সিপিডির আলোচনায় উপদেষ্টা ড. তিতুমীর
দেশের রাজস¦ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনা হবে
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, বাজেটে সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি কিংবা কঠোর মিতব্যয়িতা নয়, বরং অপচয় রোধ করাই হবে সরকারের লক্ষ্য। একই সাথে এলটিইউ নির্ভর কর আদায়ের ‘রোগ’ থেকেও এনবিআরকে বের হয়ে আসতে হবে। দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হবে। তিনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কোনো সেবা ভবিষ্যতে আর ডিজিটাল মাধ্যম ছাড়া দেয়া হবে না। আর আইসিসির ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে আজাদ বলেছেন, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর না হলে নতুন সরকারের সময়ে দেশের অর্থনীতি ভালো হবে না। ড. মাশরুর রিয়াজ বলেছেন, দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা একেবারে ভেঙে পড়েছে। সরকারি ব্যয়ের মানে ধস নেমেছে। আগামীতে বিদেশী ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে ভেবে ও প্রয়োজনে সেটা নিতে হবে।
রাজধানীর ব্র্যাক-ইন সেন্টারে গতকাল সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘লুকিং ইনটু বাংলাদেশ’স ডেভেলপমেন্ট : প্রাইয়োরেটি ফর দ্য নিউলি ইলেক্টেড গভর্নমেন্ট ইন দ্য শর্ট টু মিডিয়াম টার্ম’ শীর্ষক বৈঠকে গতকাল প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, পলিসি রিসার্চের ভাইস চেয়ারম্যান ড. সিদ্দিক আহমেদ, আইসিসির ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে আজাদ, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাশরুর রিয়াজ, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আক্তার মালা, বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, অর্থনীতিবিদ ড. আসাদুজ্জামান, বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজীজ রাসেল, ডিসিসিআইর সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ, বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম, বেসিসের সাবেক সভাপতি ও বিডিজবস এর প্রধান নির্বাহী ড. ফাহিম মাশরুর প্রমুখ।
উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ভবিষ্যতে কোনো সেবা ডিজিটাল মাধ্যম ছাড়া দেয়া হবে না। তিনি জানান, সরকার ‘ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারে’র দিকে যাচ্ছে ও এর মূলভিত্তি হবে ইন্টার-অপারেবিলিটি। অর্থাৎ সবসেবা ও ডাটাবেইজ একে অপরের সাথে সংযুক্ত থাকবে। আমাদের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড। যার ফলে লিকেজ করা যাবে না। তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বর্তমানে তিনটি বড় সমস্যা রয়েছে। যার থাকার কথা ছিল তিনি তালিকাভুক্ত হননি আর যার থাকার কথা ছিল না, তিনি তালিকাভুক্ত হয়েছেন। কর্মসূচিগুলো ছড়ানো ও খণ্ডিত অবস্থা (ফ্র্যাগমেন্টেশন)। ডিজিটাল কার্ড ও একক শনাক্তকরণ পদ্ধতির মাধ্যমে এসব সমস্যা দূর করা সম্ভব।
ভাতা ও সামাজিক সুরক্ষায় সংস্কার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, প্রলম্বিত মূল্যস্ফীতির কারণে মধ্যবিত্ত নিম্ন মধ্যবিত্তে, আর নিম্ন মধ্যবিত্ত দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যা নারীকেন্দ্রিক সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে। সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাকে আমাদের সর্বজনীন করতে হবে। আমরা টার্গেট থেকে সর্বজনীনের দিকে যাচ্ছি।
কর ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, আমাদের একটা রোগ ছিল, এলটিইউ দিয়ে ট্যাক্স আদায় করা। এটা একটা মহাব্যাধি। সীমিত সংখ্যক বড় করদাতার ওপর নির্ভর করে রাজস্ব আহরণ টেকসই নয়। কর সংস্কৃতির বিস্তার ঘটাতে হবে এবং কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান আর্থিক বাস্তবতায় সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি (এক্সপ্যানশনারি ফিসকাল পলিসি) নেয়ার সুযোগ নেই। একই সাথে কঠোর মিতব্যয়িতাও সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এখানে একটাই উপায় আছে, অপচয় রোধ করা। বিদ্যুৎ খাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকিকে ‘অসহনীয়’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি টেকসই নয়। এ ক্ষেত্রে চুক্তি পুনঃআলোচনা, সিস্টেম লস কমানো এবং দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
আইসিসির ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে আজাদ বলেন, বর্তমানে গড় ঋণখেলাপির হার ৩৬ শতাংশ। আর সরকারি ব্যাংকগুলোতে তা প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। এই টাকাগুলো কারা নিয়েছে? যারা উইলফুল ডিফল্টার, তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি এক্সিট পলিসি দিয়েছে। আমরা সেটাকে সমর্থন করি। কিন্তু যারা টাকা নিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে, না হলে অর্থনীতি ভালো জায়গায় আসবে না। তিনি বলেন, সরকার বর্তমানে ব্যাংক থেকে ৩২.১৯ শতাংশ ঋণ নিচ্ছে। সেখানে প্রাইভেট সেক্টরের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.১ শতাংশ। মানে আমার জন্য টাকা নাই বা থাকলেও আমি নিতে পারছি না। গ্যাস কানেকশন নাই, বিদ্যুৎ সঙ্কট তাহলে নতুন শিল্পে বিনিয়োগ করব কিভাবে?
তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের মোট ঋণের ৫৮ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে বেতন, সুদ ও ভর্তুকিতে, যা নন-প্রোডাক্টিভ খাত। তিনি বলেন, রাজস্ব আদায় কমছে। ছয় মাসেই ৩৬ হাজার কোটি টাকা টার্গেটের চেয়ে কম রাজস্ব এসেছে। জিডিপি ৩.৯৭-এ নেমে এসেছে। বিনিয়োগ নাই, ভ্যাট নাই, ইনকাম ট্যাক্স নাই, কাস্টম ডিউটি নাই তাহলে উন্নয়ন হবে কিভাবে?
এনার্জিতে বিনিয়োগের তাগিদ দিয়ে এ কে আজাদ বলেন, হাজার হাজার গ্যাস সংযোগের আবেদন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও তিতাসে পড়ে আছে, কিন্তু নতুন সংযোগ দেয়া হচ্ছে না। গ্যাস না পেয়ে শিল্প চালাতে আমাকে সিএনজি থেকে গ্যাস নিয়ে বয়লার চালাতে হয় ডাবল দাম দিয়ে। সরকার যদি চুলার গ্যাস বন্ধ করে এলপিজিতে দেয়, তাহলে সেই গ্যাস শিল্পে দেয়া যায়। তিনি দাবি করেন, ১০ শতাংশ গ্যাস চোরাই লাইনে যাচ্ছে এবং গুড গভর্ন্যান্সের বিকল্প নেই। আইনের শাসন যথাযথ প্রয়োগ করতে না পারলে এবং সরকারি ব্যয় কমাতে না পারলে সঙ্কট কাটবে না।
সরকারি ব্যয় কমানোর প্রস্তাব দিয়ে এ কে আজাদ বলেন, এতগুলো মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর আদৌ দরকার আছে কি না তা পর্যালোচনার জন্য কমিশন করা উচিত। সংসদ সদস্য থাকাকালে পুলিশ প্রটোকল নিয়ে অপ্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন উল্লেখ করে এ কে আজাদ বলেন, ৩০০-৫০০ এমপির জন্য আলাদা নিরাপত্তা এই খরচ সাধারণ মানুষ বহন করছে। যেখানে মানুষের তেল-চাল কেনার টাকা নাই, সেখানে এসব ব্যয় অপ্রয়োজনীয়। তিনি বলেন, শুধুমাত্র ব্যাংকের সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, উল্লেখযোগ্যহারে কালেকশন না হলে, কর্মসংস্থান না হলে, ভ্যাট-ইনকাম ট্যাক্স না এলে উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিল্পকারখানা চালু হলেই রাজস্ব বাড়বে, জিডিপি বাড়বে, কর্মসংস্থান হবে।
ড. মাশরুর রিয়াজ বলেন, ঋণ ব্যবাপনায় আমাদের সমন্বয় বাড়াতে হবে। দক্ষতা বাড়াতে হবে। আমাদের বাজেট প্রক্রিয়া বহু বছর ধরে অনেক সমস্যায় আছে। আমরা করি ইনক্রিমেন্টার বাজেট। এটা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর্থিক খাতে আমাদের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি বলেন, এক কোটি ২০ লাখ টিআইএন আছে। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৩৫ লাখ কর দেয়। এটা জিডিপির মাত্র ৩ শতাংশ হবে।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, বিদেশী বিনিয়োগ গত ৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে। সাড়ে ৩০০ তৈরী পোশাক শিল্প এবং ৫০টির বেশি বস্ত্র শিল্প বন্ধ হয়েছে, মাত্র ২০০ কোটি টাকার জন্য। ব্যাংকে পুন:তফসিল করতে গিয়ে এসব হয়েছে। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি। ব্যাংকের কারণেই এসব শিল্প বন্ধ হয়েছে। তিনি বলেন, ১৮০ দিনের নতুন কিছু চিন্তা না করে বাস্কেটে যা আছে সেগুলো দেখা দরকার।
