গুরুদাসপুরে শ্রমিক কেনার হাটে বৈষম্যের শিকার নারীরা

Printed Edition
bangla-3
মহাসড়কের পাশে নয়াবাজার শ্রমিক বেচা-কেনার হাট : নয়া দিগন্ত

গুরুদাসপুর (নাটোর) সংবাদদাতা

রসুন রোপণ ও ধান কাটার মৌসুমকে কেন্দ্র করে নাটোরের গুরুদাসপুরের বিভিন্ন পয়েন্টে প্রতিদিন বসছে দিনমজুর কেনাবেচার হাট। ভোররাত থেকেই বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের নয়াবাজার, কাছিকাটা ও হাজীরহাট এলাকায় হাজারো নারী-পুরুষ শ্রমিক জড়ো হয়ে অপেক্ষা করেন দিনের কাজের শ্রম বিক্রির জন্য।

সরেজমিন দেখা যায়, কাজের সন্ধানে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, সলঙ্গা, উল্লাপাড়া ও পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুরসহ দূর-দূরান্তের শ্রমিকরা ভোর ৪টায় নছিমন, করিমন, ট্রাক এবং বাসের ছাদে উঠে চলে আসছেন এই শ্রম বিক্রির হাটে। সকাল ৮টা পর্যন্ত চলে শ্রমিক কেনাবেচা। প্রয়োজন অনুযায়ী গৃহস্থরা দিনমজুরি বা কাজ চুক্তিতে শ্রমিক নিয়ে যান।

কৃষিকাজের ব্যস্ত মৌসুমে শ্রমিকের চাহিদা বেশি হওয়ায় তাদের মজুরিও বেড়েছে। বর্তমানে পুরুষ শ্রমিক দৈনিক ৫০০-৬০০ টাকা, আর নারী শ্রমিকদের মজুরি ৩০০-৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে নারী-পুরুষের মধ্যে এ মজুরি বৈষম্য নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে শ্রমিকদের মাঝে। এ ছাড়া সারা দিন না খেয়ে কাজ করা এবং তিনবেলা খাবার সরবরাহের ভিত্তিতে মজুরির অঙ্কেও পার্থক্য রয়েছে। বেলা বাড়লে বসে থাকা শ্রমিকদের দর আরো কমে যায়।

দিনমজুর মুন্না, ফয়জাল ও সোহাগ জানান, মজুরি কিছুটা বেশি হলেও শ্রমিক পাওয়া সহজ- এটা কৃষকদের জন্যও সুবিধার। তবে শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এই হাটে আসেন। তাই ন্যায্য মজুরি পাওয়া তাদের জন্য জরুরি। নয়াবাজার হাটে অপেক্ষায় থাকা শ্রমিক জালাল আলী জানান, তার পরিবারে ৭ জন সদস্য। একমাত্র উপার্জনক্ষম হওয়ায় সকাল-সন্ধ্যা পরিশ্রম করেও সংসারের অভাব ঘোচে না। কাজ না পেলে না খেয়েই থাকতে হয়, তিনি জানান।

মহিলা শ্রমিকদের অবস্থা আরো করুণ। চার সন্তানের মা আমেনা বেগম জানান, তার স্বামী রোগে শয্যাশায়ী। একেবারেই কাজ করতে পারেন না। সংসার চালাতে এখন তিনিই দিনমজুরের কাজ করছেন। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘নারী বলেই আমাদের মজুরি কম। কিন্তু সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে তো হবে। তাই বাধ্য হয়ে হাটে আসতে হয়’।

তাড়াশের শ্রমিক রহিম উদ্দিন ও সিরাজগঞ্জের মনির হোসেন জানান, এখানে আসতে ৩৫-৪৫ টাকা খরচ হয়। যেতেও হয় একই ভাড়ায়। তবে আগের বছরের চেয়ে মজুরি এবার কিছুটা ভালো।

কৃষকদের দৃষ্টিতে শ্রমিক হাট আশীর্বাদস্বরূপ। ধারাবারিষা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মতিন বলেন, বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিক আসায় কাজের লোক পাওয়া এখন সহজ। মজুরি কিছুটা বেশি হলেও কৃষকরা কাজের লোক পাচ্ছেন। এই শ্রমিকরা না এলে দ্বিগুণ মজুরিতেও শ্রমিক পাওয়া যেতো না।

রসুন উৎপাদনে দেশের ‘মডেল এলাকা’ হিসেবে পরিচিত গুরুদাসপুরে শ্রমিক সঙ্কট দীর্ঘদিনের সমস্যা। সেই চাহিদা পূরণেই এখন প্রতিদিন মহাসড়কের পাশে বসছে শ্রমিক বেচাকেনার হাট, যেখানে জীবিকার জন্য হাজারো মানুষ অপেক্ষা করছেন একটি দিনের কাজের আশায়।