মোগল আভিজাত্য থেকে জনপদের স্বাদ
জিনজিরার ইফতার ঐতিহ্য
Printed Edition
হাবিবুল বাশার
পুরান ঢাকার ঠিক উল্টো দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে অবস্থিত কেরানীগঞ্জের জিনজিরা। কেবল ক্ষুদ্র শিল্পের জন্যই নয়, বরং গত কয়েক শতাব্দী ধরে এই জনপদ তার নিজস্ব ইফতার সংস্কৃতির আভিজাত্য ধরে রেখেছে। এই রমজানেও জিনজিরার ইফতার বাজার যেন এক জীবন্ত ইতিহাস। মোগল আমলের রাজকীয় রন্ধনশৈলী আর আধুনিক যুগের দ্রুতগতির খাবারের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে এই ঐতিহাসিক জনপদে।
মোগল থেকে বর্তমানের সেতুবন্ধ : জিনজিরার ইফতারির এই গৌরবময় যাত্রা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এর মূলে রয়েছে মোগল আভিজাত্যের পরশ। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন তার ‘ঢাকা : স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, বুড়িগঙ্গার ওপারে অবস্থিত জিনজিরা প্রাসাদ বা ‘নওশারা’ ছিল মোগলদের আমোদ-প্রমোদের কেন্দ্র। ১৭৫৪ সালে নবাব আলীবর্দী খাঁর পরিবারকে এখানে রাখা হলে রাজকীয় বাবুর্চিদের হাত ধরে বিশেষ মোগলাই খাবারগুলো এই জনপদে প্রবেশ করে। সে সময়ের প্রধান বিশেষত্ব ছিল দমে রান্না করা গোশত এবং জাফরানি সুগন্ধযুক্ত পানীয়।
পরবর্তীকালে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে এই ঐতিহ্য বাণিজ্যিক রূপ নিতে শুরু করে। গবেষক ও সাংবাদিক নাজির হোসেন তার ‘কিংবদন্তির ঢাকা’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, ১৯৪০ ও ৫০-এর দশকে চকবাজারের অনেক দক্ষ কারিগর নদী পার হয়ে জিনজিরায় স্থায়ীভাবে দোকান দিতে শুরু করেন। এভাবেই ধীরে ধীরে জিনজিরা ফেরিঘাট ও বাস রোডসংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠে ঢাকার অন্যতম বৃহত্তম ইফতার বাজার।
বর্তমান মেনু ও বাজারদর : ঐতিহ্যের সাথে সাশ্রয়ী স্বাদ
জিনজিরার ইফতারি এখনো তার সাশ্রয়ী বৈশিষ্ট্যের জন্য অনন্য। আধুনিক যুগের চাহিদাকে মাথায় রেখে বর্তমান মেনু ও দামের চিত্র।
কাবাব ও গোশতের সমাহার : মুরগির কাবাব (১০০ টাকা), খাসির খাস কাবাব (১৩০ টাকা), কাঠি কাবাব (১০০ টাকা) এবং জালি কাবাব (৩০ টাকা)।
ভাজাপোড়া ও চটজলদি খাবার : মুরগি, কিমা ও পনির সমুচা প্রতিটি মাত্র ১০ টাকা। আলুচপ, বেগুনি ও পিয়াজু প্রতিটি মাত্র ৬ টাকা।
সিঙ্গারা ও টিকা : কলিজা সিঙ্গারা ২০ টাকা, সাধারণ সিঙ্গারা ১০ টাকা এবং টিকা কাবাব ১৫ টাকা।
মিষ্টি ও পানীয় : স্পেশাল রেশমি জিলাপি ২৮০ টাকা (কেজি), সাধারণ গোটা জিলাপি ২০০ টাকা (কেজি) এবং ফালুদা ১১০ টাকা।
প্রজন্মের ধারাবাহিকতায় জিনজিরার ইফতারি
জিনজিরার ইফতারি কেবল কেনাবেচার মাধ্যম নয়, বরং এটি স্থানীয়দের পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। বাজার করতে আসা এক স্থানীয় ক্রেতা আবেগের সাথে বলেন, ‘আমার বাবা এবং দাদাও এই বাজার থেকেই ইফতার নিতেন। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আমরাও প্রতি রমজানে বাড়িতে ইফতার বানানোর পাশাপাশি নিয়মিত এই বাজার থেকে ইফতার কিনে থাকি। এটি আমাদের কাছে ইফতারের চেয়েও বেশি কিছু।’
দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসা কাবাব ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরও একই সুর মিলালেন। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকেই আমরা ব্যবসা করে আসছি। একসময় এখানে হাতেগোনা কয়েকটি দোকান ছিল, এখন কয়েক শত দোকান। বর্তমানে বেচাকেনা আগের চেয়ে কিছুটা কম হলেও আমরা মূলত পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখতেই এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি।’
আধুনিক বিবর্তন ও বাজার পরিস্থিতি
সময়ের সাথে সাথে জিনজিরার ইফতার মেনুতে এসেছে চোখে পড়ার মতো বিবর্তন। পূর্বে যেখানে ইফতারের কেন্দ্রবিন্দু ছিল কেবল ‘দম পোখত’ গোশত, বর্তমানে সেখানে মোগল ঐতিহ্যের ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ থেকে শুরু করে ‘মাঠার দেশ’ হিসেবে পরিচিত জিনজিরার স্পেশাল মাঠা ও ঘোল সবই এখন এই এলাকার ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মজার ব্যাপার হলো- বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতেও জিনজিরার ইফতারি ঢাকার মূল অংশের তুলনায় গড়ে ১০-১৫% সাশ্রয়ী। ফলে কেবল কেরানীগঞ্জ নয়, ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আজও ট্রলারে নদী পার হয়ে ছুটে আসে জিনজিরার এই শাহী ও মুখরোচক স্বাদের টানে। বুড়িগঙ্গার তীরের এই জনপদ প্রমাণ করে দেয় যুগ বদলালেও ঐতিহ্যের স্বাদ কখনো ফিকে হয় না।