বুদ্ধির ফসল আত্মার আশিস
জীবনের অনিবার্য পাঠ : সীমান্ত আকরাম
Printed Edition
‘বুদ্ধির ফসল আত্মার আশিস’ অধ্যাপক শাহেদ আলীর প্রবন্ধ সমগ্র। আমাদের সাহিত্যাঙ্গনে শাহেদ আলীর পরিচিতি প্রধানত কথাসাহিত্যিক হিসেবে হলেও তিনি সিদ্ধহস্তে গদ্যসাহিত্য রচনা করেছেন। এ কথা সত্য, তিনি উভয় বঙ্গের বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারির কথাসাহিত্যিকদের অন্যতম। বিশেষ করে তার গল্পে বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের সোঁদা মাটির গন্ধ যেভাবে মেলে, তেমনটি খুব কম লেখকের গল্পেই পাওয়া যায়।
তারপরও সত্যের খাতিরে বলতে হয়, কথাসাহিত্যেই তার সৃজনশীল সাহিত্য প্রতিভা সীমাবদ্ধ থাকেনি। মোহাম্মদ আসাদের বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘রোড টু মক্কা’র শাহেদ আলী কৃত বাংলা তরজমা গ্রন্থ ‘মক্কার পথ’ পড়তে গিয়ে পাঠকের মনেই হয় না যে, এটি একটি অনুবাদ গ্রন্থ। পাঠক এ বইয়ে মূল রচনার স¤পূর্ণ স্বাদই উপভোগ করতে পারেন।
সৃজনশীল সাহিত্য-প্রতিভার হাতে পড়লে নিরেট গদ্য রচনা কিভাবে নান্দনিক গুণস¤পন্ন গদ্যশিল্প হয়ে ওঠে, তার প্রমাণ আমরা পাই রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, মোতাহার হোসেন চৌধুরী প্রমুখের গদ্য রচনায়। আমার বিশ্বাস, বাংলা সাহিত্যে তাদের ধারারই অন্যতম সার্থক গদ্যশিল্পী শাহেদ আলী।
শাহেদ আলীর প্রথম গল্প ‘অশ্রু’ যখন মাসিক ‘সওগাত’-এ প্রকাশিত হয়, তখন তিনি অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। প্রায় একই সময়ে তিনি লেখেন রাসূলুল্লাহ সা:-এর ওপর প্রবন্ধ ‘মানবতার আদর্শ’-যা কোনোক্রমেই অপরিণত বয়সের রচনা বলে মনে হবে না। সেই তরুণ বয়স থেকে শেষ দিন পর্যন্ত গল্পের পাশাপাশি তিনি লিখে গেছেন অজস্র প্রবন্ধ।
এ গ্রন্থের প্রবন্ধের বিষয়বস্তু হিসেবে তিনি বেছে নেন মানব জীবনের প্রায় সব ক’টি দিক- ধর্ম, নৈতিকতা, দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা, সংস্কৃতি, শিল্পকলা, সাহিত্য, সমাজতত্ত্ব, অর্থনীতি, স্বাধীনতা, জাতিসত্তা, রাজনীতি, শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মের অপব্যবহার ও আধ্যাত্মিকতা, ইহকালীন ও পরকালীন জীবন- ইত্যাকার নানান বিষয়। তার গদ্য রচনায় যুক্তির পাশাপাশি হৃদয়ের অনুভূতি গুরুত্ব পাওয়ায় তা হয়ে ওঠে অনবদ্য শিল্প, যা একই সাথে মানুষের মন, মস্তিষ্ক ও হৃদয়কে স্পর্শ করে।
শাহেদ আলীর জীবনকালে তার একাধিক গল্প-সঙ্কলন, নির্বাচিত গল্প, শ্রেষ্ঠ গল্প ইত্যাদি প্রকাশিত হলেও তার কোনো প্রবন্ধ সংগ্রহ বা প্রবন্ধ সমগ্র প্রকাশিত হয়নি। তার কয়েকটি গদ্য রচনা স্বতন্ত্র পুস্তিকা আকারে ছাপা হলেও তার অধিকাংশ গদ্য রচনাই বিভিন্ন সঙ্কলন বা সাময়িকীর পাতায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অগ্রন্থিত অবস্থায়। শাহেদ আলীর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীকে সামনে রেখে আমি এবার তার গদ্য রচনার সঙ্কলন প্রকাশের প্রস্তাব দিয়েছিলাম তার পরিবারের কাছে। বর্তমান গ্রন্থ সে প্রচেষ্টারই প্রথম ফসল। এ সঙ্কলনে প্রধানত তার ইসলাম-স¤পর্কিত প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। গ্রন্থের শিরোনামও গ্রহণ করা হয়েছে তার ‘বুদ্ধির ফসল আত্মার আশিস’ নামে ইতঃপূর্বে প্রকাশিত পুস্তিকা থেকে।
বলা বাহুল্য, শাহেদ আলী বিশ্বাস করতেন, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ও সামগ্রিক জীবনব্যবস্থা এবং মানুষের জীবনের এমন কোনো দিক নেই, যা ইসলামের এখতিয়ারভুক্ত নয়। সেই নিরিখে তার সাহিত্য, শিল্প, সমাজ, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি প্রভৃতি বিষয়ের রচনায়ও তার বিশ্বাস ও জীবনদর্শনের ছাপ সুস্পষ্ট। তবুও তার যেসব রচনায় প্রত্যক্ষভাবে ধর্ম ও ইসলামের প্রভাব পড়েছে, বর্তমান সঙ্কলনে প্রধানত সেগুলোই স্থান পেয়েছে। তবে এ বিষয়েও আরো রচনা তার রয়েছে, যা নানা কারণে এ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এ গ্রন্থে