স্বাধীনতা দিবসের আলোচনা

সংবিধান সংস্কার নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠকের আহ্বান বিরোধীদলীয় নেতার

Printed Edition
first-4
জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আয়োজিত স্বাধীনতা দিবসের আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন ডা: শফিকুর রহমান : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

সংবিধান সংস্কার নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠক ডাকার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জাতীয় জীবনে কঠিন সময় চলছে। উদারতা দেখিয়ে আমাদের ডেপুটি স্পিকার পদ দেয়ার দরকার নেই। জাতীয় সমস্যা সমাধানে খোলা মন নিয়ে এক জায়গায় একসাথে বসুন। এটা সংসদের ভেতরে হবে না। কারণ সেখানে সব দল প্রবেশ করেনি। এ দেশে আরো যেসব দল আছে, তাদেরও দেশের প্রতি অবদান আছে, মুক্তিযুদ্ধে, ২৪-এ অবদান আছে, তাদের সবাইকে নিয়ে বসেন। কথা শোনেন। সিদ্ধান্ত আপনারাই নেবেন। অন্তত খোলা মনে পরামর্শগুলো শোনেন- কে কী বলতে চায়। এতে জাতিও উপকৃত হবে এবং আপনারাও দিশা পাবেন।

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের উদ্যোগে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, সরকার কখনো বলছে জনগণের রায় অক্ষরে-অক্ষরে পালন করবে আবার কখনো বলে জনগণ না বুঝে গণভোটে রায় দিয়েছে। প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণ হ্যাঁ ভোট দিলেও সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়নে অনীহা প্রকাশ করছে। তিনি বলেন, কেউ কেউ বলেন ’৭২-এর সংবিধান সংশোধন করা যাবে না। শেখ মুজিব কি ’৭২-এর সংবিধান রক্ষা করেছিলেন? তিনি কি বাকশাল কায়েম করেননি? জিয়াউর রহমান কি সংবিধান সংশোধন করেননি? বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মরহুম এম কে আনোয়ার বলেছিলেন, ক্ষমতায় গেলে এই সংবিধান ছুড়ে ফেলে দেয়া হবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, জনগণের সরকার গঠন করলে এ সংবিধান পরিবর্তন করা হবে। এখন আপনারা কি তাদের থেকেও ’৭২-এর সংবিধানের বেশি প্রেমিক হয়ে গেলেন?

বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, আগামী ২৯ মার্চ সংসদ অধিবেশন। আমাদের লিখিত নোটিশ করতে বলা হয়েছে। আমরা বলব- নোটিশের অপেক্ষা না করে নিজেদের থেকেই সংসদে এটি পাস করুন। এখন শুধু আলোচনা হতে পারে কিভাবে এটি বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে। এটা নিয়ে তালবাহানা করবেন না। জনআকাক্সক্ষার প্রতি সম্মান করুন। জুলাই সনদে যেভাবে স্বাক্ষর করা হয়েছে সেইভাবে বাস্তবায়ন না হলে রাজপথে সমাধান হবে।

তিনি বলেন, যদি এই সংস্কার মেনে না নেয়া হয় তাহলে ১৪ শ’ জুলাই শহীদ, ৩৫ হাজার জুলাই যোদ্ধা, শহীদ হাদী, ফেলানীদের প্রতি অপমান করা হবে।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, সরকার সংবিধান সংস্কারে সংবিধানের দোহাই দিলেও তারা স্থানীয় সরকারে অসাংবিধানিকভাবে নির্বাচন ছাড়াই দলীয় লোকদের প্রশাসক বসাচ্ছে। এভাবে তারা সংবিধান বিরোধী কাজ করছে।

তিনি বলেন, পাকিস্তান জনগণের ভোটের রায় অস্বীকার করায় তাদের খেসারত দিতে হয়েছে। এখনো যদি এমন করা হয় তাহলে তাদেরও খেসারত দিতে হবে। অত্যাচার-নির্যাতন, জেল-জুলুম, আয়নাঘর, ফাঁসি সবকিছু সহ্য করে দেশের জনগণ এ পর্যন্ত এসেছে। এখন আর কেউ ভয় পায় না। অতীতের মতো কেউ আবার ফ্যাসিবাদী হতে চাইলে জনগণ তাদের প্রতিহত করবে।

ইরান-আমেরিকা-ইসরাইল যুদ্ধ প্রসঙ্গ টেনে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, জাতীয় জীবনে আমরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল জায়গায় আছি। সম্প্রতি যুদ্ধের কারণে গোটা বিশ^ অস্থির। অনেক দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। জ¦ালানির অভাবে অনেক দেশ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। তিনি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, পাম্পে গাড়ির দীর্ঘ লাইন, অথচ বলা হচ্ছে জ¦ালানি তেলের অভাব নেই। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলেছি, জ¦ালানি যদি না থাকে তাহলে কলকারখানা চলবে কিভাবে? এজন্য পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথে বলেছিলাম বিকল্প উপায় খুঁজুন। আজকেও বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলেছি, তারা বন্ধু দেশ হিসেবে আমাদের সাধ্যমতো সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সরকারকে বলব- সঙ্কীর্ণতা থেকে বের হয়ে আসুন। এটা সরকারের একার সমস্যা নয়, এটি সারা দেশের মানুষের সমস্যা। এটা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়, বিশ^সঙ্কট। এ ধরনের জাতীয় সমস্যায় খোলা মনে সবাইকে নিয়ে বসেন। আমরা সব দিক থেকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছি।

