আল-উম্মাহ জার্নাল ও ওয়েবসাইটের উদ্বোধন

সরকার সব মতের মানুষের সহাবস্থানে বিশ্বাস করে : তথ্যমন্ত্রী

Printed Edition
first-4
তথ্যমন্ত্রী এম জহির উদ্দিন স্বপন গতকাল আল উম্মাহ জার্নাল ও ওয়েবসাইট উদ্বোধন করেন : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, বর্তমান বিশ্ব এক গভীর ও জটিল সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই একক কোনো আদর্শ, দর্শন বা চিন্তার আধিপত্য মানব সভ্যতার জন্য স্থায়ী সমাধান আনতে পারে না। জগতের সব ধরনের বৈচিত্র্য, ভিন্নমত ও আদর্শের অবাধ আদান-প্রদান এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমেই কেবল শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব; আর সে জন্য প্রয়োজন মুক্ত ও দায়িত্বশীল বুদ্ধিচর্চা।

গতকাল রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি হোটেলে বৈশ্বিক গবেষণা, সংলাপ ও জ্ঞানচর্চার আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ‘আল-উম্মাহ জার্নাল ও ওয়েবসাইট’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। আল-উম্মাহ ফাউন্ডেশন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন বিশ্বখ্যাত তুর্কি লেখক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগানের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইয়াসিন আকতাই, ইসলামিক ওয়ার্ল্ড ফোরাম ফর থট অ্যান্ড সিভিলাইজেশনের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল ইঞ্জিনিয়ার মুনির সাইদ, ইন্টারন্যাশনাল আল কুদস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আইমান জাইদান, তুরস্কের আল রাওয়াদ একাডেমির পরিচালক ড. ফাতিহ আব্দুল কাদির, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. নিয়াজ আহমেদ খান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থটের (বিআইআইটি) মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ, ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভার্সিটির প্রফেসর শেখ মোক্তার আহমেদ প্রমুখ। স্বাগত বক্তৃতা করেন আল-উম্মাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও আল-উম্মাহর এডিটর ইন চিফ মোহাম্মদ জাকির হোসেন।

তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যখন বিভ্রান্তি, বিভাজন ও ভাসাভাসা আলোচনা দ্রুত বাড়ছে, তখন জ্ঞান, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিশ্বাসযোগ্য বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। আল-উম্মাহ জার্নাল ও ওয়েবসাইট জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা ও গবেষণামূলক অবদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বস্ত মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। তিনি বলেন, ভাষা, জাতিসত্তা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য হলো প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম। কোনো সুনির্দিষ্ট পরিচয় বা গোষ্ঠী এককভাবে বিশ্বকে শাসন বা আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না। সব মতাদর্শের স্কলার বা গবেষকদের এমন এক সাধারণ সমাধান খুঁজে বের করতে হবে, যা সভ্যতার কল্যাণ বয়ে আনবে। অতীতের কোনো একক বীর কিংবা সমাজ একা বিশ্ব সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও সমাদৃত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের সরকার গঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন আমাদের এ সরকার সব ধরনের বৈচিত্র্য এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিতে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। আমাদের নীতি হলো- যে যার অবস্থান থেকে নিজের কথা বলবেন এবং সুস্থভাবে সেই মতাদর্শের আদান-প্রদান হবে। এটিই প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। আল-উম্মাহ জার্নালের ঘোষিত উদ্দেশ্য আমাদের এই রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলা, ইংরেজি, আরবি ও তুর্কি- এই চারটি ভাষায় জার্নালটি প্রকাশের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, পারস্পরিক সংস্কৃতির গভীর বোঝাপড়া আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ পর্যায়ের সব ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে সাহায্য করে।

বিশেষ অতিথি অধ্যাপক ইয়াসিন আকতাই বলেন, মুসলিম বিশ্বের সমৃদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য রয়েছে। তবে সমসাময়িক বৈশ্বিক বাস্তবতার সাথে সেই জ্ঞানচর্চার সংযোগ আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। আল-উম্মাহ গবেষণা, সংলাপ ও সহযোগিতামূলক চিন্তাধারার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে গবেষক ও তরুণ চিন্তাবিদদের সংযুক্ত করার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হতে পারে।

