হামলা হলে ওয়াশিংটনকে পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি তেহরানের
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ইসরাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো তেহরানের ‘বৈধ নিশানায়’ পরিণত হবে বলে হুঁশিয়ার করেছে ইরান। ইরানে বিক্ষোভে সমর্থন জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে ওয়াশিংটন হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে নিয়মিতই আভাস দিয়ে যাচ্ছেন। সর্বশেষ শনিবার রাতেও তিনি লিখেছেন, ‘ইরান স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে আছে, যেমনটা সম্ভবত আগে কখনোই হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে প্রস্তুত।’
এর প্রতিক্রিয়ায় রোববার ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ ‘হামলা হলে পাল্টা জবাবের’ এ হুঁশিয়ারি দিলেন বলে জানিয়েছে। এমন এক সময়ে কালিবাফের এ মন্তব্য এলো, যখন ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হস্তক্ষেপ নিয়ে ইসরাইল সতর্কাবস্থায় রয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে। তাদের সূত্রগুলো শনিবার ইসরাইলের নিরাপত্তাসংক্রান্ত এক আলোচনায় উপস্থিত থাকলেও এ ‘উচ্চ সতর্কাবস্থার’ মানে কী তা বিস্তারিতভাবে জানায়নি।
গত বছরের জুনে ইসরাইল ও ইরান ১২ দিনের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়েছিল। এই লড়াইয়ে ইসরাইলের পক্ষ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলাও চালায়। ইসরাইলি একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, ইরানে সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে শনিবার প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ফোনালাপ হয়েছে।
মার্কিন এক কর্মকর্তাও নেতানিয়াহু-রুবিও আলোচনার খবর নিশ্চিত করেছেন। তবে তাদের মধ্যে কী নিয়ে কথা হয়েছে তা জানাননি তিনি। লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে সপ্তাহ দুয়েক আগে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এরইমধ্যে ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও এখন পর্যন্ত তাতে হস্তক্ষেপ করার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি ইসরাইল।
তেহরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে ইসরাইলের উদ্বেগের কারণে দুই আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। শুক্রবার ইকোনমিস্টে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরান যদি ইসরাইলে আক্রমণ করে তবে দেশটিকে মারাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হবে। চলমান প্রতিবাদের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, বাকি সবকিছুর সাথে আমাদের দেখা উচিত ইরানের ভেতরে কী ঘটছে।’
উচ্চ সতর্কাবস্থায় ইসরাইল
এদিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনার মধ্যে উচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছে ইসরাইল। এ বিষয়ে ধারণা আছে এমন তিনজন ইসরাইলি সূত্র রয়টার্সকে এমনটি জানিয়েছেন। গত কয়েকদিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ইরানে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। শনিবার ট্রাম্প বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে প্রস্তুত আছে।’
রয়টার্সের সূত্রগুলো শনিবার ইসরাইলের নিরাপত্তাসংক্রান্ত এক আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু দেশটির উচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার অর্থ কী তা বিস্তারিতভাবে জানাননি। জুনে ইসরাইল ও ইরান ১২ দিন ধরে চলা এক যুদ্ধে জড়িয়েছিল। এই লড়াইয়ে ইসরাইলের পক্ষ হয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
ইসরাইলি একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, শনিবার এক ফোন কলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাথে ইরানে সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেছেন। মার্কিন এক কর্মকর্তাও নেতানিয়াহু ও রুবিওর মধ্যে কথা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন। তবে তারা কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন তা জানাননি।
ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লেও সেখানে হস্তক্ষেপ করার কোনো আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়নি ইসরাইল। যদিও ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে ইসরাইলের উদ্বেগের কারণে দুই আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। শুক্রবার ইকোনমিস্টে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরান যদি ইসরাইলে আক্রমণ করে তবে দেশটিতে মারাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হবে। চলমান প্রতিবাদের প্রশংসা করে তিনি বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, বাকি সবকিছুর সাথে আমাদের দেখা উচিত ইরানের ভেতরে কী ঘটছে।’
