জামালকে ভুলে গেলে চলবে না
Printed Edition
২০১৩-১৪-এর দিকে বাংলাদেশ ব্যস্ত ক্রিকেট নিয়ে, ফুটবলের খবর কেউ রাখেনি। আন্তর্জাতিক ম্যাচেও থাকে গ্যালারি ফাঁকা। জামাল ভূঁইয়ার শুরু হলো নতুন যুদ্ধ। খালি মাঠকে ভর্তি করতে একের পর এক অবদান রেখেছেন। মিডিয়ায়, ফেসবুকে, যেখানেই সুযোগ পেতেন, একটাই দাওয়াত। প্লিজ আপনারা মাঠে আসুন। ইউরোপে বড় হওয়া জামাল বাংলা বলতে পারেন না, যতটুকু শিখেছেন, সেটাই ভাঙা বাংলায় বলতেন। সফলও হলেন। আজ বাংলাদেশ ফুটবলে ফ্যানদের যেই মহাজাগরণ, তার শুরুটা তার কাছ থেকেই। বাংলাদেশ ফুটবলে আল্ট্রাস নামে যে সাপোর্টার আছে, সেটাও জামালের প্রেমে পড়েই। সাইফ স্পোর্টিংয়ের একঝাঁক তরুণ, যারা তাকে ভালোবাসত, তাদের উদ্যোগের সাথে আবাহনী ও কিংসের আরো কিছু ফ্যান মিলেই উদ্যোগ নিয়ে ২০১৯ এ যাত্রা শুরু হয়েছিল আলট্রাসের। অথচ সেই আলট্রাসকে নির্ধারিত মূল্যে টিকিট দেয়া হলো মাত্র এক শ’। চাহিদা ছিল তিন হাজারের, পরে এক হাজারে নেমে এসেছিল। সেটিও তারা পায়নি।
হামজাকে নিয়ে সবাই লিখছে, ফাহমিদুলকে সারা বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমিকরা সাপোর্ট দিয়ে দেশে আনতে বাধ্য করল। জামাল ভূঁইয়া, ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক। যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ডেনমার্কে। খেলেছেন ডেনমার্কে কোপেনহেগেনে, যেই ক্লাবটা নিয়মিত ইউসিএল বা ইউরোপা, উয়েফার যেকোনো একটা টুর্নামেন্টে রেগুলার পারফর্ম করে। এমন একজন প্লেয়ার বাংলাদেশের টানে এসেছিলেন এক যুগ আগে। ভারত, ভুটানের বিপক্ষে থাকলেও গতকাল সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে একাদশে ছিলেন না জামাল।
জামাল যখন বাংলাদেশে আসেন তখন দলের অবস্থা, পরিস্থিতি এত স্বাভাবিক ছিল না। বাফুফের নানান শর্ত আর যুক্তি, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও ক্লাব প্রীতি। সব মিলিয়ে জাতীয় দলের অবস্থা নাজুক। তার ওপর ইউরোপ থেকে এশিয়ার আবহাওয়া সম্পূর্ণ বিপরীত। বাফুফের শর্ত ছিল, বাংলাদেশ দলে খেলতে হলে ইউরোপ ছেড়ে এ দেশের ক্লাব ফুটবলে নিজেকে ফিট দেখাতে হবে। জামাল চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন, কিন্তু তাপমাত্রা বাধা হয়ে দাঁড়াল। পানিশূন্যতায় অসুস্থ হয়ে ফেরত যেতে হলো। জামাল নাছোড়বান্দা, শরীর তাকে সঙ্গ না দিলেও দুর্দান্ত মানসিকতায় ফেরত এলেন। শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের হয়ে মাঠ মাতাতে শুরু করলেন। জাতীয় দলে ফেরত এলেন। বর্তমানে বাংলাদেশের জার্সিতে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ডটি নিজের করে নিয়েছেন। জামালই প্রথম ফুটবলার যিনি বাফুফের সব বাধা আর শর্তকে একপাশে রেখে প্রবাস থেকে দেশে ফিরে জাতীয় দলের হাল ধরেছিলেন। জামালের তৈরি করে দেয়া পথেই সহজে গন্তব্য খুঁজে পেয়েছিল তারেক কাজি, জুলকারনাইন, হামজা চৌধুরী, শমিত সোম, ফাহমেদুলরা।
আজ ফুটবলের যেই জোয়ার, সেই জোয়ারে জামালের অবদান যেন হারিয়ে না যায়। এক যুগ পার করেছে জামাল, পারফর্মেও হয়তো ঘাটতি আসবে। এটি স্বাভাবিক। তবে মনে রাখতে হবে ভুটানের বিপক্ষে তার পাসেই কিন্তু হামজা তার উদ্বোধনী গোলটা করেছেন। জামাল বাংলাদেশের ফুটবলে দুঃসময়ের একমাত্র সুপারস্টার।
