নাব্যতা সঙ্কট, দখল ও দূষণে মৃতপ্রায় কেন্দুয়ার খাল-নদী
Printed Edition
আবু বকর ছিদ্দিক কেন্দুয়া (নেত্রকোনা)
নাব্যতা সঙ্কট, দখল ও দূষণের কবলে পড়ে ক্রমেই অস্তিত্ব হারাচ্ছে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার খাল ও নদীগুলো। অপরিকল্পিত বাঁধ ও সেতু নির্মাণ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। ফলে কৃষিনির্ভর এ অঞ্চলের সেচব্যবস্থা, মৎস্যসম্পদ ও নৌ-ব্যবসা মারাত্মকভাবে তিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে বাড়ছে ােভ ও হতাশা।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলা জুড়ে যেসব নদী রয়েছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বাউরী, পাতকুরা, সাতা এবং বেতাই নদী। এছাড়া, এই অঞ্চলে রাজী খাল ও বাট্টা খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলাশয়ও রয়েছে, যা স্থানীয় কৃষি ও মৎস্য চাষে বিশেষ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সম্প্রতি নদী ও খালগুলো দখল দূষনে মৃত্যুপ্রায় অবস্থায় পড়ে আছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কেন্দুয়া উপজেলায় চারটি নদী ও ১৩টি খাল রয়েছে। তবে সরেজমিন দেখা গেছে, সংস্কার ও খননের অভাবে অধিকাংশ খাল-নদী পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও তীর ভেঙে পড়েছে, আবার অনেক স্থানে দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে বসতি ও নানা স্থাপনা। দূষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জলজ পরিবেশও।
এক সময় স্রোতস্বিনী এসব খাল-নদীতে এখন আর পানির স্রোত নেই বললেই চলে। অনেক জায়গায় শুকিয়ে গিয়ে সমতল জমিতে পরিণত হয়েছে। কোথাও ধান ও সবজির আবাদ হচ্ছে, কোথাও মানুষ নদী এপার-ওপাড় হেঁটে পার হচ্ছে। গবাদিপশু চরছে নদীর বুকে, শিশুরা ক্রিকেট ও ফুলবল খেলছে। অথচ কয়েক দশক আগেও এসব নদ-নদীতে সারা বছরই পানি প্রবাহিত হতো, পাওয়া যেত প্রচুর মাছ।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, একসময় নদীপথ ছিল এলাকার প্রধান যোগাযোগ ও বাণিজ্যের মাধ্যম। খাল-নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল হাটবাজার। ছোট-বড় নৌকা, লঞ্চ চলাচল করত নিয়মিত। জেলেদের জীবিকার প্রধান উৎস ছিল এসব জলাধার। এখন সেই চিত্র একেবারেই বদলে গেছে। অনেক জেলে পেশা পরিবর্তন করেছেন, আর যারা টিকে আছেন, তারা বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন।
কৃষকদেরও ভোগান্তি কম নয়। আগে স্বল্প খরচে খাল-নদীর পানি ব্যবহার করে সেচ দেওয়া যেত। এখন সেচের জন্য গভীর নলকূপ বা অন্য ব্যয়বহুল ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কমছে লাভ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ দিন ধরে খাল-নদী পুনঃখনন ও দখলমুক্ত করার দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অপরিকল্পিত বাঁধ ও ব্রিজ নির্মাণের ফলে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা নাব্যতা সঙ্কটকে আরো তীব্র করছে।
নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: শাখাওয়াত হোসেন বলেন, খাল-নদীগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়ে সমীা চলছে। সমীা শেষে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: রিফাতুল ইসলাম জানান, বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে। দ্রুত কার্যকর পদপে নেয়া হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
স্থানীয়দের মতে, দ্রুত খাল-নদী পুনঃখনন, দখলমুক্তকরণ এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে কেন্দুয়ার প্রাকৃতিক জলাধারগুলো একসময় পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে। এর প্রভাব পড়বে কৃষি, পরিবেশ ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর।