ধগাজা যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপের আলোচনায় অগ্রগতি
Printed Edition
ডেইলি সাবাহ ও আলজাজিরা
- স্থায়ী শান্তির জন্য হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান যুক্তরাষ্ট্র
- ইসরাইলি লঙ্ঘনের অবসান ও মানবিক সহায়তার নিশ্চয়তা চায় হামাস
গাজায় যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ নিয়ে চলমান আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ ছাড়া সেখানে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। গত শুক্রবার ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে রুবিও এসব কথা বলেন। এ সময় কাতার, মিসর ও তুরস্কের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের দূতদের সাথে আলোচনার জন্য মিয়ামিতে অবস্থান করছিলেন। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফও অংশ নেন।
রুবিও স্বীকার করেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি এখনো নাজুক। তবে তিনি বলেন, এর ধারাবাহিকতা বজায় থাকাই একটি বড় সাফল্য। তিনি বলেন, “বন্দীদের মুক্তির মাধ্যমে যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে- তা কোনো অলৌকিক ঘটনার চেয়ে কম নয়। প্রতিদিনই নানা পক্ষ থেকে নতুন চ্যালেঞ্জ আসছে, তবে আমরা সেগুলো মোকাবেলা করার চেষ্টা করছি।” গাজা যুদ্ধবিরতিতে কাতার ও মিসর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পাশাপাশি তুরস্কও গাজা বিষয়ে আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতায় যুক্ত রয়েছে।
আলোচনার লক্ষ্য হলো চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে অগ্রসর হওয়া। এই ধাপে গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার, হামাসের পরিবর্তে একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ গঠন এবং একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে রুবিও সতর্ক করে বলেন, হামাস যদি তার সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখে, তাহলে পুরো প্রক্রিয়া ভেঙে পড়বে। তিনি বলেন, “হামাস যদি আবার এমন অবস্থানে যায়, যেখান থেকে তারা ইসরাইলকে হুমকি দিতে বা হামলা চালাতে পারে, তাহলে সেখানে কখনোই শান্তি আসবে না।
এ কারণেই নিরস্ত্রীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” অন্যদিকে হামাস নেতৃত্ব অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে আসছে এবং সশস্ত্র প্রতিরোধকে বৈধ বলে দাবি করছে। ইসরাইলও স্পষ্ট করে জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধানে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ অপরিহার্য।
রুবিও ভবিষ্যতে গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের বিষয়েও আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, একাধিক দেশ- যেগুলো সব পক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্য ইতোমধ্যে এতে অংশ নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। তিনি পাকিস্তানের নাম উল্লেখ করেন, যা ইসরাইলকে স্বীকৃতি না দিলেও শান্তিরক্ষী ভূমিকায় অংশ নেয়ার কথা বিবেচনা করছে। পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়ার শান্তিরক্ষী পাঠানোর প্রস্তাবকেও স্বাগত জানান তিনি। তবে ইসরাইল তুরস্কের ভূমিকা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে আঙ্কারার তীব্র সমালোচনার কারণে এ আপত্তি উঠেছে।
যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। গাজার সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, একটি আশ্রয়কেন্দ্রে ইসরাইলি গোলাবর্ষণে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এতে করে অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতির পর গাজায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা প্রায় ৪০০ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ইসরাইল জানিয়েছে, গাজায় তাদের তিনজন সেনা নিহত হয়েছেন। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি বলেছেন, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ‘বাস্তব ও কার্যকর চাপ’ প্রয়োগ করতে হবে।
অন্যদিকে হামাস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলোচনায় ইসরাইলি লঙ্ঘনের অবসান এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণের বিষয়ও গুরুত্ব পেতে হবে। বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী, হামাসের হাতে আটক জীবিত ও মৃত মিলিয়ে অবশিষ্ট ৪৮ জন বন্দীকে মুক্তি দেয়ার কথা রয়েছে। এদের মধ্যে একজনের লাশ ছাড়া বাকিগুলো ইতোমধ্যে হস্তান্তর করা হয়েছে। চুক্তির তৃতীয় ধাপে গাজার ব্যাপক পুনর্গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তীব্র শীতে শিশুমৃত্যু
গাজায় শিশুদের মৃত্যু ঠেকাতে জরুরি মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দিতে ইসরাইলকে আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা মেদসাঁ সঁ ফ্রঁতিয়ের (এমএসএফ)। সংস্থাটি জানিয়েছে, অবরুদ্ধ গাজায় তীব্র শীত ও আশ্রয় সঙ্কটে বহু শিশু হাইপোথার্মিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। তারা বলছে, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের আরোপিত কঠোর সীমাবদ্ধতার কারণে খাদ্য, ওষুধ, কম্বল ও আশ্রয় সামগ্রী প্রবেশ করতে পারছে না, ফলে মানবিক বিপর্যয় আরো গভীর হচ্ছে।
জাতিসঙ্ঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাও সতর্ক করেছে যে, অবরোধ শিথিল না হলে গাজায় মানবিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত কয়েকদিনে ঠাণ্ডাজনিত কারণে একাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এমএসএফ বলছে, অবিলম্বে ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি না দিলে আরো প্রাণহানি ঘটবে।
ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চালু
গাজা সিটির ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অবশেষে সরাসরি ক্লাস চালু করেছে দীর্ঘ দুই বছরের বিরতির পর। ইসরাইলি হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর পুনরায় খুলে দেয়া হয়। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ভবনগুলোতে এখন প্রায় ৫০০ বাস্তুচ্যুত পরিবার আশ্রয় নিয়েছে, একইসাথে শিক্ষার্থীরা ধ্বংসপ্রাপ্ত শ্রেণিকক্ষে ফিরে এসে পাঠ শুরু করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলছেন, শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা তাদের জন্য প্রতীকী সংগ্রাম, যা ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও শিক্ষার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখছে। মেডিক্যাল, নার্সিং ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা আংশিকভাবে অক্ষত থাকা শ্রেণিকক্ষে পাঠ নিচ্ছেন। ইসরাইলি হামলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে পড়লেও শিক্ষার্থীরা দৃঢ় সংকল্পে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাইছে। তারা বলছে, শিক্ষা চালিয়ে যাওয়া গাজার ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য।