উপসাগরীয় দেশে কনটেইনার প্রতি ৮ শ’ হতে ২ হাজার ডলার সারচার্জের খড়গ

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা চট্টগ্রাম

ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলের যৌথ হামলাকে কেন্দ্র সৃষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলে কনটেইনার প্রতি ৮০০ ডলার থেকে ২০০০ ডলার পর্যন্ত সারচার্জ আরোপ করেছে বৈশ্বিক শিপিং কোম্পানিগুলো। ফলে বাংলাদেশ থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে কনটেইনারজাত পণ্য আনানেয়ায় বাড়তি চার্জ গোনা ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। এতে আমদানি-রফতানি সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। শিপিং কোম্পানিগুলো বলছে- মধ্যপ্রাচ্যে সঙ্ঘাতের কারণে সাগর পথে পণ্য পরিবহনে শিপিং কোম্পানিগুলোর খরচ বাড়তে শুরু করেছে। এই বাড়তি ব্যয় পুষিয়ে নিতেই কনটেইনার পরিবহনে নতুন করে সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে। শিপিং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে গত সোমবার হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা দেয় ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কর্পস-আইআরজিসি। এর পরপরই উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে পণ্য পরিবহনের বুকিং নেয়া বন্ধ করে দেয় অধিকাংশ শিপিং কোম্পানি। এর বাইরে ইতোমধ্যে বুকিংকৃত মধ্যপ্রাচ্যগামী যেসব কনটেইনার বিভিন্ন বন্দর ও জাহাজে আটকে আছে, সেগুলোর ওপরও এই সারচার্জ গুনতে হবে বলে জানিয়েছে কোম্পানিগুলো। শিপিং কোম্পানিগুলো বলছে, সাগরে আটকে থাকা আরব উপসাগরমুখী জাহাজগুলো কাছাকাছি নিরাপদ বন্দরে খালাস করা হবে। এতে যে অতিরিক্ত ব্যয় হবে, তা মেটাতেই এ সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বন্দরে আটকে থাকা কনটেইনারেও এ বাড়তি ভাড়া প্রযোজ্য হবে।

হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করে ইরান, ইরাক, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব- এই সাত দেশের সাথে বাংলাদেশের পণ্য আনানেয়া হয়। লোহিত সাগর হয়ে সৌদি আরবের কিছু অঞ্চলে পণ্য পরিবহন সম্ভব হলেও অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে বিকল্প পথ নেই।

সঙ্ঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। আবার নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে ইউরোপ-আমেরিকায় জাহাজ চলাচল বাড়ছে। এতে সামনে পরিবহন খরচ আরো বাড়তে পারে।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৫৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে চারটি বড় শিপিং কোম্পানি। এগুলো হলো ডেনমার্ক-ভিত্তিক মায়ের্সক লাইন, সুইজারল্যান্ডের মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানি, ফ্রান্সের সিএমএ-সিজিএম ও জার্মানির হ্যাপাগ-লয়েড।

বিদেশী এসব কোম্পানির মধ্যে ফ্রান্সভিত্তিক সিএমএ-সিজিএম গত ৩ মার্চ তাদের ওয়েবসাইটে ঘোষণা দেয়, মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের ১৩ দেশে পণ্য পরিবহনে ‘ইমার্জেন্সি কনফিক্ট সারচার্জ’ আরোপ করা হয়েছে, যা ২ মার্চ থেকে কার্যকর। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি একক কনটেইনারে সারচার্জ আরোপ করেছে দুই হাজার ডলার। এ ছাড়া মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানি আরব উপসাগরমুখী চালানে প্রতি কনটেইনারে ৮০০ ডলার বাধ্যতামূলক সারচার্জ আরোপ করেছে। মায়ের্সক লাইন উপসাগরীয় সাতটি দেশে প্রতি কনটেইনারে এক হাজার ৮০০ ডলার জরুরি ভাড়া ঘোষণা করেছে। আর হ্যাপাগ-লয়েড প্রতি কনটেইনারে এক হাজার ৫০০ ডলার যুদ্ধঝুঁকি সারচার্জ আরোপ করেছে, যা ২ মার্চ থেকে কার্যকর হয়েছে।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন নয়া দিগন্তকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যগামী কনটেইনার পরিবহনে শিপিং কোম্পানিগুলোর ব্যয় বেড়ে যাওয়াতে বাংলাদেশসহ সব দেশের চালানের ওপরই এই সারচার্জ আরোপ করেছে শিপিং কোম্পানিগুলো। জাহাজে থাকা কিংবা ট্রানশিপমেন্ট বন্দরে আটকে থাকা কনটেইনারের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হবে।

বিদ্যমান পরিস্থিতি সর্বক্ষেত্রে জ্বালানি সাশ্রয়ী হতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, সঙ্ঘাতের কারণে এক দিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। অন্য দিকে বাড়তি দামেও জ্বালানি তেল হয়তো মিলবে না। ফলে সামনের দিনগুলো বেশ কঠিন হবে।

প্রসঙ্গত, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উপসাগরীয় সাতটি দেশে রফতানি হয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য। বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে তৈরী পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, শাকসবজি, ফলমূল, হিমায়িত মাছ, ক্যাপ ও জুতা রফতানি হয়।

রফতানির প্রায় সব পণ্যই যায় কনটেইনারে। অন্য দিকে প্লাস্টিক শিল্পের কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি হয় কনটেইনারে। আমদানির বড় অংশ জ্বালানি, সার ও খনিজ হলেও অন্যান্য অনেক পণ্য কনটেইনারে পরিবহন করা হয়।