নির্বাচন সামনে রেখে ফেনী সীমান্ত দিয়ে ঢুকেছে অবৈধ অস্ত্র
Printed Edition
ফেনী অফিস
- নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ২ নেতাসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ
- ভারতের আগরতলায় প্রশিক্ষণ আসাম থেকে অস্ত্র আসার অভিযোগ
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির লক্ষ্যে ভারত সীমান্তবর্তী ফেনীতে অবৈধ অস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপর্যায়ের নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ফেনীর দুই সাবেক নেতাসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এসব অস্ত্র ইতোমধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের হাতে পৌঁছে গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ফেনী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম ও সাবেক রেলমন্ত্রী মজিবুল হকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মহিবুল আলম মজুমদার কাননসহ একাধিক নেতা এসব অস্ত্র সরবরাহে যুক্ত ছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
সূত্রগুলোর দাবি, ফেনী ও কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে অন্তত দুই থেকে তিনটি সিন্ডিকেট শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র দেশে ঢোকানোর চেষ্টা করেছে। এসব সিন্ডিকেটের কয়েকজন সদস্য মাদক পাচারের সাথেও জড়িত। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অন্তত সাতজন নেতার সম্পৃক্ততায় প্রায় ৫০ জনের একটি দলকে ভারতের আগরতলায় প্রশিক্ষণ দেয়া হয় বলেও গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মধ্যে ফেনী জেলা ছাত্রলীগের দুই সাবেক নেতা রয়েছেন।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে অন্তত ১০ থেকে ১৪টি অবৈধ অস্ত্র ফেনী সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢোকানো হয়। বিশেষ করে ২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর এসব অস্ত্র প্রবেশ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অস্ত্রগুলোর বেশিরভাগ আধুনিক শটগান ও পিস্তল। এগুলো প্রধানত পরশুরাম সীমান্তের বিলোনিয়া-সংলগ্ন এলাকা দিয়ে আনা হয়েছে।
এর মধ্যে শহরের বিরিঞ্চি এলাকা থেকে একটি এবং কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে আরেকটি অস্ত্র উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত বুধবার রাতে বিজিবি ছাগলনাইয়া উপজেলার বাগানবাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় দুই রাউন্ড গুলি ও দু’টি ম্যাগজিনসহ একটি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে। গোয়েন্দাদের ধারণা, প্রশাসনের নজরদারি এড়িয়ে গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আরো অস্ত্র দেশে আনা হয়েছে। এসব অস্ত্রের একটি অংশ ফেনীর পাশাপাশি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম সীমান্ত দিয়েও প্রবেশ করেছে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত পারাপারে প্রতিটি অস্ত্র আনতে প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ নেয়া হয়। অস্ত্রগুলো ভারতের আসাম থেকে আনা হয় বলে দাবি করা হচ্ছে। ফেনী সদরের ধর্মপুর ইউনিয়নের বরইয়া এলাকা দিয়ে রিয়াদ ও ভূট্টো নামে দুই ব্যক্তি অস্ত্র আনার সাথে জড়িত থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফুলগাজী সীমান্ত এলাকায় সাফায়েত আহম্মদ পাটোয়ারী রাকিব ও শেখ ফরিদ নামের দু’জনকে সন্দেহের তালিকায় রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রাকিবকে দেড় সপ্তাহ আগে ভারতীয় ওষুধ ও প্রসাধনীসহ আটক করা হলেও তিনি অস্ত্র পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গোয়েন্দা সূত্র আরো জানায়, রাকিব ও শেখ ফরিদ জামমুড়া সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিলসহ মাদক এবং অবৈধ অস্ত্র-গোলাবারুদ কমিশনের বিনিময়ে বহন করে আনত। তারা জামমুড়া ও হরিকিল সীমান্ত দিয়ে কাপড় ও ভারতীয় প্রসাধনী এনে বন্ধুয়া ব্রিজ পর্যন্ত পৌঁছে দিত। এ সিন্ডিকেটের একটি অংশ ফেনীতে অস্ত্রের চালান ঢোকানোর দায়িত্বে ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রায় এক মাস আগে খাগড়াছড়িতে ফেনী ও কুমিল্লার জন্য রিভলভার ও শটগানের অর্ডার দেয়া হয়। সেখানে ‘হারেস’ নামে এক ব্যক্তি এ দায়িত্বে ছিলেন বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক সদস্য জানান, বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতাসহ অন্তত ছয়জন নেতার কাছে এসব অস্ত্র পৌঁছানো হয়েছে। একই মডেলের চারটি অস্ত্র চারজন নেতা গত নভেম্বরে নিয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। তালিকায় ফেনী জেলা বিএনপি ও ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার নামও রয়েছে। এ ছাড়া এক কেন্দ্রীয় নেতা ও ফুলগাজী উপজেলা বিএনপির এক নেতার কাছেও অবৈধ অস্ত্র থাকার তথ্য রয়েছে বলে দাবি সূত্রের। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের আরো কয়েকজন নেতার কাছেও অস্ত্র পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার একটি বড় অংশ সোনাগাজী উপজেলায় পাঠানো হয়।
গোয়েন্দাদের দাবি, গত ৪ আগস্ট ব্যবহৃত বেশিরভাগ অস্ত্র আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছ থেকে হাতবদল হয়ে বিএনপির কিছু নেতার হাতে গেছে। এসব অস্ত্রধারীর গতিবিধি গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে।
এ দিকে ৫ আগস্টের পর জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ দাগনভূঁঞা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ সড়কে ড্রেনেজ কাজ বন্ধকে কেন্দ্র করে যুবদল কর্মী মোহাম্মদ তোফায়েলের নেতৃত্বে অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা ঘটে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি একই উপজেলায় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময়ও অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবদল নেতা বলেন, সেখানে একাধিক অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে। বিএনপি ছাড়াও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কিছু নেতার কাছেও অস্ত্র থাকতে পারে বলে গোয়েন্দাদের ধারণা। বিশেষ করে শহরের রামপুর ও পুরোনো পুলিশ কোয়ার্টার এলাকায় এসব অস্ত্র থাকার তথ্য রয়েছে। তবে উদ্ধার হওয়া কিছু অস্ত্র পুরোনো বলেও দাবি করা হচ্ছে।
ফেনী জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় সূত্র জানায়, গত অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত চার মাসে যৌথ বাহিনীর অভিযানে ফেনী থেকে চারটি দেশীয় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয় এবং চারটি মামলা করা হয়েছে।
ফেনীর ৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ রাখতে বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। নির্বাচনকালীন সময়ে সীমান্তে বিজিবি ও বিএসএফের টহল জোরদার করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মো: সাইফুল ইসলাম বলেন, সব ধরনের অপতৎপরতা প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।