বাংলাদেশের স্বস্তি সিরিজ সমতায়

জসিম উদ্দিন রানা
Printed Edition

এক দিনে বাংলাদেশের তিন ফরম্যাটে চার দলের জয়। দিনের শুরুতে চীন থেকে অনূর্ধ্ব- ১৮ এশিয়া কাপে বিজয়ের খবর শুনিয়েছে পুরুষ ও নারী হকি দল। পুরুষ দল শ্রীলঙ্কা এবং নারী দল উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জয় পায়। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাতে মিয়ানমারের মাটিতে এশিয়ান কাপ ফুটবল বাছাইয়ে তুর্কিমিনিস্তানকে হারায় বাংলাদেশের মেয়েরা। দেশবাসী অপেক্ষায় ছিল রাতে লঙ্কাজয় হবে কি না টাইগারদের। অবশেষে সেটিও বাংলাদেশ জিতে নিলো ১৬ রানে। প্রথমে ব্যাট করে বাংলাদেশ ৪৫.৫ ওভারে ২৪৮ রান করে। জবাবে শ্রীলঙ্কা ৪৮.৫ ওভারে ২৩২ রান করলে ১৬ রানে জয় পায় সফরকারীরা। তাতে তিন ম্যাচ সিরিজে ১-১ সমতা। সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচ আগামী মঙ্গলবার।

জয়ে স্বস্তি ফিরেছে বাংলাদেশ শিবিরে। প্রথম ম্যাচে বাজে হারের পর বিভিন্ন আলোচনা-সমালোচনায় বিদ্ধ হয়ে আত্মবিশ্বাস তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল টাইগারদের। সেটি থেকে পরিত্রাণ পেল মেহেদী হাসান মিরাজের ওডিআই দল। লিটনকে বাদ দেয়ার ফলই কি এই জয়। নাকি সম্মিলিত আক্রমণের ফসল। নাকি একটা দল হয়ে খেলার ফসল। দল হয়ে তো আগেও খেলেছিল। তবে গতকাল কী এমন হলো! নাকি এক ক্যাপ্টেন কম থাকার প্রেরণা। শান্ত টেস্ট ক্যাপ্টেন্সি ছাড়ার সময় বলেছিলেন ড্রেসিরুমে তিন ক্যাপ্টেন বিব্রতকর। তবে কি দুই ক্যাপ্টেন নিষ্কণ্টক! আপাতত বাংলাদেশ জিতেছে, আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে- সেটিই বড় কথা।

দুই উইকেটে বাংলাদেশ করেছিল ১১০ রান। ইনিংসের ২৮তম ওভারে চার উইকেটে স্কোর ১৫৮। মনে হয়েছিল আড়াই শ’ রান পেরোনো সময়ের ব্যাপার মাত্র। বেশ উত্থান-পতনে শেষ অব্দি মান বাঁচানো পুঁজি পেয়েছে বাংলাদেশ। ব্যাট হাতে হাফসেঞ্চুরি করেছেন পারভেজ হোসেন ইমন (৬৭) ও তৌহিদ হৃদয় (৫১)। শেষ দিকে ঝড়ো ইনিংস খেলেন তানজিম হাসান সাকিব (৩৩*)। জবাবে খেলতে নামলে তানভীরের পাঁচ উইকেট প্রাপ্তিতে স্বাগতিকরা গুটিয়ে যায় ২৩২ রানে।

জবাবে খেলতে নেমে কিছুটা আক্রমণাত্মক শুরু করে স্বাগতিকরা। তবে দ্বিতীয় ওভারের শেষ বলে তানজিম হাসান সাকিব এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন পাথুম নিশাঙ্কাকে (৫)। দ্বিতীয় উইকেটের জন্য অপেক্ষা করতে হয় দশম ওভার পর্যন্ত। দলীয় ৭৫ রানে ওপেনার মধুষ্কাকে (১৭) তৌহিদ হৃদয়ের ক্যাচ বানান তানভীর ইসলাম। ১২তম ওভারে কুশল মেন্ডিসকে এলবিডব্লিউ করেন ওই তানভীর। ততক্ষণে তিনি টি-২০ স্টাইলে ৩১ বলে ৯ চার ও এক ছক্কায় ৫৬ করেন। ১৮তম ওভারে দলীয় ৯৯ রানে চারিথা আসালাঙ্কাকে (৬) বিদায় করেন শামীম পাটোয়ারী। এরপর ২৬তম ওভারে কামিন্দু মেন্ডিসকে (৩৩) ফিরিয়ে তৃতীয় উইকেট ঝুলিতে পুরেন তানভীর।

