ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

চতুর্মুখী লড়াইয়ের আভাস মৌলভীবাজার-৪ আসনে

Printed Edition
bangla-4
চতুর্মুখী লড়াইয়ের আভাস মৌলভীবাজার-৪ আসনে

এম এ রকিব শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)

চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত পাহাড়-হাওড় পরিবেষ্টিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এবং দেশের অন্যতম পর্যটন এলাকা মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতা বেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনে এবার দলটির অংশগ্রহণ না থাকায় এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভক্তির সুযোগে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে এ আসনে এখন পর্যন্ত বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, গণ অধিকার পরিষদ, বাসদ, সিপিবিসহ আরো দুইজন স্বতন্ত্র প্রার্থী মাঠে বেশ সক্রিয় রয়েছেন।

বিএনপির কেন্দ্র ঘোষিত প্রার্থী শিল্পপতি মুজিবুর রহমান চৌধুরী দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে বেশ সক্রিয়। তিনি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটি ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। এর আগে ২০০৮ ও ২০১৮ সালে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে এ আসনে তিনি নির্বাচন করেন। ২০০১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও নির্বাচন করেছিলেন তিনি। স্থানীয়ভাবে তিনি হাজী মুজিব ও স্বর্ণ মুজিব নামে পরিচিত। হাজী মুজিব ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি এলাকায় মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন সেই ২০০০ সাল থেকে।

এদিকে বিএনপির (একাংশের) নেতাকর্মীরা জানান, আওয়ামী লীগের রোষানলে পড়ে হাজী মুজিব বারবার হামলা-মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এ কারণে দল তাকে মনোনয়ন দিয়ে মূল্যায়ন করেছে বলে দাবি তাদের। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় ভোটাররা তার দিকেই ঝুঁকবেন বলে তারা আশাবাদী।

অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সিলেট মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ও সিলেট মহানগর ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুর রবকে মৌলভীবাজার-৪ আসনে তাদের প্র্রার্থী ঘোষণা করেছে। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিল সিলেট জেলার সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করলেও তফসিল ঘোষণার আগ থেকেই তার হয়ে জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীরাও ভোটারদের সাথে যোগাযোগ বাড়িয়ে দিয়েছেন।

জানা যায়, সম্প্রতি বিএনপির ভেতরের বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আরেক প্রভাবশালী নেতার কারণে। পাঁচবারের নির্বাচিত শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক মেয়র ও ন্যাশনাল টি কোম্পানির পরিচালক শিল্পপতি মো: মহসিন মিয়া মধু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন। তিনি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। ২০০১ সালে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করা এই নেতা প্রয়াত সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের হাত ধরে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মহসিন মিয়া মেয়র থাকাকালে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে বেশ আলোচিত হয়েছেন।

মহসিন মিয়ার অনুসারীরা জানান, ২০০৭ সাল থেকে তিনি একাধিক মামলার শিকার হন। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি স্থানীয় নেতাকর্মী ও শুভাকাক্সিক্ষদের সাথে নিয়ে জনগণের নিরাপত্তায় মাঠে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। এরই মধ্যে তিনি শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় সভা-সমাবেশ ও মতবিনিময় করে জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা বেশ বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা আশাবাদী ভোটাররা এবার তার পক্ষেই যাবেন।

এ আসনে নবগঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপির প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব প্রীতম দাশ। এর আগে তিনি রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন। বড় সমাবেশ না করলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সনাতন ধর্মের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি সক্রিয় প্রচারণা চালাচ্ছেন। এছাড়া গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী হিসেবে চা শ্রমিকের এ আসন থেকে লড়ছেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সভাপতি হারুনুর রশিদ। তিনি সম্প্রতি সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করে নির্বাচনের ঘোষণা দেন। এছাড়া বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের অ্যাডভোকেট আবুল হাসান, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি সিপিবির জলি পাল তাদের দলের প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর বাইরে বরুণা মাদরাসার নায়েবে সদরে মুহতামিম মাওলানা নুরে আলম হামিদীর নামও সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছে।

উল্লেখ্য, চা বাগান ও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মৌলভীবাজার-৪ আসনে মোট ভোটারের প্রায় ৩৭ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছে। দু’টি পৌরসভা ও ১৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৮৭ হাজার ৮৮৮ জন। এখানে ১৯৮৬ থেকে সর্বশেষ নির্বাচন পর্যন্তÍ (১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাদে) প্রতিবারই আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। তবে এবারের নির্বাচনে দলটির অনুপস্থিতিতে বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে চতুর্মুখী লড়াইয়ের আভাস মিলছে।