উপস্থাপনায় পরামর্শ দিয়ে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা এবং আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন ব্যাংকিং খাতের সংস্কার অব্যাহত ও গভীর করা, শক্তিশালী তদারকি এবং আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুশাসন উন্নত করা, অনাদায়ী ঋণ (এনপিএল) সমাধান করা এবং চুরি যাওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার করা। ঋণ পুনর্গঠন, সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং আইনি পদক্ষেপের জন্য সময়সীমাবদ্ধ কৌশল বাস্তবায়ন করতে হবে যাতে শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করা যায় এবং আর্থিক ব্যবস্থায় আস্থা পুনর্নির্মাণ করা যায়। তিনি সুপারিশে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা রক্ষা করুন। নিশ্চিত করুন যে নিয়ন্ত্রক এবং আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির জন্য নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মুক্ত থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশ ১৯৭২ (সংশোধিত ২০২৫) অনুমোদন ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্তৃত্বকে শক্তিশালী করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা জোরদার করা। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করা, জনসাধারণের আস্থা পুনর্নির্মাণ এবং সুষ্ঠু আর্থিক অনুশীলন নিশ্চিত করার জন্য প্রকাশের মান উন্নত করা, নিয়মিত সম্পদের মান পর্যালোচনা (অছজ) পরিচালনা করা এবং বহিরাগত নিরীক্ষা জোরদার করা।
তিনি বলেন, রাজস্ব শৃঙ্খলা উন্নত করা ও রাজস্ব ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা দেশীয় সম্পদ সংগ্রহ জোরদার করার জন্য করের ভিত্তি সম্প্রসারণ করুন। ক্ষুদ্র ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিকীকরণ, অনানুষ্ঠানিক খাতের কার্যক্রমকে একীভূতকরণ এবং উচ্চ আয়ের ও ধনী ব্যক্তিদের কার্যকরভাবে কর ব্যবস্থায় আনা নিশ্চিত করে কর জাল বৃদ্ধি করা। কর প্রশাসন ও শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা। নিরীক্ষাব্যবস্থা উন্নত করা, কর যুক্তিসঙ্গত করতে হবে। তিনি বলেন, অব্যাহতি প্রদান এবং কঠোর প্রয়োগ ও বৃহত্তর স্বচ্ছতার মাধ্যমে ফাঁকি দমন করতে হবে। যাতে সমস্ত প্রাপ্য রাজস্ব সম্পূর্ণরূপে আদায় করা যায়। তিনি বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন ত্বরান্বিত করুন এবং কর প্রশাসন আধুনিকীকরণ করুন। দক্ষতা, ন্যায্যতা এবং সম্মতি বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ই-ফাইলিং, ডেটা শেয়ারিং এবং সুবিন্যস্ত ভ্যাট নীতির মাধ্যমে সরকারি ব্যয় দক্ষতা বৃদ্ধি করুন। ব্যয়কে যুক্তিসঙ্গত করুন এবং অপচয় কমানো এবং আর্থিক শৃঙ্খলা উন্নত করার জন্য উচ্চপ্রভাবশালী উন্নয়ন ব্যয়কে অগ্রাধিকার। রাজস্ব স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা জোরদার করতে হবে। বাজেট প্রতিবেদন উন্নত করা, জনসাধারণের আস্থা তৈরি করতে এবং দায়িত্বশীল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পর্যবেক্ষণ এবং স্বাধীন তদারকি বৃদ্ধি করুন।