বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় বড় পদক্ষেপ
‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫’ এর গেজেট প্রকাশ
‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫’ কার্যকর হলে অধস্তন আদালত থেকে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল পর্যন্ত পুরো বিচার প্রশাসন সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো বিচার বিভাগের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নির্বাহী শাখা থেকে প্রায় পুরোপুরি সরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
Printed Edition
দীর্ঘদিন বিচার বিভাগকে কার্যকরভাবে একক প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে আনার দাবি অবশেষে বাস্তবায়নের পথে। সরকার গতকাল গেজেট প্রকাশ করেছে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫’ এর, যা কার্যকর হলে অধস্তন আদালত থেকে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল পর্যন্ত পুরো বিচার প্রশাসন সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো বিচার বিভাগের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নির্বাহী শাখা থেকে প্রায় পুরোপুরি সরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
এই অধ্যাদেশ শুধু নতুন একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠাই নয় বরং বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে কাঠামোগতভাবে পুনর্গঠনের একটি রূপরেখা, যাকে অনেকেই “২১ বছরের বিলম্বিত বিচ্ছেদের পূর্ণতা” হিসেবে দেখছেন।
সংবিধানিক পটভূমি : কেন প্রয়োজন হলো এই অধ্যাদেশের : সংবিধানের ২২ নম্বর অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক রাখা রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার ১০৯ ও ১১৬ অনুচ্ছেদ বিশেষভাবে অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করে। তবুও বাস্তবে বিচার প্রশাসন, নিয়োগ, বদলি ও শৃঙ্খলাবিধির অনেক অংশ বহু বছর ধরে আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে থেকে এসেছে।
২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক ৭৯/১৯৯৯ সিভিল রায় বাস্তবায়নের আংশিক অগ্রগতি হয়েছিল। তবে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠন, যা বিচার বিভাগকে প্রশাসনিক স্বাধীনতার পূর্ণ রূপ দেয়ার জন্য অপরিহার্য তা আর প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
২০২৫ সালের এই অধ্যাদেশ সেই দীর্ঘস্থায়ী সাংবিধানিক বৈসাদৃশ্য দূর করার লক্ষ্যে এসেছে।
নতুন সচিবালয়ের কাঠামো : ক্ষমতার কেন্দ্র প্রধান বিচারপতি
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় হবে একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান; এর সার্বিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে প্রধান বিচারপতির হাতে; সচিবালয়ের প্রশাসনিক প্রধান সচিব হবেন সরকারের সিনিয়র সচিব সমমর্যাদার; সচিবালয় তার নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করতে পারবে; প্রয়োজন হলে মন্ত্রণালয়ের মতোই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও থাকবে।
এটি কার্যত বিচার বিভাগকে “মিনিস্ট্রি-স্ট্যাটাসড অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অথোরিটি” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে।
সচিবালয়ের ক্ষমতা : অধস্তন আদালত থেকে বাজেট পর্যন্ত সব নিয়ন্ত্রণ
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, সচিবালয়ের ক্ষমতার আওতায় থাকবে- ১. অধস্তন আদালতের প্রতিষ্ঠা, বিলোপ, এখতিয়ার নির্ধারণ : দেশের নি¤œ আদালতগুলোর গঠন, কাঠামো, প্রয়োজনীয় পদসংখ্যা, নতুন আদালত স্থাপন কিংবা পুরনো আদালতের পুনর্গঠন- সব সিদ্ধান্ত এখন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের মাধ্যমে হবে।
২. বিচারক নিয়োগ, পদায়ন, বদলি ও শৃঙ্খলা : জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের নিয়োগ ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ হবে সচিবালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যদিও শৃঙ্খলাবিধির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কমিটিকে পরামর্শের জন্য ফাইল পাঠাতে হবে।
৩. বাজেট ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা : প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় দু’টি আলাদা বাজেট পাবে এবং ব্যয় অনুমোদনের চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকবে প্রধান বিচারপতির কাছে। সরকারের আগাম অনুমোদনের প্রয়োজন নেই, যা বিচার বিভাগের আর্থিক স্বাধীনতার বড় উপাদান।
৪. উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন ও অনুমোদন : ৫০ কোটি টাকার নিচের যেকোনো প্রকল্প অনুমোদন করতে পারবেন প্রধান বিচারপতি। এর বেশি হলে যাবে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে।
৫. আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সহযোগিতা : বিচার বিভাগ এখন নিজ নামেই বিদেশী আদালত, মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানের সাথে সমঝোতা ও চুক্তি করতে পারবে, যা পূর্বে সরকারের মাধ্যমে করতে হতো।
সংগঠন পুনর্বিন্যাস : প্রথমবারের মতো শক্তিশালী ‘পদ সৃজন কমিটি’
অধ্যাদেশে একটি পদ সৃজন কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে, যার প্রধান হবেন আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারক। এই কমিটি আদালত, ট্রাইব্যুনাল ও সচিবালয়ের কাঠামো নির্ধারণ করবে, নতুন পদ সৃষ্টির অনুমতি দেবে।
সরকারকে আর এখানে ‘চূড়ান্ত অনুমোদনকারী’ হিসেবে রাখা হয়নি, যা নির্বাহী নিয়ন্ত্রণকে ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেবে।
বিশ্লেষণ : এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে রাষ্ট্র কী অর্জন করতে চাইছে?