এরপর ওয়েল্লালাগেকে এক ও মাহেশ থিকসানাকে দুই রানে ফিরিয়ে প্রথমবারের মতো ১০ ওভারে দুই মেডেনে ৩৯ রান খরচায় পাঁচ উইকেট পূর্ণ করে তানভীর। এই সিরিজের প্রথম ম্যাচে ওয়ানডে অভিষেক হয়েছে তার। দ্বিতীয় ম্যাচেই পেলেন ফাইফার। অবশ্য লিস্ট এ ক্রিকেটে তার ছয় উইকেট রয়েছে। দলীয় ১৭০ রানে ৮ উইকেট হারায় স্বাগতিকরা। দুশমন্থ চামিরা ও লিয়ানাগে ভোগাচ্ছে বাংলাদেশকে। বিপদের মধ্যেও ৭৫ বলে সমান চারটি করে চার ছক্কায় হাফসেঞ্চুরি তুলে নেন লিয়ানাগে। অবশেষে মোস্তাফিজ নিজের বলে নিজে ক্যাচ নিয়ে ৭৮ রানে বিদায় করেন লিয়ানাগেকে। তখন জয়ের জন্য দরকার ১৬ বলে ২১ রান। ৪৮.৪ ওভারে সাকিবের ক্যাচ মিস। পরের বলেই চামিরার অব স্ট্যাম্প উড়িয়ে দেন সাকিব। তাতে ৪৮.৫ ওভারে ২৩২ রানে অলআউট শ্রীলঙ্কা। বাংলাদেশের জয় ১৬ রানে।

এর আগে কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে প্রথমবারের টসে জিতে অধিনায়ক মিরাজ ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন। বাংলাদেশ দল দু’টি পরিবর্তন নিয়ে মাঠে নেমেছে। একাদশে জায়গা পেয়েছেন শামিম হোসেন ও হাসান মাহমুদ। বাদ পড়েছেন লিটন দাস ও চোটের কারণে বাদ তাসকিন আহমেদ। তবে শুরুটা ছিল হতাশাজনক। ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম মাত্র সাত রান করে ফিরে যান দলীয় ১০ রানে। এরপর ইমন ও নাজমুল হোসেন শান্ত জুটি গড়ে দলকে কিছুটা সামাল দেন। দলের রান যখন ৭৩, তখন ১৪ রান করে ফেরেন সদ্যই টেস্ট অধিনায়কত্ব ছাড়া শান্ত। ইমন এর পরও চালিয়ে যান আক্রমণাত্মক ব্যাটিং, তুলে নেন হাফসেঞ্চুরি। কিন্তু ৬৯ বলে ৬৭ রান করে তিনিও থেমে যান। এরপরের সময়টায় নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারায় বাংলাদেশ।

অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ ফেরেন ৯ রানে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে দুই বলে ০ রানে আউট হয়েছিলেন। ওই ম্যাচে ক্যাপ্টেন হিসেবে অভিষেক হয়েছিল তার। দ্বিতীয় ওয়ানডেতেও দাঁড়াতে পারলেন না। এবার ১০ বলে ৯ রান করে ফিরলেন মিরাজ। শামীম পাটোয়ারী করেন ২২ রান। তৌহিদ হৃদয় ও জাকের আলী মিলে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন। তবে তানজিমের সাথে ভুল বোঝাবুঝিতে রান আউট হন হৃদয়।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটিটি আসে ষষ্ঠ উইকেটে; জাকের আলী ও তৌহিদ হৃদয় যোগ করেন ৪৫ রান। বড় ইনিংসের সম্ভাবনা জানিয়ে জাকের ২৪ রানে আউট হয়ে গেলেও হৃদয় করেন ৫১ রান। এই ইনিংসের সুবাদেই হৃদয় ওয়ানডেতে এক হাজার রানের মাইলফলকে পা রেখেছেন। বাংলাদেশের ২৫তম ব্যাটার হিসেবে এক হাজার রান করলেন তিনি। হাজার রান করতে ৩৩ ইনিংস খেলতে হয়েছে তাকে। তার চেয়ে কম ইনিংসে হাজার রান করার কৃতিত্ব শুধু দু’জনের, শাহরিয়ার নাফিস (২৯) ও এনামুল হকের (২৯)।

শেষ দিকে বাংলাদেশের স্কোর আড়াই শ’র কাছাকাছি নিয়ে যান তানজিম হাসান সাকিব। মাত্র ২১ বলে ৩৩ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। শেষ উইকেট হিসেবে মোস্তাফিজ এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন শূন্য রানে। ৪৫.৫ ওভারে সব ক’টি উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের ইনিংস থামে ২৪৮ রানে।

শ্রীলঙ্কার হয়ে সর্বোচ্চ চার উইকেট নিয়েছেন আসিথা ফার্নান্দো, তিনটি উইকেট পেয়েছেন ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা। একটি করে উইকেট নিয়েছেন দুশমন্ত চামিরা ও চারিথ আসালাঙ্কা। গতকালও সাত বোলার ব্যবহার করে সফরকারীরা।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

বাংলাদেশ : ৪৫.৫ ওভারে ২৪৮/১০ (পারভেজ ৬৭, তানজিদ ৭, শান্ত ১৪, হৃদয় ৫১, মিরাজ ৯, শামীম ২২, জাকের ২৪, তানজিম ৩৩*, হাসান ০, তানভীর ৪, মোস্তাফিজ ০; আসিথা ৪/৩৫, চামিরা ১/৩৭, আসালাঙ্কা ১/২৪, হাসারাঙ্গা ৩/৬০)।

শ্রীলঙ্কা : ৪৮.৫ ওভারে ২৩২ (কুশল ৫৬, কামিন্দু ৩৩, লিয়ানাগে ৭৮, মিরাজ ১/৩৭, তানভীর ৫/৩৯, সাকিব ২/৩৪, মোস্তাফিজ ১/৫৬, শামিম ১/২২)।

ফল : বাংলাদেশ ১৬ রানে জয়ী।

সিরিজ : তিন ম্যাচ সিরিজে ১-১ সমতা।