রাউজানে এক দিনের ব্যবধানে আরো ১ বিএনপি কর্মী খুন

Printed Edition

চট্টগ্রাম ব্যুরো

উত্তর চট্টগ্রামের সন্ত্রাসের জনপদ রাউজানে রাজনৈতিক খুনোখুনি যেন থামার নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রাউজানে ২৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে দু’টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। বালুমহাল দখল, পাহাড় কাটা, মাটি কাটা বা চাঁদাবাজিসহ নানা কারণে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলোর মধ্যে এই খুনোখুনির ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ রোববার দিবাগত রাতে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে খুন করা হয় মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন (৪৫) নামের এক বিএনপি কর্মীকে।

স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ শমসেরপাড়া এলাকায় নাছিরকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়া হয়। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দলীয় কোন্দলের জের ধরে ‘সন্ত্রাসী আলম গ্রুপ’ নাছিরকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে বলে সূত্র জানায়। এতে নাছিরের শরীরে ৮-১০টি গুলি বিদ্ধ হয়। ইতঃপূর্বে ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বরও প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসীরা নাছিরকে তার বাড়ির পাশে কুপিয়ে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায়। সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেলেও ১৭ মাস পর পুনরায় প্রতিপক্ষের হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে অবশেষে হার মানলেন মৃত্যুর কাছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গুলির আঘাতে নাছিরের শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায়। নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে আসে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। নিহত নাছির কদলপুর ইউনিয়নের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ধামা ইলিয়াসের সহযোগী ছিলেন বলেও জানা গেছে। নিহত নাছির ওই এলাকার দুদু মিয়ার ছেলে।

রাউজান থানার ওসি সাজেদুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিহত নাছিরের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা রয়েছে। সে এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত। ঘটনাটি পরিকল্পিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের প্রক্রিয়া চলছে। এর আগে গত শনিবার ভোরে মাটি কাটা নিয়ে বিরোধে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন বিএনপিকর্মী মো: কাউসার বাবলু।

কেন এই খুনোখুনি?

স্থানীয়দের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, রাউজান কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। কাউখালী উপজেলার সাথে লাগোয়া হলুদিয়া বর্ডারের সাথে রামগড় সড়ক দিয়ে সংযোগ রয়েছে রাউজানের, তা ছাড়া কাপ্তাই ও রাঙ্গামাটি সড়কের সাথেও রয়েছে সংযোগ। এসব সড়ক দিয়ে রাউজানে চোলাই মদসহ মাদকের ব্যাপক বিস্তৃতি। এসব ব্যবসার কর্তৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে স্থানীয় বিএনপির সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মাঝে। এ ছাড়া মাটি কাটা ও জলাশয় ভরাট নিয়ে কর্তৃত্ব, প্রবাসীরা নতুন বাড়ি নির্মাণ করলে ইট-বালু-রড-সিমেন্ট সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো থেকে কিনতে বাধ্য করা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলোর কর্তৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, মূলত উত্তর ও দক্ষিণ রাউজানকেন্দ্রিক পৃথক সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর তৎপরতা চলে। আওয়ামী আমলে তৎকালীন এমপি ফজলে করিমের হয়ে এসব সন্ত্রাসীরা তৎপরতা চালালেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে পালিয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের একটি বড় অংশ দেশে ফিরে বিএনপির নেতৃত্বকে নিজেদের গডফাদার হিসেবে বেছে নেয়। এর পর থেকেই এলাকায় চাঁদাবাজিসহ মাটি কাটা, বালুর ব্যবসা, জলাশয় ভরাট নিয়ে আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া হয়ে ওঠে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধ চালিয়ে যাওয়া সন্ত্রাসীরা।

স্থানীয়দের মতে, অধিকাংশ সন্ত্রাসীর রাজনৈতিক পদ-পদবি নেই। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে সে সরকারের প্রভাবশালীদের গডফাদার হিসেবে বেছে নেয় তারা।

স্থানীয় একাধিক বিএনপি নেতাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, রাউজানের মানুষ দিন দিন অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন। উত্তর রাউজানে সন্ত্রাসী রায়হান, ফটিকছড়িতে ইমন, আজিজুল হক, মোজাম্মেল, কাজল, কুরা আজম এবং দক্ষিণ রাউজানে জানে আলম, ফজল হক, মামুন, ছোটন, ইফসুফ তালুকদার, রমজান, হাজী জসিমরা বিএনপির পরিচয়ে নিজেদের অপকর্ম চালাচ্ছে। তাদের অত্যাচারে মানুষ সরকারের প্রতিও বিরূপ হয়ে উঠছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর বিএনপির বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলোর ধারাবাহিক সংঘর্ষ, গুলি ও হত্যাকাণ্ডে উত্তর চট্টগ্রামের রাউজান এক আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছিল। নির্বাচনের আগে বিএনপির দুই গ্রুপে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও বাবলু ও নাছিরের খুনের মধ্য দিয়ে রাউজান আবারো অশান্ত হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

এ দিকে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খান গতকাল দুপুরে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম আর চলতে দেয়া যাবে না। তারা যেন মানুষের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে, সে জন্য যা যা করা দরকার আমরা করব। পুলিশ সুপার বলেন, রাউজানের সবশেষ দু’টি খুনের ঘটনায় ইতোমধ্যে প্রধান সন্দেহভাজনসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। আমাদের কাজ চলমান রয়েছে। রাউজানে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। পাহাড়ি এলাকাগুলোতে চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।