অভাব, পারিবারিক অশান্তি ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চাপে বিদ্যালয় ছেড়ে মায়ের সাথে ঢাকার পথে পাড়ি জমিয়েছে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার বড় কাজুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী কেয়া ও আয়শা। কেয়া পঞ্চম শ্রেণির এবং তার ছোট বোন আয়শা তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: মিজানুর রহমান জানান, দুই বোনই প্রায় প্রতিদিন না খেয়ে বিদ্যালয়ে আসত। পরিবারের আর্থিক সঙ্কটের পাশাপাশি তাদের বাবা স্ত্রী-সন্তানদের ওপর নির্যাতন করেন বলেও পরিবারটির কাছ থেকে জানতে পারেন শিক্ষকরা। নিয়মিত আয়-রোজগার না থাকায় পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে সঙ্কটে রয়েছে।
সম্প্রতি বিদ্যালয়ের বালিকা ফুটবল দল উপজেলা পর্যায়ের সেমিফাইনালে অংশ নেয়। দলটি হেরে গেলেও শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান কক্সবাজার থেকে প্রায় ২০ জোড়া কানের দুল ও কয়েকটি ব্রেসলেট কিনে আনেন। পরে বিদ্যালয়ে ফিরে খেলোয়াড়দের মধ্যে সেগুলো উপহার হিসেবে দেন।
উপহার পাওয়ার কিছুক্ষণ পর কেয়ার একটি কানের দুল হারিয়ে যায়। মাত্র ১০ টাকার সেই দুলটি হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে।
প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, দুলটির মূল্য সামান্য হলেও কেয়ার কাছে সেটি ছিল শিক্ষকের দেয়া বিশেষ একটি স্মৃতি।
এরপর হঠাৎ করেই বিদ্যালয়ে খবর আসে, কেয়ার মা দুই মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় চলে যাচ্ছেন। কোনো টিসি না নিয়েই বিদ্যালয় ছেড়ে মায়ের হাত ধরে অজানা গন্তব্যের পথে পাড়ি জমায় দুই বোন।
প্রধান শিক্ষক আরো বলেন, ‘দু’মুঠো খাবারের জন্য এই বয়সে ওরা স্কুল ছেড়ে চলে গেল। আমরা চেয়ে চেয়ে ওদের চলে যাওয়া দেখলাম। অথচ ওদের আবার স্কুলে ফিরিয়ে আনতে চাই।’
তিনি বলেন, কেয়া ও আয়শার মতো ঝরে পড়া শিশুদের পাশে সমাজ ও প্রশাসনের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। পরিবারটির আর্থিক ও সামাজিক সঙ্কট নিরসনে সহযোগিতা করা গেলে দুই শিশুকে আবারো বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
শিক্ষকদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের সহযোগিতায় কেয়া ও আয়শাকে দ্রুত বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হবে।
একটি শিশুর হাতে বই-খাতা থাকার কথা, থাকার কথা বিদ্যালয়ের মাঠে ছুটে চলার। কিন্তু দু’মুঠো খাবারের অনিশ্চয়তায় সেই শৈশবই আজ হারিয়ে যাচ্ছে জীবিকার খোঁজে। কেয়া ও আয়শা আবার তাদের প্রিয় বিদ্যালয়ে ফিরবে কি না, সেই অপেক্ষায় রয়েছেন বড় কাজুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।