সরকারের নির্দেশনা মানছে না ভোজ্যতেল সিন্ডিকেট
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও বছরের শেষে ফের সক্রিয় ‘অঘোষিত মূল্য সিন্ডিকেট’
Printed Edition
শাহ আলম নূর
দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের দাম নিয়ে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পাম অয়েলের দাম ধারাবাহিকভাবে কমলেও দেশের বাজারে তার প্রভাব পড়ছে না। খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে এখনো উচ্চমূল্য বহাল রাখায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তা। ব্যবসায়ীদের একাংশের ‘অতিরিক্ত প্রভাব ও অযৌক্তিক কৌশলকে দায়ী করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের নির্দেশনা কার্যকর না হওয়ায় এক ধরনের অঘোষিত মূল্য সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
অন্য দিকে সরকারি অনুমোদন ছাড়াই ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সরকারকে পাশ কাটিয়ে দাম বাড়ানোর এই প্রচেষ্টা চলছে কয়েক মাস ধরেই। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দীন জানান, সরকারকে না জানিয়ে দাম বাড়ানো হয়েছে, যা আইনসম্মত নয়। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেবে।
গতকাল ঢাকার কাওরানবাজার, রামপুরা, বাড্ডা, সেগুনবাগিচাসহ কয়েকটি এলাকার খুচরা দোকান এবং কয়েকটি সুপারশপ ঘুরে দেখা গেছে, ব্যবসায়ীরা এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৮৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯৮ টাকা করেছেন। অর্থাৎ, প্রতি লিটারে দাম বাড়ানো হয়েছে ৯ টাকা। একইভাবে পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৪৩ টাকা বাড়িয়ে ৯২২ টাকা থেকে ৯৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে খুচরা বাজারে মুদি দোকানগুলোতে এখনো নতুন দামের তেলের সরবরাহ খুব বেশি নেই। বেশির ভাগ দোকানেই এখনো আগের দামের তেল বিক্রি হচ্ছে। কাওরানবাজারে এক মুদি দোকানে পাঁচ লিটারের রূপচাঁদার তেল ৯৬৫ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। এসব বোতলের গায়ে উৎপাদনের তারিখ দেয়া হয়েছে গত নভেম্বর মাসের ২৮ তারিখ।
অনলাইন সুপারশপগুলোতেও একই দামে রূপচাঁদা ও পুষ্টি ব্র্যান্ডের তেল বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে, তীর এবং রূপচাঁদার এক লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল ১৯৮ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। যদিও একটি কোম্পানির তেল এখনো ১৮৯ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া, রূপচাঁদার দুই লিটারের বোতল ১৮ টাকা বাড়িয়ে ৩৭৮ টাকা থেকে ৩৯৬ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ভোজ্যতেল ব্যবসার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে কয়েকটি কোম্পানি। দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে যেভাবে দ্রুত সাড়া দেয়া হয়, দাম কমানোর ক্ষেত্রে ততটা আগ্রহ দেখা যায় না। আমদানিকারক ও রিফাইনারি কোম্পানিগুলোর মধ্যে অনানুষ্ঠানিক সমন্বয়, মজুদ বাড়িয়ে রাখা এবং সরবরাহ কমানোর মতো অভিযোগও দীর্ঘ দিনের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন আমদানিকারক নয়া দিগন্তকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও রিফাইনারিগুলো পুরনো উচ্চমূল্যের কাঁচামাল ব্যবহার করছে এমন অজুহাতে দাম কমাতে চায় না। আবার নতুন চালান কম দামে এলেও তারা বাজারে দাম ধরে রাখতেই আগ্রহী।
এ দিকে মূল্য নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নিয়মিত বৈঠক করলেও মাঠপর্যায়ে তদারকি কমে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে স্বস্তি আনতে হলে রিফাইনারিগুলোকে মূল্য সমন্বয়ে বাধ্য করা জরুরি, কিন্তু বড় কোম্পানিগুলোর চাপের মুখে অনেক সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় না। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, মূল্য সমন্বয়ের চিঠি পাঠানো হলেও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো নানা অজুহাত দেখায়, ফলে বাজার মনিটরিং বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই।
মূল্যস্ফীতির চাপে নিত্যপণ্যের ব্যয় বেড়েছে। তার ওপর ভোজ্যতেলের দাম কমছে না বলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে মাসে ৩০০-৫০০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপণ্যের বাজার দীর্ঘ দিন ধরেই অল্পসংখ্যক কোম্পানির হাতে নিয়ন্ত্রিত। তারা নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে বাজারকে একচেটিয়া করে তুলেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তাও স্বীকার করেছেন ‘মূল্য নির্ধারণে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট একটি বাস্তবতা।’
১০ নভেম্বর বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন তেলের মূল্য পুনর্নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনকে একটি চিঠি দেয়। যেখানে এক লিটারের বোতল ১৯৯ টাকা, পাঁচ লিটারের বোতল ৯৮৫ টাকা, খোলা সয়াবিনের লিটার ১৭৯ টাকা এবং পাম অয়েলের দাম ১৬৯ টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়। এই দাম তারা গত মাসের ২৪ তারিখ থেকে বাড়ানোর কথা জানায়।
তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, সরকার ব্যবসায়ীদের তেলের দাম বাড়ানোর অবেদনের অনুমোদন দেয়নি। সরকারের অনুমোদন ছাড়া ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াতে পারেন না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভোজ্যতেলের দাম কমানোর নির্দেশনা অমান্য করা হলে রিফাইনারি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ইতোমধ্যে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরকে বাজার মনিটরিং বাড়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
গত দুই বছরে অন্তত পাঁচবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশে তা বাস্তবায়ন হয়নি, যা সিন্ডিকেটের প্রভাবকে স্পষ্ট করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের দাম দ্রুত কমবে এমন আশাবাদ দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, আমদানিকারকদের ওপর সরকারের কঠোর নজরদারি, মূল্য সমন্বয়ের সময়সীমা নির্ধারণ এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব বলে তারা মনে করেন।