ইঞ্জিনিয়ার মুনির সাইদ বলেন, বর্তমান সময়ে মুসলিম উম্মাহর জন্য জ্ঞানভিত্তিক ও গবেষণানির্ভর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, বিভক্তি ও অনৈক্যই আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। শক্তির অভাবে নয়; বরং ঐক্যের অভাবেই মুসলিম বিশ্ব বারবার সঙ্কটে পড়েছে।

ফিলিস্তিনের চলমান মানবিক বিপর্যয় একটি বেদনাদায়ক উদাহরণ মন্তব্য করে আইমান জাইদান বলেন, প্রায় ২০০ কোটি মুসলমানের অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনের মানুষ আজও ভয়াবহ দুর্ভোগের মুখোমুখি। এটি প্রমাণ করে, আমাদের মূল সঙ্কট সংখ্যার ঘাটতি নয়; বরং পারস্পরিক অনৈক্য ও সমন্বয়ের অভাব।

ড. ফাতিহ আব্দুল কাদির বলেন, মুসলিম উম্মাহর মধ্যে কার্যকর ঐক্য, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ছাড়া ফিলিস্তিন সঙ্কটের একটি টেকসই ও ন্যায়সঙ্গত সমাধান সম্ভব নয়। তাই আমাদের বিভেদ নয়, ঐক্যের পথে এগিয়ে যেতে হবে এবং জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সংলাপকে সামনে রেখে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হবে।

ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, এ প্ল্যাটফর্মটি ওআইসি সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত সংযোগ ও সহযোগিতা গড়ে তুলতে এবং মুসলিম উম্মাহর সমসাময়িক চ্যালেঞ্জগুলোর জ্ঞানভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া বলেন, একটি একাডেমিক জার্নাল প্রতিষ্ঠা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন নয়, এটি জ্ঞানচর্চা, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং মানবসভ্যতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মুসলমানরা সম্পদ বা ক্ষমতার কারণে নয়; বরং জ্ঞানচর্চা, মুক্তচিন্তা এবং সত্য অনুসন্ধানের চেতনার কারণেই বিশ্বসভ্যতায় নেতৃত্ব দিয়েছিল।

ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে সমাজকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিচ্ছিন্ন ও সঙ্কীর্ণ করে ফেলেছি। তাই এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতা, সংলাপ ও ঐক্যের বন্ধন আরো দৃঢ় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করে।

স্বাগত বক্তৃতায় মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, আল-উম্মাহকে মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক কণ্ঠস্বর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আমরা চাই এই প্ল্যাটফর্ম গবেষণা, গঠনমূলক সংলাপ ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের চিন্তাবিদ, লেখক ও গবেষকদের অনুপ্রাণিত করুক।

অনুষ্ঠানের আয়োজকরা জানান, আল-উম্মাহ ফাউন্ডেশন গবেষক, শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক, সাংবাদিক ও তরুণ চিন্তাবিদদের জন্য সমসাময়িক বৈশ্বিক ইস্যু, মুসলিম উম্মাহর চ্যালেঞ্জ এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাধান নিয়ে অর্থবহ আলোচনা ও মতবিনিময়ের একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম। গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, বিশ্লেষণধর্মী লেখা এবং মতামতভিত্তিক নিবন্ধের মাধ্যমে আল-উম্মাহ জ্ঞানচর্চা, বুদ্ধিবৃত্তিক সহযোগিতা এবং দায়িত্বশীল চিন্তাধারাকে এগিয়ে নিতে কাজ করবে। জার্নাল ও ওয়েবসাইটটি বর্তমানে বাংলা, ইংরেজি, আরবি ও তুর্কি- এই চারটি ভাষায় প্রকাশিত হচ্ছে। পাশাপাশি, ওআইসি সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত সংযোগ ও সহযোগিতা গড়ে তুলতেও এ উদ্যোগ কাজ করবে।