কবর জিয়ারতের ফজিলত
Printed Edition
হাফেজ মাওলানা আজিজুল হক
কবর জিয়ারত হলো কবরের পাশে গিয়ে মৃত ব্যক্তির রূহের মাগফেরাতের জন্য দোয়া ও কুরআন তেলাওয়াত করা। এর উদ্দেশ্য হলো পরকালের কথা স্মরণ করা এবং মৃতদের জন্য সাওয়াব পাঠানো। এর মাধ্যমে জিয়ারতকারী কবরবাসীর জন্য দোয়া করে এবং নিজেদেরও কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করে।
কবর জিয়ারতের ফজিলত : জাহেলি যুগের কবর পূজা সম্পর্কে ঘৃণা সৃষ্টির জন্য নবী সা: প্রথমে উম্মতকে কবরের কাছে যেতে নিষেধ করেছিলেন। এরপর যখন ওই সময়ের রসম-রেওয়াজ ভালোভাবে দূর হলো তখন তিনি কবর জিয়ারতের অনুমতি দিয়ে বলেছেন, ‘আমি তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। তবে এখন তোমরা কবর জিয়ারত করতে পারো। কারণ তা দুনিয়ার মোহ দূর করে এবং আখিরাতকে মনে করিয়ে দেয়। (ইবনে মাজাহ : ১৫৭১)
পরকালের স্মরণ : কবর জিয়ারত দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব এবং পরকালের জীবনের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
মৃতদের জন্য দোয়া : জীবিতদের পক্ষ হতে মৃতদের জন্য দোয়া, ক্ষমা ও ইসালে সাওয়াব পাঠানো একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল।
সদ্ব্যবহারের প্রতিদান : রাসূল সা: ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতি জুমায় তার মা-বাবা বা তাদের একজনের কবর জিয়ারত করবে, তাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে এবং মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহারকারীদের মধ্যে গণ্য করা হবে।’ (আল মু’জামুল আওসাত : ৬১১৪)
রাসূল সা:-এর সুন্নাত : রাসূলুল্লাহ সা: নিজেও কবর জিয়ারত করতেন এবং সাহাবিদের এটি করতে উৎসাহিত করতেন।
কবর জিয়ারতের সময় কোনো বিশেষ দিনে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। যেকোনো দিন যেকোনো সময়ে যাওয়া যায়। কবরস্থানে গিয়ে প্রথমে জিয়ারতের দোয়া পড়া উচিত।
কবর জিয়ারতের সময় : কবর জিয়ারতের নির্দিষ্ট কোনো সময় অথবা কোনো বিশেষ দিনে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। যেকোনো দিন যেকোনো সময়ে যাওয়া যায়। তবে শুক্রবারে যাওয়াই উত্তম। প্রতি শুক্রবার না পারলে বৃহস্পতিবার, শনিবার বা সোমবারে জিয়ারত করা মোস্তাহাব। (রদ্দুল মুহতার ২/২৪২)
কবর জিয়ারতের পদ্ধতি : কবরস্থানে প্রবেশ করে মৃতদের প্রতি সালাম ও দোয়া জানানো সুন্নাহ। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এই দোয়াটি পড়া : ‘আসসালামু আলাইকুম দারা কাওমিম মুমিনিনা ওয়া ইন্না ইনশাআল্লাহু বিকুম লাহিকুন’। এরপর ইস্তেগফার, দরুদ শরিফ, সূরা ফাতিহা, সূরা ইখলাস এবং আয়াতুল কুরসিসহ অন্যান্য দোয়া পড়ে ঈসালে সাওয়াব করা। মৃত ব্যক্তির রূহের মাগফেরাত বা ক্ষমার জন্য মুনাজাত করা। কবরস্থানে মুনাজাত কবরের দিকে পিঠ দিয়ে কিবলামুখী হয়ে করা চাই। (ফতোওয়ায়ে আলমগিরি খ. ৫ পৃ. ৩৫০)
যেসব বর্জন করা উচিত :
কবরকে সিজদা করা (যা স্পষ্ট শিরক)।
কবরকে তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করা
কবরে মোমবাতি বা আগরবাতি জ্বালানো।
কবরের ওপর কোনো পাকা বা জাঁকজমকপূর্ণ কাঠামো তৈরি করা।
কবরের ওপর বসা বা হেলান দেয়া অনুচিত।
কবরের পাশে পশু জবাই করা ইসলামে নিষিদ্ধ, কারণ এটি জাহেলি যুগের একটি প্রথা।
অতিরিক্ত আবেগ ও বিলাপ করা। যদিও মনে কষ্ট আসতে পারে, তবে অতিরিক্ত বিলাপ, হায়-হুতাশ করা বা কান্নাকাটি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
জোরে শব্দ করা। জোরে কথা বলা, গান বাজানো বা অন্য কোনো উচ্চ শব্দ করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
কবরের ওপর জুতা পরে হাঁটাচলা করা।
কবরকে তীর্থস্থানে পরিণত করা। অর্থাৎ কবরকে এমনভাবে তৈরি করা যাবে না যাতে এটি একটি তীর্থস্থানে পরিণত হয় এবং সেখানে ভুলভাবে সম্মান করা হয়।
কবরে ফুল বা চাদর দেয়াও বেদআত বলে গণ্য করা হয়।
ইবাদত মনে করে স্মৃতিস্তম্ভ বা সমাধিফলক স্পর্শ করা।
কবরস্থানের ভেতরে ধূমপান করা।
যা করণীয় : মৃতদের জন্য দোয়া ও তাদের শান্তি কামনা করা।
কুরআন তেলাওয়াত, ইস্তেগফার করা এবং দরুদ শরিফ পড়া।
কবরস্থানে নীরবতা বজায় রাখা এবং শ্রদ্ধাশীল আচরণ করা উচিত, যা অন্তরে বিনয় ও পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
লেখক : কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক