স্রষ্টার সৃষ্টি অপার বিস্ময়
জনি সিদ্দিক
Printed Edition
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সৃষ্টি সম্পর্কে বলতে গেলে বলা যায়, সৃষ্টির প্রতিটি দিকই বিস্ময়কর। এই মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম কণা থেকে শুরু করে বিশালতম গ্রহ-নক্ষত্র পর্যন্ত সব কিছুই তাঁর অসীম ক্ষমতা, জ্ঞান এবং নিখুঁত পরিকল্পনার সাক্ষ্য বহন করে। আল্লাহর এই সৃষ্টি নৈপুণ্য কেবল আকারের বিশালতায় নয় বরং এর গভীর শৃঙ্খলা, বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের রূপায়ণে প্রকাশ পায়। প্রতিটি সৃষ্টিই তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ এবং মানুষের জন্য অফুরন্ত ভাবনার খোরাক। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন : ‘নিশ্চয় আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিন ও রাতের পরিবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৯০)
অর্থাৎ, ‘যারা আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং বিশ্বজাহানের অন্যান্য রহস্য এবং গুপ্তবিষয় সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করেন, তারা বিশ্বের স্রষ্টা এবং তার পরিচালকের পরিচয় অর্জন করতে সক্ষম হন এবং তারা জেনে যান যে, বিশাল এই পৃথিবীর সুনিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খলা ও সুব্যবস্থা-যাতে সামান্য পরিমাণও কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা যায় না- অবশ্যই তার পিছনে এমন কোনো সত্তা আছে যে তা সূক্ষ্মভাবে পরিচালনা করছে এবং তা নিয়ন্ত্রণ করছে। আর সে সত্তা হলো আল্লাহর সত্তা।’ (তাফসিরে আহসানুল বায়ান)
মহাকাশ যেন মহাশৃঙ্খলার প্রতিচ্ছবি : আল্লাহর সৃষ্টির বিশালতা বুঝতে গেলে প্রথমে মহাকাশের দিকে তাকাতে হয়। কোটি কোটি গ্যালাক্সি, অসংখ্য সৌরজগৎ এবং গ্রহ-উপগ্রহ এক সুনির্দিষ্ট নিয়মে চলমান। সূর্য নিজের কক্ষপথে ঘোরে, পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে এবং চাঁদ পৃথিবীকে। এই বিশাল বস্তুপুঞ্জের মধ্যে এতটুকু বিশৃঙ্খলা নেই। এই নিখুঁত শৃঙ্খলা প্রমাণ করে যে এর নেপথ্যে এক মহাপরিকল্পনাকারী রয়েছেন, যিনি তাঁর সীমাহীন ক্ষমতা বলে এই মহাজাগতিক ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। আল্লাহ ঘোষণা করেন : ‘তিনিই সেই সত্তা যিনি রাত ও দিন, সূর্য ও চাঁদ সৃষ্টি করেছেন; সবাই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করছে।’ (সূরা আম্বিয়া : ৩৩) এই শৃঙ্খলাই মহান স্রষ্টার অপার সৃষ্টির প্রথম ও প্রধান বিস্ময়। এতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের শক্তিমত্তার প্রকাশ পায়।
প্রকৃতির রূপ যেন সৌন্দর্যের লীলাভূমি : পৃথিবীর বুকে আল্লাহর সৃষ্টি আরো নিবিড় ও মনোরম। পাহাড়ের দৃঢ়তা, সমুদ্রের গভীরতা এবং মরুভূমির নিঃসঙ্গতা, সবই তাঁর অনন্য সৃষ্টির অংশ। প্রকৃতিতে বিরাজমান বৈচিত্র্য মানুষকে মুগ্ধ করে। একটি বীজ থেকে বিশাল বৃক্ষের জন্ম হয়, যা ফল দেয় এবং ছায়া প্রদান করে। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য কেবল চোখকে তৃপ্তি দেয় না বরং জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য অক্সিজেন ও খাদ্য সরবরাহ করে।
