুলে নেন। এরপর মিডল অর্ডারে ছোট ছোট জুটি হলেও নিয়মিত উইকেট হারায় শ্রীলঙ্কা। তবে একজন চারিথা আসালাঙ্কা দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। তার সেঞ্চুরিতে ৪ বল থাকতে ২৪৪ রানে অলআউট হয়েছে শ্রীলঙ্কা।

গতকাল তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের প্রথমটিতে কলম্বোয় পাথুম নিশাঙ্কাকে শুরুতে তুলে নেন তানজিম সাকিব। দুই টেস্টে দুই সেঞ্চুরি করা ওপেনার প্রথম ওয়ানডে ম্যাচে ডাক মারেন। পরেই অন্য ওপেনার নিশান মাদুষ্কাকে (৬) আউট করেন দীর্ঘ দিন ইনজুরি কাটিয়ে ফেরা পেসার তাসকিন আহমেদ। ফর্মে থাকা কামিন্দু মেন্ডিসকে আউট করেন রানের খাতা খোলার আগে।

চতুর্থ উইকেট জুটিতে ৬০ রানের জুটি গড়ে ম্যাচে ফেরে শ্রীলঙ্কা। কুশল মেন্ডিস ৪৫ রান করে দলের ৮৯ রানে সাজঘরে ফেরেন। পঞ্চম উইকেটে আসালাঙ্কা ও লিয়ানাগের ৬৪ রানের জুটি হয়। ওই জুটি ভাঙেন নাজমুল শান্ত। তিনি লিয়ানাগেকে ২৯ রানে আউট করেন। আসালাঙ্কা ছোট আরো দু’টি জুটি গড়েন মিলান রতœায়েকে ও ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গাকে নিয়ে। চার ব্যাটারের সাথে জুটি গড়া লঙ্কান অধিনায়ক আসালাঙ্কা ১০৬ রানের ইনিংস খেলেন। শেষ ওভারে আউট হওয়ার আগে ১২৩ বলের ইনিংস সাজান ছয়টি চার ও চারটি ছক্কার শটে।

ইনজুরি কাটিয়ে ফেরা তাসকিন ছিলেন বাংলাদেশের সেরা বোলার। তিনি ১০ ওভারে ৪৭ রান দিয়ে ৪ উইকেট নেন। অন্য পেসার তানজিম সাকিব ৯.২ ওভারে ৪৬ রান খরচায় ৩ উইকেট নেন। এ ছাড়া অভিষেক হওয়া স্পিনার তানভীর ১০ ওভারে ৪৪ রান দিয়ে নেন ১ উইকেট। ইনজুরি নিয়ে মাঠ ছাড়ার আগে মোস্তাফিজুর রহমান ৬ ওভারে ২৪ রান দেন।

শান্ত ৪ ওভার বল করে ৩২ রান খরচায় এক উইকেট নেন। দুই বছর আগে ক্যারিয়ারের প্রথম ওয়ানডে উইকেট নিয়েছিলেন, এবার নিলেন দ্বিতীয়টি। ওয়ানডেতে নিজের দ্বিতীয় উইকেট শিকারের পর আনন্দে শান্ত কী করবেন, তা যেন ভেবেই পাচ্ছিলেন না! শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ষষ্ঠ বোলারের ভূমিকায় ছিলেন সদ্যই সাবেক হওয়া এই অধিনায়ক। প্রথম বলে বাউন্ডারি হজম করলেও শান্তর চতুর্থ বলে লং অনে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান জানিথ লিয়াঙ্গে। এতে ভেঙেছে লিয়াঙ্গে ও আসালাঙ্কার ৭৬ বলে ৬৪ রানের জুটি। এর আগে ২০২৩ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে নিজের প্রথম ওয়ানডে উইকেট নিয়েছিলেন শান্ত।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

শ্রীলঙ্কা ইনিংস : ৪৯.২ ওভার ২৪৪ (কুশল মেন্ডিস ৪৫, আসালাঙ্কা ১০৬, লিয়াঙ্গে ২৯, তাসকিন ৪/৪৭, তানজিম ৩/৪৫, তানভীর ১/৪৪, শান্ত ১/৩২)।

বাংলাদেশ ইনিংস : ৩৫.৫ ওভারে ১৬৭ (পারভেজ ১৩, তানজিদ ৬২, শান্ত ২৩, লিটন ০, তৌহিদ ১, মিরাজ ০, জাকের আলি ৫১, তানজিম ১, তাসকিন ০, তানভীর ৫, মোস্তাফিজ ০*, হাসারাঙ্গা ৪/১০, কামিন্দু ৩/১৯, আসিথা ১/৩৮, থিকসানা ১/৩২)।

ফল : শ্রীলঙ্কা ৭৭ রানে জয়ী।

ম্যাচ সেরা : চারিথ আসালাঙ্কা।

সিরিজ : তিন ম্যাচ সিরিজে ১-০তে এগিয়ে লঙ্কানরা।