সিংগাইরে ইটভাটার আগ্রাসনে গ্রাস হচ্ছে ফসলি জমি, বিপর্যস্ত কৃষি

মাটিখেকো সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য

Printed Edition

সোহরাব হোসেন সিংগাইর (মানিকগঞ্জ)

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় আবাসিক এলাকায় ও ফসলি জমির ওপর দেদারসে গড়ে উঠেছে ইটভাটা। সরকারি বিধি-নিষেধ উপেক্ষা করে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বর্তমানে অন্তত ৫৮টি ইটভাটা সচল রয়েছে। এসব ভাটায় ইট তৈরির প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ফসলি জমির ঊর্বর টপসয়েল, যা স্থানীয় কৃষির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনছে এবং স্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের মধ্যে বলধারা ইউনিয়নে সর্বাধিক ২৭টি, চান্দহরে ১৩টি, জামির্ত্তায় ছয়টি, বায়রায় ছয়টি, চারিগ্রামে তিনটি, ধল্লায় দু’টি এবং সদর ইউনিয়নে একটি ইটভাটা রয়েছে। তবে বাস্তবে ইটভাটার সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলে একাধিক সূত্র দাবি করছে। গত কয়েক বছরে কিছু ভাটা বন্ধ হলেও বর্তমানে চালু অধিকাংশ ভাটাই মালিকানা বদল করে ভাড়া ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে।

ইটভাটার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ফসলি জমির মাটি। জমির উপরিভাগ থেকে এ মাটি কেটে নেয়ায় শুধু ওই জমিই নয়, আশপাশের জমিও ভেঙে পড়ছে। এতে বহু কৃষক তাদের তিন ফসলি জমি হারিয়ে প্রায় নিস্ব হওয়ার পথে। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, বলধারা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষিজমিগুলো ইতোমধ্যে ডোবা-নালায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এ এলাকায় একটি শক্তিশালী মাটিখেকো সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। তারা প্রভাব খাটিয়ে একাধিক ইটভাটায় মাটি সরবরাহ করে আসছে।

খোলাপাড়া মৌজার বদ্দর চকের জমির মালিক আমিনুর ইসলাম, ইদ্রিস আলী, ফারুক আহমেদসহ কয়েকজন ভুক্তভোগী অভিযোগ করে বলেন, পাশের জমি গভীর করে মাটি কাটার ফলে তাদের তিন ফসলি জমি ধসে পড়েছে। তারা জানান, জমির মাটি বিক্রি না করলেও তাদেরকে জোরপূর্বক মাটি কাটার হুমকি দেয়া হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে তারা সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যের কাছে অভিযোগ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

জামির্ত্তা ইউনিয়নের হাতনি ও জাইল্লার চকে ছয়টি ইটভাটা সচল রয়েছে, যার চারটি ভাড়ায় পরিচালিত। স্থানীয় মাটিকাটা প্রতিরোধ কমিটির নেতারা জানান, পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে শুরু করে এখন সিংগাইরের ফসলি জমিতেও নিয়মিত মাটিকাটা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার নিষেধাজ্ঞা ও পরিপত্র জারি হলেও তা মানা হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্যকে ‘ম্যানেজ’ করেই রাতের আঁধারে ড্রাম ট্রাকে মাটি পরিবহন করা হয়। এতে গ্রামীণ রাস্তাঘাটেরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

চান্দহর ইউনিয়নের রিফায়েতপুর, ওয়াইজনগর, বাঘুলি ও চালিতাপাড়া চকে গড়ে ওঠা ১৩টি ইটভাটার কাঁচামালও আসছে স্থানীয় ফসলি জমি থেকে। স্থানীয়রা জানান, শক্তিশালী মাটি ব্যবসায়ী চক্রের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললেই নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

চারিগ্রাম, জামশা ও বায়রা ইউনিয়নেও একই চিত্র। দিনের বেলায় নয়, প্রশাসনের নজর এড়াতে রাতের অঁাঁধারকেই বেছে নিয়েছে মাটিখেকো চক্র। এর ফলে প্রতিবছর আবাদযোগ্য জমি কমে যাচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে কৃষি উৎপাদন। পাশাপাশি ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মো: ইলিয়াস খান স্বীকার করেন, সিংগাইরের অধিকাংশ ইটভাটা ভাড়ায় পরিচালিত। তিনি বলেন, মাটি ছাড়া ভাটা চলে না। যারা মাটির ব্যবসা করে, তারা ভাটার মালিক নয়। প্রশাসন চাইলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। অবৈধ ভাটা প্রসঙ্গে তিনি জানান, উপজেলায় অন্তত চারটি ভাটা অবৈধ। সিংগাইর থানার অফিসার ইনচার্জ মো: মাজহারুল ইসলাম বলেন, ফসলি জমির মাটিকাটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় পুলিশ সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাবিবুল বাশার চৌধুরী বলেন, এ উপজেলায় একটি ইটভাটাও পুরোপুরি বিধিসম্মত নয়। ভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে কৃষি বিভাগের মতামত নেয়া হয় না।

পরিবেশ অধিদফতর মানিকগঞ্জের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, অবৈধ ইটভাটা ও কৃষিজমির মাটিকাটা বন্ধে উপজেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে।

এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো: হাবেল উদ্দিন বলেন, চলতি মৌসুমে মাটিকাটার দায়ে সাড়ে সাত লাখ টাকা জরিমানা আদায় এবং তিনটি ভেকু অকার্যকর করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, অভিযোগ পেলেই তাৎক্ষণিক অভিযান চালানো হয়।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন এ অভিযান ও জরিমানা কি আদৌ মাটিখেকো সিন্ডিকেটের লাগাম টানতে পারছে, নাকি ফসলি জমি ধ্বংসের এ মরণখেলার আরো গতি সঞ্চার হয়?