বিভিন্ন রঙের ফুল, বিভিন্ন প্রকারের প্রাণী, নদ-নদীর অবিরাম বয়ে চলা এসবই আল্লাহর সুনিপুণ কারিগরির স্বাক্ষর। আল্লাহ তায়ালা বলেন : ‘আর তিনিই আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, তারপর তা দিয়ে আমরা সব রকমের উদ্ভিদের চারা উদগম করি; এরপর তা থেকে সবুজ পাতা উদগত করি। যা থেকে আমরা ঘন সন্নিবিষ্ট শস্যদানা উৎপাদন করি। আরো (নির্গত করি) খেজুর গাছের মাথি থেকে ঝুলন্ত কাঁদি, আঙুরের বাগান, যায়তুন ও আনার। একটার সাথে অন্যটার মিল আছে, আবার নেইও। লক্ষ্য করুন, ওগুলোর ফলের দিকে যখন সেগুলো ফলবান হয় এবং সেগুলো পেকে ওঠার পদ্ধতির প্রতি। নিশ্চয় মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য এগুলোর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।’ (সূরাতুল আনআম-৯৯) রাসূলুল্লাহ সা: প্রকৃতির প্রতি সদয় হতে শিখিয়েছেন। তিনি অকারণে গাছ কাটতে নিষেধ করেছেন। যেমন হজরত আব্দুল্লাহ ইবনু হুবশী রা: সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, যে ব্যক্তি কুলগাছ কাটবে, আল্লাহ তাকে মাথা উপুড় করে জাহান্নামে ফেলবেন।’ ইমাম আবু দাউদ রহ:-কে এ হাদিসের তাৎপর্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এটি দীর্ঘ হাদিসের সংক্ষিপ্ত রূপ। এই হাদিস দ্বারা উদ্দেশ্য, খোলা ময়দানের কুলগাছ, যার ছায়ায় পথচারী ও চতুষ্পদ প্রাণী আশ্রয় নিয়ে থাকে তা কোনো ব্যক্তি নিজ মালিকানাহীন, অপ্রয়োজনে ও অন্যায়ভাবে কেটে ফেললে আল্লাহ তাকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।
(বিস্তারিত আবু দাউদ শরিফ : ৫২৩৯ নম্বর হাদিসে পাবেন) এই হাদিস থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, প্রকৃতির প্রতি যতœশীল হওয়া ইবাদতের অংশ। বিনা কারণে প্রয়োজন ছাড়া কোনো গাছ কেটে ফেলা যাবে না।
মানব দেহ, সে তো শ্রেষ্ঠতম শিল্প ও চিন্তার উৎস : আল্লাহর সৃষ্টির সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও বুদ্ধিদীপ্ত অংশ হলো মানুষ। মানুষকে দেয়া হয়েছে চিন্তা করার ক্ষমতা, জ্ঞান অর্জন করার সুযোগ এবং ভালো-মন্দ বিচারের শক্তি। মানুষের শরীরবৃত্তীয় গঠন এক চরম বিস্ময়। প্রতিটি অঙ্গ, প্রতিটি কোষ একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধন করে। প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কতটুকু নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছে চিন্তা করলে মাথা হ্যাং হয়ে আসে। সুবহানাল্লাহ। প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিজ নিজ দায়িত্বে কখনো অবহেলা করে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন : ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম গঠনে।’ (সূরা আত-ত্বীন : ৪) অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসির ফাতহুল ক্বাদীরে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি প্রাণীকে সৃষ্টি করেছেন নিচুমুখী করে। কেবল মানুষকে সৃষ্টি করেছেন আলম্বিত দেহ সোজা করে; যে নিজের হাত দিয়ে পানাহার করে। তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে যথোপযোগী বানিয়েছেন। তাতে পশুর মতো বেমানান ও অসামঞ্জস্য নেই। প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছেন এবং তার মাঝে উচিত ব্যবধানও রেখেছেন। তাতে বিবেক-বুদ্ধি, চিন্তা-চেতনা, বোঝশক্তি, প্রজ্ঞা, শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি দান করেছেন। যার ফলে মানুষ আসলে তাঁর কুদরতের প্রকাশস্থল এবং তাঁর শক্তিমত্তার প্রতিবিম্ব।’
