আইপিওর অর্থ ব্যবহারে যৌক্তিকতা নিশ্চিতের পরামর্শ পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বিরতির সম্ভাবনাকে সামনে রেখে এশিয়ার অন্যান্য পুঁজিবাজারের মতো দেশের প্রধান পুঁজিবাজারটি ইতিবাচক আচরণে ফিরে।
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
পুঁজিবাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ ব্যবহারের প্রকৃত উপযোগিতা এবং যৌক্তিকতা যাচাই অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্টেক হোল্ডার। তারা উল্লেখ করেছেন প্রকল্প বাস্তবায়নে পুঁজিবাজার থেকে আইপিওর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি সংগ্রহ এবং সে অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রকৃত উপযোগিতা ও যৌক্তিকতা নিশ্চিত উচিত। তারা মনে করেন, আইপিওর অর্থ যে উদ্দেশ্যে নেয়া হচ্ছে, তা আদতে কোম্পানি বা প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্য কতটা কার্যকর হচ্ছে সেটি গভীরভাবে বিবেচনা করা উচিত।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসিতে ‘ডিসকাশন মিটিং অন আইপিও প্রসিডস ইউটিলাইজেশন ফর লোন রিপেমেন্ট অর ইনভেস্টমেন্টস অব ইস্যুয়ার’ শীর্ষক বৈঠক এ সব মন্তব্য করা হয়। বিএসইসি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ, কমিশনার মু. মোহসিন চৌধুরী, কমিশনার মো: আলী আকবর, কমিশনার মো: সাইফুদ্দিন, সিএফএ এবং পুঁজিবাজার অংশীজন প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ প্রতিনিধিরা সভায় উপস্থিত ছিলেন। সভায় আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ ইস্যুয়ার কোম্পানির ঋণ পরিশোধ ও বিনিয়োগ এবং পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। উপস্থিত অংশীজনরা বৈঠকে আইপিওর অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যার যার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে ধরেন।
সভায় নতুন পাবলিক ইস্যু রুলসের অধীনে আইপিও আবেদন, লিস্টিং এবং আইপিও অর্থের ব্যবহারের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। অংশীজনদের পক্ষ থেকে আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ থেকে ঋণ পরিশোধে নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি রাখার পরামর্শ দেয়া হয়। সে সাথে পুনঃতফসিলকৃত ঋণ যা নিয়মিত রয়েছে সেটিকেও আইপিও অর্থ দিয়ে পরিশোধের সুযোগ দেয়ার দাবি জানানো হয়। এ ছাড়াও বন্ড মার্কেট উন্নয়ন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং পুঁজিবাজারে সুশাসন নিশ্চিতকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন বেসরকারি খাত উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের এমডি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো আইপিও অর্থ ব্যবহার করে ঋণ পরিশোধের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও স্কয়ার গ্রুপের এমডি তপন চৌধুরী বলেন, আইপিওর অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রকৃত উপযোগিতা ও লাভজনকতা যাচাই করা জরুরি।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্সের চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বলেন, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখতে শক্তিশালী পুঁজিবাজার প্রয়োজন। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাশরুর আরেফিন বলেন, উৎপাদনশীল ঋণ আইপিও অর্থ দিয়ে পরিশোধ করে ক্যাপিটাল রি স্ট্রাকচারিংয়ের সুযোগ থাকা উচিত।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের প্রেসিডেন্ট রিয়াদ মাহমুদ বলেন, বৈশ্বিক সঙ্কটে ক্ষতিগ্রস্ত কোম্পানিগুলোকেও আইপিও অর্থ দিয়ে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেয়া প্রয়োজন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, কোম্পানির জন্য উপকারী হলে যাচাইবাছাই করে আইপিও অর্থ দিয়ে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেয়া উচিত।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ঢাকার প্রেসিডেন্ট কামরান তানভিরুর রহমান বলেন, স্বল্পমেয়াদি ডিপোজিট দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিরুৎসাহিত করে পুঁজিবাজারভিত্তিক অর্থায়ন বাড়াতে হবে।
সভায় বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়ন এবং প্রাণবন্ত ও গতিশীল পুঁজিবাজার গড়তে কমিশন কাজ করছে। পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তি উৎসাহিত করতে বিএসইসি প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে মূল্যবান মতামত ও প্রস্তাবনার জন্য ধন্যবাদ। অংশীজনদের মতামত ও প্রস্তাবনা বিএসইসি মূল্যায়ন করে দেখবে। তবে বিএসইসির অন্যতম প্রধান ম্যান্ডেট হলো পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা।
তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে বলেন, পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানিগুলোকে গভর্নেন্স ফ্রেমওয়ার্কে আনা ও ভালো মৌলভিত্তি কোম্পানি তালিকাভুক্তির কাজ চলমান রয়েছে। সভায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিরা, বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক, পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
এ দিকে গত সপ্তাহটি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) জন্য সূচক ও লেনদেন দু’দিক থেকেই ইতিবাচক ছিল। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বিরতির সম্ভাবনাকে সামনে রেখে এশিয়ার অন্যান্য পুঁজিাবাজরের মতো দেশের প্রধান পুঁজিবাজারটি ইতিবাচক আচরণে ফিরে।
ডিএসইর প্রধান সূচকটি গত সপ্তাহে ৪১ দশমিক ৭৫ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। রোববার পাঁচ হাজার ২৫৬ দশমিক ৮৪ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার সপ্তাহ শেষে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ২৯৮ দশমিক ৫৯ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ২৪ দশমিক ৭১ ও দশমিক ২১ পয়েন্ট।
সূচকের পাশাপাশি গত সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেনেও বড় ধরনের উন্নতি ঘটে। গত সপ্তাহে ডিএসইর মোট লেনদেন দাঁড়ায় চার হাজার ৫১৪ কোটি টাকায়, যা আগের সপ্তাহের চেয়ে ৩৭ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি। আগের সপ্তাহে ডিএসইর মোট লেনদেন ছিল তিন হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। তবে সপ্তাহটিতে মোট কার্যদিবস ছিল চারটি। এ সময় ডিএসইর সপ্তাহিক গড় লেনদেনেও উন্নতি ঘটতে দেখা যায়। আগের সপ্তাহের চারটি কর্মদিবসে ডিএসইর গড় লেনদেন ছিল ৮১৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা, যা গত সপ্তাহে ১০ দশমিক ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯০২ কোিিট ৮৪ লাখ টাকায় পৌঁছে।
বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধনে যোগ হয়েছে এক হাজার ৯১৯ কোটি টাকা, যা মোট বাজার মূলধনের দশমিক ২৮ শতাংশ বেশি। ছয় লাখ ৮৫ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা মূলধন নিয়ে সপ্তাহ শুরু করা বাজারটির মূলধন সপ্তাহান্তে দঁাঁড়ায় ছয় লাখ ৮৭ হাজার ৫৫০ কোটি টাকায়।