১. বিচার বিভাগের পূর্ণ প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা : নির্বাহী-আবদ্ধ নিয়োগ, বদলি ও শৃঙ্খলাবিধি বহু বছর ধরে বিচার বিভাগের অন্যতম দুর্বল জায়গা ছিল। নতুন কাঠামো এই নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের অধীনে নিয়ে যাচ্ছে। এটি বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কমাবে।
২. বিচার ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি ও দ্রুততা আনা : অধস্তন আদালতগুলোর কাঠামো মন্থর, অকার্যকর ও অসম। সচিবালয় এখন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে নতুন আদালত স্থাপন, পদোন্নতি, বদলি, বাজেট- সবই দ্রুততর হবে।
৩. দুর্নীতি, দলীয় প্রভাব ও লবিং কমানো : একক প্রশাসনিক কাঠামো জুডিশিয়াল সার্ভিসে লবিং-নির্ভর বদলি, নিয়োগ বা ভোগদখলবিষয়ক অস্বচ্ছতা কমাতে ভূমিকা রাখবে।
৪. আন্তর্জাতিক মানের বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা : ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোতে বিচার বিভাগ নিজস্ব সচিবালয় পরিচালনা করে। বাংলাদেশের বিচার বিভাগ সেই কাঠামোর দিকে যাচ্ছে, যা বিদেশী বিনিয়োগ, বাণিজ্য, মানবাধিকারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক বার্তা দেবে।
সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও বিতর্ক
১. প্রশাসনিক দক্ষতা গড়ে তোলা সময়সাপেক্ষ : দীর্ঘদিন মন্ত্রণালয়নির্ভর বিচার প্রশাসন এক দিনে সচল সচিবালয়ে রূপ নেবে না। মানবসম্পদ, ডিজিটাল সিস্টেম ও প্রশাসনিক দক্ষতা- সবই নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।
২. বিচার বিভাগের ভেতরে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে : প্রধান বিচারপতির হাতে ব্যাপক প্রশাসনিক ক্ষমতা আসায় বিচার বিভাগের ভেতরে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন উঠতে পারে।
৩. নির্বাহী বিভাগের “অদৃশ্য প্রতিরোধ”: নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে কিছু প্রশাসনিক মহলে অনানুষ্ঠানিক প্রতিরোধ, বিলম্ব বা সমন্বয়গত জটিলতা দেখা দিতে পারে যা বাস্তবায়নে বাধা হতে পারে।
৪. তহবিল ব্যবস্থাপনা ও দায়বদ্ধতা : বাজেট স্বাধীনতা যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি নিয়ন্ত্রণহীন ব্যয়ের ঝুঁকি থেকেও সতর্ক থাকতে হবে। অডিট ও জবাবদিহির কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে অন্যতম বড় প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন। এটি যদি সময়মতো, স্বচ্ছভাবে ও সুপ্রিম কোর্ট সরকার সমন্বয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশ বিচার বিভাগ হবে- রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত, প্রশাসনিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক মানসই একটি কাঠামো পেতে পারে।
তবে বাস্তবায়নের জটিলতা, ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারচাপ- এসব এলাকা এখনো চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে। বাংলাদেশের বিচারিক স্বাধীনতার লড়াই তাই এখনো শেষ হয়নি কিন্তু এই অধ্যাদেশ নিঃসন্দেহে সেই পথচলার সবচেয়ে বড় মাইলফলক।