মানুষকে আল্লাহ শুধু দৈহিক সৌন্দর্যই দেননি দিয়েছেন আবেগ, বিবেক এবং আধ্যাত্মিক আকাক্সক্ষা। এই বোধ ও মনন মানুষকে অন্যান্য সৃষ্টি থেকে স্বতন্ত্র করেছে এবং স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পথও দেখিয়েছে। মানুষকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, ‘আমি জিন ও মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছি একমাত্র আমার ইবাদত করার জন্য।’ (সূরা আয-যারিয়াত : ৫৬) অর্থাৎ, সব সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করা, আর এই ইবাদতের জন্য চিন্তাশীল মানব মস্তিষ্কই শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। ‘তাফসিরে আহসানুল বায়ানে’ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, ‘এই আয়াতে সব মানুষ ও জিনকে জীবনের সেই উদ্দেশ্যের কথা স্মরণ করানো হয়েছে, যেটাকে তারা ভুলে গেলে পরকালে কঠোরভাবে জিজ্ঞাসিত হবে এবং এই পরীক্ষায় তারা অসফল গণ্য হবে, যাতে মহান আল্লাহ তাদেরকে ইচ্ছা ও এখতিয়ারের স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছেন।’
ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সৃষ্টি রহস্যের জগৎ : বিশাল মহাবিশ্ব ও মানবদেহ ছাড়াও আল্লাহর অসংখ্য সৃষ্টি রয়েছে যা খালি চোখে দেখা যায় না। অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়া, যা জীবনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষ এই ক্ষুদ্র জগতের রহস্য উন্মোচন করছে, আর এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সৃষ্টির মধ্যেও যে বিশাল ব্যবস্থাপনা ও জটিলতা লুকিয়ে আছে, তা দেখে আরো বেশি বিস্মিত হচ্ছে। আল্লাহ প্রশ্ন করেন : ‘তবে কি তারা উটের দিকে তাকায় না, কীভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে? আর আকাশের দিকে, কীভাবে তা উত্তোলন করা হয়েছে? আর পাহাড়ের দিকে, কীভাবে তা স্থাপন করা হয়েছে? আর পৃথিবীর দিকে, কীভাবে তা বিছানো হয়েছে?’ (সূরা গাশিয়াহ ১৭ থেকে ২০ আয়াত) এই আয়াতগুলো ছোট-বড় সব সৃষ্টির মাধ্যমেই তাঁর নিদর্শন দেখতে উৎসাহিত করে। তবে প্রাবন্ধিক ও গবেষক ওমর আল জাবির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, ‘জীবনে বহুবার এই চারটি প্রশ্ন আল্লাহর কাছ থেকে শুনেছি। কিন্তু কখনো উত্তর খোঁজার চেষ্টা করিনি। কত সহজে চারটি কুরআনের আয়াতের ওপর আমল করতে পারতাম। কিন্তু করিনি। আজকে মুসলিম জাতির জ্ঞান-বিজ্ঞানে অন্য সব জাতির থেকে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ হচ্ছে আমার মতো মুসলিমরা, যারা কুরআনে পরিষ্কারভাবে সৃষ্টিজগত, বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করার পরিষ্কার নির্দেশ থাকার পরও শুধু নামাজ, রোজা, জাকাত আদায় করে জীবন পার করে দেয়। আর টাখনুর উপরে কাপড়, দাড়ির দৈর্ঘ্য, জোরে আমিন বলা নিয়ে নিয়ে তর্কে ব্যস্ত থাকে। আরো লজ্জার ব্যাপার হলো, এসব প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আমাদের অমুসলিম বিজ্ঞানীদের গবেষণার ফলাফলের মুখাপেক্ষী হতে হয়। নিজেদের অর্জন বলতে গেলে কিছুই নেই।
কুরআনের চারটি আয়াতের ওপর আমরা সহজেই আমল করে ফেলতে পারব এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে। এই প্রশ্নগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে প্রাণীবিজ্ঞান, মহাকাশবিজ্ঞান, ভূবিজ্ঞান এবং মৃত্তিকা বিজ্ঞানের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। নিঃসন্দেহে এই চারটি বিজ্ঞানে মানুষের জন্য বিরাট কল্যাণ রয়েছে।
আমরা যদি মহান প্রভুর সৃষ্টিকুল নিয়ে এক মুহূর্তও গবেষণা করি তাহলে এমনিতেই মাথা সিজদাবনত হয়ে যাবে। আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিকুল এর মধ্য থেকে বেশ কয়েকটি প্রাণী, কীটপতঙ্গের নামে পবিত্র কুরআন মাজিদে সূরা অবতীর্ণ করেছেন। আমরা সামান্য মশা-মাছি, পিঁপড়া বা প্রজাপতি সম্পর্কেও যদি ভাবি, তাহলে মুখে অটোমেটিক সুবহানাল্লাহ উচ্চারিত হয়ে যাবে। সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি সুবহানাল্লাহিল আজীম।
লেখক : প্রবন্ধকার