রুবিও-নেতানিয়াহু ফোনালাপ
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শনিবার ফোনে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে কথা বলেছেন বলে জানিয়েছে এক মার্কিন কর্মকর্তা। তবে ফোনালাপের বিস্তারিত বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য জানানো হয়নি। তবে এর আগে অ্যাক্সিওস জানিয়েছিল, রুবিও ও নেতানিয়াহুর আলোচনায় গাজা পরিস্থিতি, সিরিয়া ইস্যু এবং ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ উঠে আসে।
অস্থিরতা উসকে দিতে ইসরাইলের ডিজিটাল নেটওয়ার্ক
হারেৎজ জানায়, ইরানে অস্থিরতা উসকে দিতে ও পুনরায় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে শেষ শাহের পুত্র রেজা পাহলভিকে ক্ষমতায় বসাতে ইসরাইলের পক্ষ থেকে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর তথ্য পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে দখলদার দেশটি থেকে পরিচালিত একটি বিস্তৃত ও সংগঠিত অনলাইন ক্যাম্পেইনের বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে।কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সংস্থা সিটিজেন ল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত বছর ইসরাইলের বিমান হামলার সময় তেহরানের এভিন কারাগার ঘিরে পারস্য ভাষায় ডিপফেক ভিডিও ও ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়। একই সাথে ইসরাইলের প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য মার্কার ও হারেৎজের যৌথ তদন্তে জানা গেছে, এসব পারস্য ভাষার অনলাইন প্রচারণা পরোক্ষভাবে ইসরাইলের অর্থায়নে পরিচালিত হয়েছে। ২০২৩ সালের শুরুতে রেজা পাহলভি প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক সফরে ইসরাইল যান। তিনি ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পুত্র। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবে তার বাবা ক্ষমতাচ্যুত হন ও ইরানে আয়াতুল্লাহদের নেতৃত্বে নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইসরাইলের তৎকালীন গোয়েন্দামন্ত্রী ও বর্তমান বিজ্ঞানমন্ত্রী গিলা গামলিয়েল তাকে ‘ইরানের যুবরাজ’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। এই সফরটি হারেৎজসহ ইসরাইলি গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। প্রতিবেদনে সরকারি বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে বলা হয়, ইসরাইল ও ইরানের জনগণের মধ্যে শত্রুতা নেই; বিরোধ কেবল ইসরাইলি সরকারের সাথে তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর।
ইরানি প্রবাসীদের একটি অংশের মধ্যে রেজা পাহলভির কিছু জনপ্রিয়তা থাকলেও, ইরানের ভেতরে জনগণ তাকে নেতা হিসেবে চায় কি না, তা স্পষ্ট নয়। তিনি এমন একজন সাবেক স্বৈরশাসকের পুত্র, যিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সমর্থন পেয়েছিলেন। তার বাবার শাসনামল পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতি উন্মুক্ত হলেও দুর্নীতি, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও বিরোধীদের ওপর নির্যাতনের জন্য কুখ্যাত ছিল।
ইসরাইলি গুপ্তচর গ্রেফতার
তাসনিম নিউজ জানায়, ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যেই ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে এক বিদেশীকে আটক করেছে দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ইন্টেলিজেন্স অরগানাইজেশন। শনিবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, আইআরজিসি ইন্টেলিজেন্স অরগানাইজেশন জানিয়েছে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে ইসরাইলের গুপ্তচর হিসেবে কাজ করার জন্য গোপনে ইরানে এসেছিলেন ওই বিদেশী নাগরিক। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অবস্থা মূল্যায়ন করার সময় গুপ্তচরবৃত্তির দৃঢ় প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানায় আইআরজিসি ইন্টেলিজেন্স বাহিনী।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমের খবরে বলা হয়, ইরানের রাজতন্ত্রের পক্ষে সহিংস দাঙ্গাবাজরা গত কয়েক দিনে ইরানের বেশ কয়েকটি শহরে সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করেছে। কিছু সাধারণ মানুষ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যকে হত্যা করেছে এবং অনেককে আহত করেছে।
ইরানের বেশ কয়েকটি শহরে সহিংস অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার ফলে সরকারি ভবন, ব্যক্তিগত দোকান এমনকি মসজিদেরও ক্ষতি হয়েছে। রাজতন্ত্রের সমর্থক দাঙ্গাবাজরা সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করেছে, রাস্তা অবরোধ করেছে, প্রশাসনিক ভবন ও পুলিশ স্টেশনে আক্রমণ করেছে।