চন্দনাইশে ৪৫ বছর পর প্রাণ পেল জিয়াউর রহমান খাল
Printed Edition
এস এম রহমান পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)
চট্টগ্রামের চন্দনাইশে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ‘জিয়াউর রহমান খালে’ প্রায় সাড়ে চার দশক পরে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) উদ্যোগে চলমান ‘চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের’ আওতায় খালটি পুনঃখনন করা হয়েছে। এর ফলে এক সময়ের অবহেলিত এই খাল এখন কৃষকের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠছে।
জানা যায়, ১৯৮০ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান নিজে কোদাল হাতে চন্দনাইশের বরুমতি খালের মাটি কেটে এই খাল খনন কাজের উদ্বোধন করেন। কৃষি বিপ্লব ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে জিয়াউর রহমানের গৃহীত ‘খাল খনন কর্মসূচি’ পরবর্তীতে ‘জিয়া মডেল’ নামে পরিচিতি পায়। ওই সময় চন্দনাইশের বরুমতি খালটি খননের পর তার নামানুসারে খালটি নামকরণ করা হয় ‘জিয়াউর রহমান খাল’। উদ্বোধনের পর প্রেসিডেন্ট জিয়া গাছবাড়িয়া কলেজ গেট-বরকল সেতু সড়কের হাড়ালা অংশে একটি বৈঠকখানায় বিশ্রাম নিয়েছিলেন, যা দীর্ঘ দিন সংরক্ষিত ছিল। তবে কালের বিবর্তনে তা ভেঙে গেলেও, গত বছরের ৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের ব্যক্তিগত উদ্যোগে বৈঠকখানাটি দৃষ্টিনন্দনভাবে পুনঃনির্মাণ করা হয়, যা এখন অনেকের নজর কাড়ছে।
বর্তমানে চলমান বিএডিসির প্রকল্পের আওতায় জিয়াউর রহমান খালের পাঁচ কিলোমিটার অংশ পুনঃখনন করা হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো: নুরুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই প্রকল্প বাস্তবায়নের আশা করছেন তারা।
শুধু জিয়া খালই নয়, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার প্রায় ৫২৫ কিলোমিটার সেচ ও নিষ্কাশন খাল পুনঃখননের বিশাল কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৬৮ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে। এই পুনঃখননের ফলে খালে সেচের পানি সংরক্ষণ ক্ষমতা যেমন বাড়বে, তেমনি জলাবদ্ধতা দূর হয়ে এক ফসলি জমিগুলো দুই বা তিন ফসলিতে রূপান্তরিত হবে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের ১৪টি এবং কক্সবাজারের সব ক’টি উপজেলায় একযোগে এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো আধুনিক সেচ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল সেচব্যবস্থার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটানো। এর আওতায় পুনঃখননকৃত খাল ও নদীগুলোতে ২৩৫টি বিদ্যুৎচালিত ‘লো লিফট পাম্প’ (এলএলপি) ও ১২০টি ‘সোলার পাম্প’ স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া ৫০টি ভাগওয়েল, ৫০০টি আর্টেসিয়ান ওয়েল, ৫২৯ কিলোমিটার ব্যারিড পাইপ এবং ৩০ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হবে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০২ কোটি ২৬ লাখ টাকা। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৮ সালের ৩০ জুন।
প্রকল্প শেষে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় নতুন করে ১৮ হাজার ৯২০ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে। ফলে দুই জেলায় বার্ষিক প্রায় ৯৪ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন ধান ও শাকসবজিসহ বিভিন্ন খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১৮ হাজার ৯২০ লাখ টাকা। সামগ্রিকভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রকল্প এলাকার ৭৩ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারিত হবে এবং বার্ষিক চার লাখ পাঁচ হাজার ৮৭২ মেট্রিক টনের বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদন সম্ভব হবে।
এ দিকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় খাল পুনঃখননের ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, সম্প্রতি পরপর কয়েক দফা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও খালগুলো খনন করে দেয়ায় পানি দ্রুত নিষ্কাশন হয়েছে। এর ফলে ব্যাপক ফসল ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতি বছর প্রায় অর্ধশতাংশ হারে কৃষি জমি কমছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় মোট আবাদযোগ্য জমির (দুই লাখ ৬৫ হাজার ৬০১ হেক্টর) প্রায় অর্ধেক (৪৮.৮০ শতাংশ) এখনো সেচের আওতার বাইরে রয়েছে। এই বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতেই সরকার এ প্রকল্প হাতে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন পিডি মো: নুরুল ইসলাম। সঠিক সেচব্যবস্থা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এই অনাবাদি জমিকে কাজে লাগিয়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।