১৭ কোটি মানুষের দেশ ক্রিকেটে যখন ভালো করতে পেরেছে, ফুটবলে সেটা কেন করতে পারবে না? শুধু একটু সহানুভূতি ও সাহায্যের হাত বাড়ালে তরুণ প্রজন্ম পারবে লাল সবুজ পতাকার হয়ে খেলতে বিশ্বকাপ ফুটবল। ফুটবলার হান্ট কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। প্রয়োজন দক্ষ প্রশিক্ষকের প্রশিক্ষণ; যাতে তারা আধুনিক সুযোগ-সুবিধার মধ্যে গড়ে উঠতে পারে। মিশন, ভিশন এবং পলিসিকে সুন্দরভাবে কাজে লাগাতে হবে। পাড়া বা মহল্লায় দেশীয় ক্লাবের পতাকা ওড়ানোর ধুম চোখে পড়ে না। দেশের ফুটবলের অসহায় চিত্র এবং দর্শকদের মাঠের প্রতি আকর্ষণ কমে যাওয়ার জন্য ফুটবল খেলার উন্নয়নে নিবেদিত লোকজনই অনেকাংশে দায়ী। খেলাধুলায় আসক্ত হবে তরুণরা, ছাড়বে মদ, গাঁজা আর ইয়াবা। সুশিক্ষা ও খেলাধুলা তরুণদের মধ্যে ন্যায়নিষ্ঠা, সততা ফিরিয়ে আনবে।
৬৮ হাজার গ্রামে ফুটবল খেলা দেখতে চাই, যাতে করে ভালো দক্ষ খেলোয়াড় খুঁজে পেতে পারি। সারা দেশ থেকে যদি একটি টিম দাঁড় করাতে পারি, তবে নিশ্চিত আবারো গাইব সবাই সেই জাতীয় সঙ্গীত। দেশ ফুটবল সঙ্কটকাল অতিক্রম করছে। গত ১০ বছরে ফুটবলের মান বাড়েনি, বরং পেছনের দিকেই হাঁটছে বাংলাদেশ। দেশীয় ফুটবলে প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের কমতি ছিল না। ব্রিটিশ ভারতে দেশীয় ফুটবল খেলা আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। হারিয়ে গেছে ফুটবলের ফেলে আসা সেই সোনালি দিনগুলো। প্রিয় দল, প্রিয় খেলোয়াড়ের খেলা দেখার জন্য কাকডাকা ভোর থেকে ঢাকা স্টেডিয়ামের টিকিট কাউন্টারে ফুটবলভক্তরা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকত টিকিটের জন্য। বর্তমান সময়টায় অতীত ফিরিয়ে এনেছেন প্রবাসী ফুটবলাররা। অন্তত ভারত, ভুটান ও সিঙ্গাপুরের ম্যাচগুলো তাই বলে।
বড় ধরনের বাজেটের পরও ফুটবলের উন্নয়নে ছিল না যথাযথ পরিকল্পনা। মাঠের দুরবস্থার চিত্র তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের যথাযথ মূল্যায়ন না করা, উন্নত মানের সরঞ্জাম, ব্যায়ামাগার, যা অন্যদের থেকে পিছিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশকে। দরকার মাত্র ২২ জন ফুটবল পাগলের। এসব পাগল বাংলার অলিতে গলিতে পড়ে আছে। তাদের খুঁজে দিতে হবে অ্যাকাডেমিতে।
হামজা চৌধুরী কঠিন চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশের ফুটবলকে। সমর্থকদের পক্ষ থেকে চাপ বাড়ছে জাতীয় দলে বেশি বেশি প্রবাসী ফুটবলারদের অন্তর্ভুক্ত করার। অন্য দিকে প্রমাদ গুনছেন দেশীয় ফুটবলাররা। জাতীয় দলে যত বেশি প্রবাসী আসবে, তত কমে যাবে দেশীয়দের সুযোগ। হামজা লেভেলের প্রবাসী ফুটবলারের অন্তর্ভুক্তি বাংলাদেশ দলকে উজ্জীবিত করবে। শুধু মাঠের খেলায় নয়, মাঠের বাইরেও। যার প্রমাণ মিলেছে ভারতের বিপক্ষে শিলংয়ে ২৫ মার্চ। বহুদিন পর বিদেশের মাটিতে ভারতের বিপক্ষে দাপুটে ফুটবল খেলেছে বাংলাদেশ। ভুটানের বিপক্ষে জয় আরো উস্কে দিয়েছে সমর্থকদের। হাইপ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে কুইন সুলিভান আর কাভান সুলিভানকে বাংলাদেশ দলে দেখার প্রত্যাশা করছে ফুটবল অনুরাগীরা। প্রত্যাশা থাকলেও তাদের আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
