সূচক ও লেনদেনে ইতিবাচক ধারায় ফিরল পুঁজিবাজার

আশার আলো দেখছেন বিনিয়োগকারীরা

Printed Edition
artho-1
সূচক ও লেনদেনে ইতিবাচক ধারায় ফিরল পুঁজিবাজার

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

পাঁচ দিনের ধারাবাহিক পতনের পর অবশেষে ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে দেশের পুঁজিবাজার। গতকাল দুই পুঁজিবাজারে সব সূচকেরই কমবেশি উন্নতি ঘটে। সকালে লেনদেনের শুরুতেই ঊর্ধ্বমুখী হওয়া সূচকগুলো বিভিন্ন পর্যায়ে মৃদু বিক্রয়চাপের মুখে পড়লেও তা সামলে নেয়। এতে দিনশেষে বাজারগুলোতে সূচকের উন্নতি ঘটে। আর সূচকের উন্নতির ফলে গতকাল দুই বাজারেই বৃদ্ধি পেয়েছে লেনদেনও, যা সামনের দিনগুলোর জন্য ইতিবাচক মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গতকাল সকালে লেনদেনের শুরুতেই দুই পুঁজিবাজারের সব সূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী। বড় ধরনের বিক্রয়চাপে না পড়ায় দিনের বেশির ভাগ সময় বাজারগুলো এ আচরণ ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৪৮ দশমিক ০৫ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ৪ হাজার ৮২৬ দশমিক ৪৭ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে পৌঁছে যায় ৪ হাজার ৮৭৪ দশমিক ৫২ পয়েন্টে। তবে লেনদেন শুরুর ১ ঘণ্টার মাথায় বেলা ১১টায় সূচকটি পৌঁছে যায় ৪ হাজার ৮৯০ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৬৪ পয়েন্টের বেশি। লেনদেনের এ পর্যায়ে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মুনাফা তুলে নিতে গিয়ে বিক্রয়চাপ বৃদ্ধি করলে দুপুর ১২টার দিকে সূচকটি নেমে আসে ৪ হাজার ৮৭০ পয়েন্টে। দিনের বাকি সময় আর বিক্রয়চাপ তৈরি না হলে দিনশেষে বাজারটি সূচকের উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। একই সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১৭ দশমিক ৭৫ ও ৭ দশমিক ৭১ পয়েন্ট।

দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৪৬ দশমিক ৫৫ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। একই সময় বাজারটির দুই বিষেশায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১৮ দশমিক ২৬ ও ২৫ দশমিক ০১ পয়েন্ট।

সূচকের এ উন্নতি বিনিয়োগকারীদের আশ^স্ত করলে তারা বাজারে অংশগ্রহণও বাড়িয়ে দেন। এতে দুই বাজারেই লেনদেনের উন্নতি ঘটে গতকাল। ঢাকা শেয়ারবাজার গতকাল ৩৯৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ১০২ কোটি টাকা বেশি। রোববার ডিএসইর লেনদেন ছিল ২৯৩ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে ১২ কোটি টাকা থেকে ১৫ কোটিতে পৌঁছে লেনদেন। গতকালের বাজার আচরণ বিনিয়োগকারীদের কিছুটা হলেও আশ^স্ত করেছে। বিভিন্ন ট্রেডিং হাউজ ঘুরে বিনিয়োগকারীদের এ মনোভাব জানা যায়। ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফ্লোরগুলোতে দেখা যায় অনেকেই লেনদেনে অংশ নিচ্ছেন। আর যারা বাজার পর্যবেক্ষণে ছিলেন তাদের মধ্যেও দেখা যায় স্বস্তি। বাজার আচরণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা নয়া দিগন্তকে বলেন, সামনের দিনগুলোতে ভালো কিছুর প্রত্যাশা তাদের। তারা মনে করেন, বড় কোনো অঘটন না ঘটলে আর বিশেষ কোনো কারণে বিক্রয়চাপ বৃদ্ধি না পেলে সাইড লাইনে থাকা বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বিনিয়োগে আসতে পারেন। তখন আবার গতি পাবে বাজার।

তাদের এ কথার সাথে একমত পোষণ করছেন পুঁজিবাজারের বিভিন্ন স্টেক হোল্ডাররাও। একটি বেসরকারি ব্যাংকের সিকিউরিটিজ হাউজের শীর্ষ নির্বাহী নয়া দিগন্তকে বলেন, বাজারটা নির্ভর করে বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ঘটলে তাদের মাঝে এ আস্থা সৃষ্টি হয়। তা ছাড়া বর্তমানে বাজারের যে মূল্যস্তর তা বিনিয়োগের জন্য খুবই উপযোগী। এ মুহূর্তে যারা শেয়ার ধারণ করবেন এবং পাশাপাশি কিছুটা ধৈর্য ধরবেন তাদের লোকসান হওয়ার কারণ নেই। তবে এ ধরনের বাজারে হুটহাট বড় কিছু পাওয়ার সুযোগ কম। তাই একটু সময় নিয়ে অপেক্ষা করতে হবে। আর ভালো কোম্পানিতেই বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

গতকালের বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সব খাতেই কমবেশি মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গতকাল। কোনো কোনো খাতে শতভাগ কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে দেখা গেছে। তবে বরাবরের মতো স্বল্পমূলধনের কোম্পানিগুলোর প্রাধান্য গতকালও বজায় ছিল। তা ছাড়া ব্যাংক, বীমা, টেক্সটাইলসের মতো খাতগুলোর মূল্যবৃদ্ধিই গতকাল দুই পুঁজিবাজার সূচককে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া গ্রামীণফোন ও স্কয়ার ফার্মার মতো বড় মূলধনের আরো কয়েকটি কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধিও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

ঢাকা শেয়ারবাজারে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন। ১৮ কোটি ৮২ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ১৭ লাখ ৬১ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ১৬ কোটি ৫১ লাখ টাায় ৮৩ লাখ ৭৩ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে বস্ত্র খাতের সায়হাম কটন মিলস উঠে আসে দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে কে অ্যান্ড কিউ, রহিমা ফুড করপোরেশন, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস ও মুন্নু ফেব্রিক্স লিমিটেড।

ডিএসইতে মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল মুন্নু অ্যাগ্রো অ্যান্ড জেনারেল মেশিনারিজ। কোম্পানিটির ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গতকাল। ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল রহিম টেক্সটাইলস। ডিএসইতে মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আইসিবি এএমসিএল সেকেন্ড মিউচুয়াল ফান্ড, চার্টার্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স, শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, সায়হাম কটন মিলস, জেমিনি সি ফুডস, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, নিটল ইন্স্যুরেন্স ও মনোস্পুল পেপার।

দিনের দরপতনের শীর্ষে ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল শ্যামপুর সুগার মিলস লিমিটেড। কোম্পানিটি ৮ দশমিক ৪০ শতাংশ দর হারায়। গতকাল ৫ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল নুরানি টেক্সটাইলস। দরপতনের তালিকার শীর্ষে থাকা অন্যগুলো ছিল নর্দার্ন জুট, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ইয়াক্বীন পলিমার, ইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, জুট স্পিনার্স, আইসিবি এমপ্লয়িজ মিউচুয়াল ফান্ড, ঝিল বাংলা সুগার মিলস ও মার্কেন্টাইল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স।