লেখক ৪০ প্রবন্ধ-নিবন্ধ দিয়ে সাজিয়েছেন। প্রথমত, তিনি ইসলামে প্রাথমিক জ্ঞান, বিধি-বিধান, শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোকপাত করেছেন। যেমন- পরিপূর্ণ জীবনবিধান, ইসলাম, দ্বীন ও দুনিয়া, ইসলাম : জামাত ও উৎসব, রমজানের শিক্ষা ও রমজানের তাৎপর্য। দ্বিতীয়ত : তিনি মানুষের সময় জ্ঞান, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, মৃত্যু, নারী নির্যাতন ও ইসলাম, ইসলামের মৌলিক প্রয়োজন ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরেছেন। যেমন- সময়, মৃত্যুর হাকিকত, অব্যবহিত ও সুদূর লক্ষ্য, স্রষ্টা ও সৃষ্টি, জীবন নিরবচ্ছিন্ন, মূলের সন্ধানে, মানবতার আদর্শ, উসওয়াতুন হাসানা ইত্যাদি।
তৃতীয়ত : মানুষের শিক্ষাজ্ঞান, রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা, ইসলামী দৃষ্টিতে শিক্ষাব্যবস্থা, ইসলাম ও বিজ্ঞান এসব বিষয় তুলে ধরেছেন। যেমন- ইলম, ইসলাম ও জ্ঞানানুসন্ধিৎসা, ইসলামের দৃষ্টিতে বিজ্ঞান, ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা, ইসলামী রাষ্ট্রের শিক্ষা ও শাসনব্যবস্থা ও সমস্যাসঙ্কুল পথ ইত্যাদি। চতুর্থত : তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম সেক্যুলারিজম, ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা, ধর্ম বনাম সামাজিক-রাজনৈতিক সংগ্রাম, আত্মজিজ্ঞাসা, সমস্যা ও সমাধান- এসব লেখায় ধর্মনিরপেক্ষতা, সেকুলারিজম ও সাম্প্রদায়িকতার সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নির্ণয় করেছেন। পঞ্চমত : লেখক ব্যবসায়-বাণিজ্য, অর্থনীতি ও শিল্পনীতি তুলে ধরেছেন। যেমন- রাসূলুল্লাহর অর্থনৈতিক দর্শন, সমাধান কোন পথে, ব্যবসায়-বাণিজ্য ও শিল্পনীতি ইত্যাদি।
সর্বশেষ তিনি এ গ্রন্থে আমাদের সংস্কৃতি, সাহিত্য, ভাষা, মূল্যবোধ, সামাজিক বিপর্যয়, ইতিহাস-ঐতিহ্য, তরুণ সমাজের অবক্ষয়, মুক্তির উপায় ও সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা তুলে ধরেছেন। যেমন লিখেছেন- ইসলামী সংস্কৃতি, তরুণ সমাজ ও ইসলামী মূল্যবোধ, ভাষা, জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও যুবসমাজের ভূমিকা, বিপর্যয়ের হেতু, বিপ্লবের পন্থা, আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, এতিহ্য ও তরুণ সমাজ, মুক্তির পথ, বুদ্ধির ফসল, আত্মার আশিস এবং তরুণ মুসলিমের ভূমিকা ইত্যাদি।
অধ্যাপক শাহেদ আলী জীবনের অভিঙ্গতার বীজ বুনেছেন এ গ্রন্থের পরতে পরতে। তিনি স্কুলজীবন থেকেই সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িত হয়ে পড়েন। ইতিহাসের পাঠক হয়ে ওঠেন শাহেদ আলী। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনীতিক প্রেক্ষাপটের নানা অঙ্গনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী শাহেদ আলী শিক্ষকতার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা ও সাংবাদিকতা করেছেন। একসময় তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনে পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন। তার বর্ণাঢ্য জীবনের জ্ঞানলব্ধ অভিজ্ঞতার ফসল ‘বুদ্ধির ফসল আত্মার আশিস’।
গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লি:। দেশের আপামর জনগোষ্ঠীর দিকনির্দেশনার এক নতুন দ্বার উন্মোচনের লক্ষ্য এবং সেই লালিত স্বপ্নেরই এক মূল্যবান সংযোজন। গ্রন্থটির লেখক অধ্যাপক শাহেদ আলী- একাধারে এদেশের একজন খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, লেখক ও গবেষক। তদুপরি তিনি একজন ইসলামী চিন্তাবিদ ও সার্থক অনুবাদকও বটে। তার লেখা অনেকগুলো প্রবন্ধ থেকে বাঁছাই করে ‘বুদ্ধির ফসল আত্মার আশিস’ এ গ্রন্থটি সঙ্কলন করা হয়েছে।
ইসলাম গতানুগতিক কোনো ধর্মের নাম নয়; বরং একটি পূর্ণাংঙ্গ জীবন ব্যবস্থার নাম। লেখক সে দৃষ্টিভঙ্গিই এ গ্রন্থে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। আশা করি, সাধারণ শিক্ষিত মানুষ এ গ্রন্থটি পাঠ করে উপকৃত হবে- আর তা হলেই এ গ্রন্থের সার্থকতা।