তিনি বলেন, আমরা যদি সরকারের ব্যর্থতা চাইতাম তাহলে রাজপথে নামতে পারতাম। কিন্তু আমরা সরকারের সফলতা চাই। কিন্তু সরকারই যদি উল্টো পথে হাঁটে তাহলে আমাদের কিছু করার নেই। সরকারকে সঠিক পথে হাঁটতে হবে।

বিরোধীদলীয় নেতা আরো বলেন, অযোগ্য লোকদের হাতে ক্ষমতা যাওয়ার কারণে আমরা স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারিনি। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও আমরা দুর্নীতিগ্রস্ত নেতৃত্বের কবল থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি। দুর্নীতি শুধু টাকা-পয়সার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়াও দুর্নীতি। তিনি বলেন, স্বাধীনতা একটি জাতির কত বড় সম্পদ এটি স্বাধীন জাতি বুঝে না পরাধীন জাতি বুঝে। তিনি আরো বলেন, তৎকালীন নেতৃবৃন্দের দূরদর্শিতায় আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। স্বাধীনতার আগে একটি সাধারণ নির্বাচন হয়েছে। ওই নির্বাচনও সংবিধান মেনে হয়নি। কারণ সামরিক আইন জারি হলে সংবিধান স্থগিত থাকে। ওই সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী মেনে নিতে পারেনি। যার ফলে তৎকালীণ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ মুক্তির সংগ্রামে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে আমরা একটি স্বাধীন ভূখণ্ড, একটি মানচিত্র ও লাল-সবুজের পতাকা পেয়েছি।

সভায় প্রধান বক্তা লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, সুশাসন নিশ্চিত না হওয়ায় এবং রাষ্ট্র কর্তৃক সর্বস্তরের বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী আজো বাংলাদেশে সুশাসন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়নি। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে বৈষম্যের বেড়াজাল বিদ্যমান। তিনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, আপনার পিতা পুরো পৃথিবীতে প্রসিদ্ধ হয়েছিলেন স্বাধীনতা ঘোষণা করে, আপনার মা প্রসিদ্ধ হয়েছিলেন সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। আপনি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের মাধ্যমে প্রসিদ্ধ হয়ে যান। এই সুযোগ হাত ছাড়া করবেন না। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আমি যখন দেশ স্বাধীন করার জন্য বিদ্রোহ করেছি তখন সংবিধান মেনে বিদ্রোহ করিনি। কারণ সংবিধান মেনে কখনো বিদ্রোহ হয় না। ’৭১-এর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আমিই প্রথম বিদ্রোহ করেছিলাম এবং জিয়াউর রহমানকেও বিদ্রোহ করার কথা বলেছিলাম। তাকে যদি চট্টগ্রাম বন্দরে যাওয়ার পথ থেকে ফিরিয়ে না আনতাম তাহলে পাঁচ মিনিট পরেই তাকে হত্যা করা হতো।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, যখন শাসক গোষ্ঠী জনগণকে শোষণ করে, জনগণের মতের বিপক্ষে গিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করার চেষ্টা করে তখনই জাতি বিপ্লবের পথ বেছে নেয়, নিতে বাধ্য হয়। তিনি বলেন, স্বাধীনতা মানে কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, একটি পতাকা নয়, একটি মানচিত্র নয়। স্বাধীনতা মানে কোনো জাতির অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সব মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হওয়াকেই স্বাধীনতা বলা হয়। যেই স্বাধীনতা বাংলাদেশের জনগণ আজো পায়নি। জাতিকে রাজনৈতিক সঙ্কটের দিকে ঠেলে না দিয়ে গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ আদেশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি। কিন্তু স্বাধীনতা পাইনি। মানুষ স্বাধীনতার জন্য আজো লড়াই করছে। তিনি আরো বলেন, আমরা যুদ্ধ করেছি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। এজন্য বাংলাদেশের কেউ যুদ্ধাপরাধী-মানবতাবিরোধী অপরাধী নয়। তিনি বলেন, বর্তমান শাসক দল ২৪ কে অস্বীকার করতে চায়। কিন্তু সংবিধান কখনো কোনো সরকারকে টিকিয়ে রাখতে পারেনি।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমান বীর প্রতীক বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার কথা ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের। কিন্তু তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা না দিয়ে পালিয়ে গেছেন। শুধু শেখ মুজিবুর রহমানই পালিয়ে যাননি, তখন তাজউদ্দীন আহমদসহ শীর্ষ নেতারা পালিয়ে গেছেন। পরবর্তীতে শহীদ জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। আওয়ামী লীগের কোনো স্তরের কোনো নেতাকর্মী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। তারা ভারতে পালিয়েছিল। স্বাধীনতার পরে তারা ভারতের সাথে গোপন চুক্তি করে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে শাসন ক্ষমতা দখল করে ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে শুরু করে। তিনি আরও বলেন, যারা আজ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চায় না তাদের পরিণতি হবে ভয়াবহ। জনগণ যখন বিপ্লবের স্বাদ আর স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর তখন কোনো সরকারই জনগণের প্রত্যাশার বাইরে গিয়ে টিকে থাকতে পারে না। আরেকবার যদি বিপ্লব হয় তবে জনগণ এই সংবিধান বঙ্গোপসাগরে ছুড়ে ফেলে জুলাই সনদের বাস্তবায়নের মাধ্যমে নতুন সংবিধান লিখবে।

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির আব্দুস সবুর ফকিরের সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপির পরিচালনায় সভায় আরো বক্তৃতা করেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট জসীম উদ্দীন সরকার, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি, ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ও শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ রাশেদুল ইসলাম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম প্রমুখ।