শেফিল্ড ইউনাইটেডের ফুটবলার নিজের জাত চিনিয়েছেন বাংলাদেশের জার্সিতে। বাংলাদেশের ফুটবলারদের সামনে হামজার সাথে মানিয়ে নেয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ আছে। প্রবাসীদের সাথে সবার বোঝাপড়াটা ঠিকমতো হলেই সব সমস্যা কেটে যাবে। অনেক সাবেক ফুটবলার প্রবাসীদের কিছুটা নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। তারা দেশের ঘরোয়া ফুটবল সচল করে ফুটবলার তুলে আনার পক্ষে। এটি অযৌক্তিক না। দেশের পাইপলাইনে প্রতিভাবান ফুটবলার না থাকলে শুধু প্রবাসীদের দিয়ে ফুটবল চলবে না। আবার এটাও ঠিক, গত প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশে মানসম্মত ফুটবলার খুব বেশি উঠে আসেনি। বিগত বছরগুলোতে জেলাপর্যায়ের লিগ অনিয়মিত। নতুন ফুটবলার উঠে আসার পথ প্রায় বন্ধ। রাকিব, আল-আমিনের মতো কিছু প্রতিভা আছে। শেখ মোরসালিন চুপসে গেছেন। শাহরিয়ার ইমনরাও কতদুর যেতে পারেন তা বলা যাচ্ছে না।
তাই প্রবাসীদের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে উপায় নেই। লোকাল ফুটবলারদের তাদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবে। প্রখ্যাত ফুটবলার গোলাম সারোয়ার টিপু এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘প্রবাসী ফুটবলারদের ওপর নির্ভরতা হচ্ছে সাফল্যের শর্টকাট পথ। হামজা চৌধুরীর বিষয়টি আলাদা। তিনি অনেক উঁচুমানের ফুটবলার। হামজা মানের ফুটবলার সব সময় পাওয়া যাবে না। তাই আমাদের উচিত ঘরোয়া আর জেলা লিগ সচল রেখে প্রতিভাবান ফুটবলার বের করা।’
চীনের উদাহরণ টেনে টিপু বলেন, ‘সাফল্যের নেশায় চীন বিদেশী ফুটবলারদের জাতীয় দলে খেলার সুযোগ করে দিয়েছে। ব্রাজিলের সার্জিনহো ও ইংল্যান্ড যুব দলে খেলা টাইয়াস ব্রাউনিং ও নিকো ইয়োনারিস চীনের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাতেও চীনের ফিফা বিশ্বকাপে খেলার লক্ষ্যপূরণ হচ্ছে না।’ বিদেশীদের নাগরিকত্ব দেয়া চীনা ফুটবল দল প্রত্যাশিত সাফল্য পাচ্ছে না।
১৯৮৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়া ইউনিভার্সিটি দলকে হারিয়ে প্রেসিডেন্ট গোল্ড কাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ লাল দল। মিয়ানমারে চার জাতি ফুটবল, এসএ গেমসে গোল্ড আর সাফ ফুটবল শিরোপা জিতেও উল্লাসে মেতেছিল গোটা দেশ। সেই উল্লাসটা আবার দেখতে চাইছে দেশবাসী। সেটা প্রবাসী ফুটবলারদের কল্যাণে এলেও ক্ষতি নেই। তবে জামালকে ভুলে যাওয়া কি ঠিক হবে। সৌদি ফুটবলের আসর জমিয়েছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তাকে দেখেই এসেছে নেইমার, বেনজেমা, সাদিও মানে, ম্যালকমরা। তেমনি বাংলাদেশে জামাল ভূঁইয়ার অনুসরণে এসেছেন হামজা চৌধুরী, শমিত সোম, ফাহমেদুল, তারেক কাজিরা। এলিটা কিংসলেও হতে পারতেন জামাল-হামজাদের সঙ্গী। সাত বছর অপেক্ষার পর বাংলাদেশের পার্সপোর্ট পেয়ে মাত্র দু’টি ম্যাচ খেলার সৌভাগ্য হয়েছে তার।