যুদ্ধ থেকে ট্রাম্পের বের হওয়ার সব পথ বন্ধ করছে ইসরাইল
মিডল ইস্ট আই-এর বিশ্লেষণ
Printed Edition
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সম্ভবত ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঠিক ১৮ মাস আগের লেবাননে চালানো পেজার হামলার মতোই সহজ হবে। নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সামনে লেবাননের সেই ‘দুঃসাহসিক অভিযান’কে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন, যেখানে হিজবুল্লাহর নেতৃত্বকে নিমিষেই ধসিয়ে দেয়া হয়েছিল। ট্রাম্পও হয়তো এই ফাঁদে পা দিয়ে নিজেকে এমন এক প্রেসিডেন্ট হিসেবে কল্পনা করছেন, যিনি জর্জ ডব্লিউ বুশের ব্যর্থ হওয়া ‘মধ্যপ্রাচ্য পুনর্গঠন’ মিশন সফল করবেন।
নেতানিয়াহু অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে ট্রাম্পকে ইরান যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন যাতে তিনি চাইলেও আর এই পথ থেকে সরে আসতে না পারেন।
তবে ট্রাম্পের উচিত ছিল লেবাননের কথিত সাফল্যের দিকে না তাকিয়ে গাজায় ইসরাইলের নৈতিক ও কৌশলগত পরাজয়ের দিকে নজর দেয়া। গত আড়াই বছর ধরে গাজাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার পরও হামাসকে নির্মূল করতে পারেনি ইসরাইল। বরং ইসরাইলি বাহিনী এখন একটি নির্দিষ্ট নিরাপদ অঞ্চলে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। গাজার মতো একটি ছোট এলাকায় যেখানে ওয়াশিংটন অস্ত্রের নিরবচ্ছিন্ন জোগান দিয়েছে, সেখানেই যদি ইসরাইল জয়ী হতে না পারে, তবে ইরানের মতো একটি বিশাল দেশে তারা কিভাবে সফল হবে সেই প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষক জোনাথন কুক। ইরান গাজার চেয়ে ৪,৫০০ গুণ বড় এবং তাদের সামরিক শক্তি ও মিসাইল ভাণ্ডার হামাসের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি শক্তিশালী।
ইরান ইতোমধ্যেই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানছে। তেহরান এখন বিশ্ব অর্থনীতিকে জ্বালানি সঙ্কটে ফেলে পশ্চিমাদের দেয়া দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার পাল্টা জবাব দিচ্ছে। গাজার সমতল ভূমির টানেলের চেয়ে ইরানের পাহাড়ি ভূখণ্ড ও গ্রানাইট পাথরের গিরিখাতগুলো সামরিকভাবে অনেক বেশি সুবিধাজনক।
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানের দৃশ্যমান সামরিক কাঠামো ধ্বংস করছে; কিন্তু গাজার মতোই মাটির নিচে বা দৃষ্টির আড়ালে থাকা ইরানের প্রকৃত শক্তি সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। ট্রাম্প এখন এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন যেখানে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ আর তার হাতে নেই; বরং ইসরাইল ও ইরানই এখন মূল চালিকাশক্তি।
ইসরাইলের প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানে স্থিতিশীলতা নয় বরং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। তারা চায় ইরান একটি ভেঙে পড়া রাষ্ট্রে পরিণত হোক, যাতে তারা আর ইসরাইলের জন্য হুমকি না থাকে। অন্য দিকে, ট্রাম্প চাচ্ছেন বিশ্ব বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে যাতে মার্কিন অর্থনীতি ধসে না পড়ে। কিন্তু ইরানের ওপর ট্রাম্পের কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই কারণ তিনি অতীতে পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসেছেন এবং আলোচনার মাঝপথে হামলা চালিয়েছেন।
তেহরান এখন যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক শিক্ষা দিতে চায় যা ওয়াশিংটন সহজে ভুলবে না। ট্রাম্প এখন খাগ দ্বীপ দখলের পরিকল্পনা করলেও ইরান সেখানে পাল্টা হামলার হুমকি দিয়ে রেখেছে। জোনাথন কুকের মতে, ট্রাম্প এই ‘চিকেন গেম’ বা স্নায়ুযুদ্ধে জয়ী হওয়া তো দূরের কথা, বের হওয়ার পথটুকুও খুঁজে পাবেন না কারণ ইসরাইল সেই পথগুলো সযতেœ বন্ধ করে দিচ্ছে।