নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ
ঈদের আগেই ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানী শুরু, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা সংস্কারে জোর প্রধানমন্ত্রীর
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত ৯টি অগ্রাধিকার প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি বলেছেন, জনগণের দেয়া ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে কোনো ধরনের শৈথিল্য গ্রহণযোগ্য হবে না। একই সাথে বৈঠকে ঈদের আগেই খতিব, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের মাসিক সম্মানী প্রদানের কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ১৮০ দিনের রোডম্যাপ অনুযায়ী দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করতে প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোতে বলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণের পর এই প্রথম তেজগাঁওয়ের কার্যালয়ে অফিস করলেন তারেক রহমান। সকাল ১০টা ১০ মিনিটে তিনি কার্যালয়ে পৌঁছলে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার ও অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন তাকে স্বাগত জানান। কার্যালয়ের প্রাঙ্গণে প্রধানমন্ত্রী একটি স্বর্ণচাঁপার চারা রোপণ করেন। পরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সারিবদ্ধভাবে শুভেচ্ছা জানান। এ সময় ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলে কর্মরত কয়েকজন পুরনো কর্মচারীকে চিনতে পেরে তিনি নাম ধরে ডাকেন, কুশল বিনিময় করেন এবং পরিবারের খোঁজখবর নেন। উপস্থিত অনেকেই এ ঘটনাকে আবেগঘন মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। এর পর তিনি রেড ব্লকে নিজ কার্যালয়ে প্রবেশ করে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে একটি স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন করেন। এর পর দুপুরে তিনি মন্ত্রিসভার বৈঠক করেন।
জানা গেছে, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচনী অঙ্গীকারগুলো কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, এগুলো জনগণের প্রত্যাশা ও সরকারের দায়বদ্ধতার অংশ। ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, শিক্ষা সংস্কার, যুব কর্মসংস্থান, পরিবেশ সুরক্ষা, মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ, ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণ- এই ৯টি কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি।
রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা জোরদার : জানা গেছে, বৈঠকে আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি রোধে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয়েও আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান বজায় রাখবে। প্রশাসনকে আরো জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হবে।
ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য মাসিক সম্মানী : বৈঠক-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিভিন্ন ধর্মীয় নেতাদের জন্য মাসিক সম্মানী ও উৎসব ভাতা প্রদানের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। ঈদের আগেই দেশের কিছু এলাকায় খতিব, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানী কার্যক্রম শুরু হবে এবং পরে তা সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে।
তিনি বলেন, সরকার ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ধর্মীয় ব্যক্তিদের সম্মান ও কল্যাণ নিশ্চিত করাও সেই নীতির অংশ।
কত টাকা সম্মানী দেয়া হবে জানতে চাইলে মাহদী আমিন বলেন, আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে তা চূড়ান্ত করা হবে।
কর্মসংস্থান ও শিক্ষা সংস্কারে জোর : মাহদী আমিন জানান, বৈঠকে মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষার প্রসারে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। বিদেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে দূতাবাসগুলোর সাথে সমন্বয় জোরদার এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করার বিষয়েও আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সচিবরা মতামত তুলে ধরেন এবং দ্রুত বাস্তবায়নের ব্যাপারে একমত হন।
এর আগে তারেক রহমানের প্রেস সচিব সালেহ শিবলী বলেন, তারেক রহমানের তৃতীয় কর্মদিবস ছিল শনিবার। নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
দায়বদ্ধতা ও গতিশীলতার বার্তা : গতকালের বৈঠকটি ছিল প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় মন্ত্রিসভা বৈঠক; প্রথমটি ১৮ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ছুটির দিনে অফিস করা, মন্ত্রিসভায় কঠোর নির্দেশনা প্রদান এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দ্রুত কর্মসূচি গ্রহণ- সব মিলিয়ে নতুন সরকারের দায়বদ্ধতা ও গতিশীলতার বার্তা স্পষ্ট হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক সমন্বয় নিশ্চিত করাই এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, কাজের মাধ্যমেই জনগণের আস্থা অর্জন করতে চায় সরকার।