প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে গুলির নির্দেশদাতা ম্যাজিস্ট্রেটরা
Printed Edition
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ২০২৪-এর জুলাইয়ে রাস্তায় নেমে আসে অগণিত ছাত্র-জনতা। কোটা আন্দোলন রূপ নেয় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয় বিভিন্ন বয়সী দেড় সহস্রাধিক মানুষ। এ সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে দায়িত্ব পালন করা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা বিচারের আওতায় আসার কথা থাকলেও উল্টো তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বহাল রয়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র ওঠে এসেছে। চব্বিশের জুলাই মাসের প্রথম দিকে কোটাবিরোধী ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে শিক্ষার্থীরা। এই আন্দোলন দমন করতে সারা দেশে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে বিক্ষুব্ধদের ওপর ক্র্যাকডাউন চালানো হয়। বিভিন্ন বাহিনীতে থাকা সরকারের অনুগত লোকদের নামিয়ে দেয়া হয় রাস্তায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সহিংস ওই পরিস্থিতিতে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগে ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত ছিল অথবা আওয়ামী পরিবারের সদস্য এমন কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দেয়া হয়। সম্ভাব্য কর্মকর্তাদের বিষয়ে নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন ইতিবাচক আসলে তাদের ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় : ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দেয়া তথ্যানুযায়ী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে গুলির নির্দেশ দেয়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ৯৫ জনের তালিকার ৫৬ নম্বরে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-৯ মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন সারোয়ারের নাম। এই কর্মকর্তা শেখ হাসিনার শাসনামলে রাষ্ট্রপতির প্রটোকল অফিসার এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ এপিডি অনুবিভাগে কর্মরত ছিলেন। জুলাই আন্দোলনের সময় ১, ৪ এবং ৫ আগস্ট ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ : তালিকার ৫৭ নম্বরে রয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব নিকারুজ্জামানের নাম। এই কর্মকর্তা কক্সবাজারের উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে ২০১৮ সালের রাতের ভোটে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তারা বাবা ওয়াহিদুজ্জামান চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তার আপন ছোট ভাই তানভীর চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। জুলাই আন্দোলনের সময় নিকারুজ্জামান ২০, ২১, ২৩, ২৬, ২৭, এবং ৩০ জুলাই রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তালিকার ৭৭ নম্বরে রয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব এস এম মুনিম লিংকন এর নাম। এই কর্মকর্তা ২০, ২১, ২৩, ২৬, ২৭, ৩০ জুলাই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তালিকার ৮৫ নম্বরে রয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মো: আক্তারুজ্জান এর নাম। এই কর্মকর্তা ১-৫ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় : তালিকার ১ নম্বরে রয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোছা: আকলিমা বেগমের নাম। এই কর্মকর্তা ওই সময় ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ৫ আগস্টের পর তাকে টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে বদলি করা হয়। সম্প্রতি তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পদায়ন নিয়েছেন।
তালিকার ৬০ নম্বরে রয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (গাড়ি সেবা শাখা) মইন উদ্দিন ইকবালের নাম। এই কর্মকর্তা ৪ আগস্ট ঢাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তালিকার ৫৫ নম্বরে রয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আলমগীর কবীরের নাম। এই কর্মকর্তা ৪ আগস্ট হানিফ ফ্লাইওভার, শনির আখড়ায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ছাড়াও সচিবালয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে গুলির নির্দেশদাতা এসব নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা এখনো দায়িত্ব পালন করছেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় : তালিকার ৫৩ নম্বরে রয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব স্নেহাশীষ দাশ। এই কর্মকর্তা ১ থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত রামপুরা-বাড্ডাসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করেছেন। তালিকার ৬৮ নম্বরে রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সুজিৎ দেবনাথ। এই কর্মকর্তা ২০, ২১, ২৩, ২৬, ২৭, ৩০ এবং ৩১ জুলাই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তালিকার ৮৪ নম্বরে থাকা খন্দকার রবিউল ইসলাম ২০,২১,২৩,২৬,২৭, ৩০,৩১ জুলাই এবং ১, ২, ৩, ৫ আগস্ট রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন।
বাণিজ্য সচিবের একান্ত সচিবসহ ২ কর্মকর্তা : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নতুন পদায়ন হওয়া সচিব মো: আতাউর রহমান খানের একান্ত সচিব হিসেবে পদায়ন হওয়া কর্মকর্তার নাম শেখ শামসুল আরেফিন। গুলির নির্দেশদাতা ম্যাজিস্ট্রেটদের তালিকায় এই কর্মকর্তার নাম রয়েছে ৮০ নম্বরে। ২০২৪ সালের ৪ ও ৫ আগস্ট ইসিবি এবং রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তালিকার ৪৮ নম্বরে রয়েছেন একই মন্ত্রণালয়ে কর্মরত সিনিয়র সহকারী সচিব মেহেদী হাসান। এই কর্মকর্তা ২০, ২১, ২৩, ২৬, ২৭, ৩০ ও ৩১ জুলাই রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয় : তালিকার ৭৬ নম্বরে রয়েছে অর্থ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব সৈয়দ আশরাফুজ্জামানের নাম। এই কর্মকর্তা জুলাইয়ের ২০, ২১, ২৩, ২৬, ২৭, ৩০, ৩১ তারিখ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন। একই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব দেবাংশু কুমার সিংহের নাম রয়েছে তালিকার ৬৪ নম্বরে। এই কর্মকর্তা আগস্টের ১, ২, ৩, ৫ তারিখ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেসির দায়িত্ব পালন করেছেন। একই মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মাসুদ রানার নাম রয়েছে তালিকার ৬১ নম্বরে। এই কর্মকর্তা ৪ এবং ৫ আগস্ট মতিঝিল-হানিফ ফ্লাইওভারে দায়িত্ব পালন করেন।
এ ছাড়া ১৮ জুলাই রামপুরা টিভি ভবন এলাকায় ২৭৯ রাউন্ড গুলির নির্দেশদাতা ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার সায়েম ইমরান রয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে। ১৮ জুলাই ছাড়াও এই কর্মকর্তা ২৩, ২৬, ২৭ ও ৩০ জুলাই এবং ২, ৩ ও ৫ আগস্ট রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে ওই কর্মকর্তা ভোল পাল্টে চট্টগ্রাম অঞ্চলের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর ভাগ্নে পরিচয় দিয়ে বর্তমান সরকারে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলে মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ পদে ঢাকার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কর্মকর্তারাও : তালিকার তথ্যানুযায়ী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ৫১ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সব কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ঢাকার বাইরে বদলি করলেও বেশির ভাগই ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব পালন করছেন। তালিকার ২ নম্বরে থাকা আব্দুল্লাহ আল রনী পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে, ৩ নম্বরে থাকা রাফে মোহাম্মদ ছড়া আশুগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ১৪ নম্বরে থাকা মৌসুমী নাসরিন মানিকগঞ্জ সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ১৫ নম্বরে থাকা উমর ফারুক কেরানীগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ২২ নম্বরে থাকা শরীফ মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার হিসেবে বহাল, ২৫ নম্বরে থাকা সাদিয়া আক্তার নারায়ণগঞ্জ সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি), ২৭ নম্বরে থাকা নুসরাত নওশীন ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার হিসেবে বহাল, ২৯ নম্বরে থাকা জাহাঙ্গীর নগর বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল্লাহ আল মামুন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে, ৩৭ নম্বরে থাকা মনিষা রানী কর্মকার শিবালয়ের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ৩৯ নম্বরে থাকা আসিফ রহমান নবাবগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি), ৫১ নম্বরে থাকা শাইখা সুলতানা শিবচরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কর্মরত আছেন।