সারা দেশে হাম ও উপসর্গে ১১ শিশুর মৃত্যু

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

সারা দেশে হাম উপসর্গে ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে ২৪ ঘণ্টায়। এই ১১ শিশুর কাউকেই স্বাস্থ্য অধিদফতর ঠিক হাম রোগেই মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেনি। অন্য দিকে সারা দেশে শুক্রবার সকাল ৮টার পর থেকে গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত এক হাজার ৫৮ শিশুকে হামের উপসর্গে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানানো হয়, গত ১৫ মার্চ থেকে ৪২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামে। অন্য দিকে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ২০৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকাল পর্যন্ত এর আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে সবচেয়ে বেশি পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। এ ছাড়া ঢাকা বিভাগে তিন শিশু, সিলেট বিভাগে দুই শিশু এবং রাজশাহী বিভাগে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, চলতি বছরে ১৫ মার্চ থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৩০ হাজার ৬০৭ শিশুর দেহে। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২০ হাজার ৪৭৫ শিশু এবং এদের মধ্য থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৭ হাজার ৮১ শিশু।

উল্লেখ্য, হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এ রোগের কোনো ওষুধ নেই। শুধু হামের টিকা নিয়ে শিশুকে হাম হওয়া থেকে মুক্ত রাখা যায়। হামের প্রথম টিকাটি দিতে হয় জন্মের ৯ মাসে এবং এরপর ১৫ মাস বয়সে। এ ছাড়া সরকার থেকে হামের টিকার বিশেষ ক্যাম্পেইন হলে সেই টিকাটিও নিতে হবে। সাধারণত অপুষ্টির শিকার শিশুরা বেশি করে হামে আক্রান্ত করতে পারে। শিশুকে পর্যাপ্ত ভিটামিন ‘এ’ দেয়া হলে শিশুর মধ্যে পুষ্টির অভাব অনেকটাই মেটে এবং এ ধরনের শিশুরা হাম প্রতিরোধ করতে পারে। সাধারণ গর্ভাবস্থায় মায়ের নেয়া টিকার কারণে শিশুরা ৯ মাস বয়স পর্যন্ত হাম প্রতিরোধ করতে পারে; কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, শিশুর জন্মের ছয় মাসেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে, এটা হয় অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের মধ্যে বেশি।

সিলেট ব্যুরো জানায়, সিলেটে ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সাথে এই সময়ে নতুন করে আরো ২৩ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ নিয়ে চলতি বছরে হাম ও উপসর্গে সিলেট বিভাগে মোট আট শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হাম রোগে মৃত্যুর সংখ্যা একজন। অন্যরা হাম উপসর্গে মারা যায়।

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদফতরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা: নুরে আলম শামীম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া তিন শিশুর মধ্যে সিলেট নগরীর জালালাবাদ এলাকার ৯ মাসের হুমায়রা শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। এ ছাড়া সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ১০ মাসের আরিফ ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গাগটিয়া গ্রামের পাঁচ মাসের তউফিক ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মোট ৮০ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ ল্যাব থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে হবিগঞ্জে সাতজন (দু’জন রুবেলা), মৌলভীবাজারে ১৫ জন, সুনামগঞ্জে ৩২ জন এবং সিলেটে ২৬ জন রয়েছে।

এ দিকে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে সিলেট বিভাগে হাম উপসর্গে আরো ২৮ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২০ জন ভর্তি হয়েছে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে। এ ছাড়া ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দু’জন, মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে পাঁচজন এবং শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন ভর্তি হয়েছে।

বর্তমানে বিভাগজুড়ে মোট ১৬৯ জন সন্দেহজনক রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৯০ জন, ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৯ জন, মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ২২ জন এবং সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ১৩ জন রয়েছে। অন্যরা বিভিন্ন উপজেলা ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।

ময়মনসিংহ অফিস জানায়, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে হামের প্রাদুর্ভাবে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এ পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরো ৩৩ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ফলে বর্তমানে আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯০ জনে।

শনিবার মমেক হাসপাতালের হাম মেডিক্যাল টিমের ফোকাল পারসন সহযোগী অধ্যাপক ডা: মোহা: গোলাম মাওলা এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, গত ১৭ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত মোট ৮২৮ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে শুক্রবার সকাল থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে আরো ২০ শিশু হাসপাতাল ছাড়ে। এ পর্যন্ত মোট ৭২২ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা: মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, ফেব্রুয়ারি থেকে অল্পসংখ্যক রোগী ভর্তি হলেও ১৭ মার্চের পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে এবং রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ২৪ মার্চ থেকে হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায় ৬৪ শয্যার হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়। বর্তমানে তিনটি মেডিক্যাল টিম গঠন করে আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) সংবাদদাতা জানান, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে হাম-রুবেলায় আরিশা নামে ১০ মাসের এক কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সে গোয়ালন্দ পৌরসভার ১নং ওয়ার্ড বক্স ফকির পাড়ার মো: বকস ফকিরের ছেলে উজ্জ্বল ফকিরের মেয়ে। শুক্রবার দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। পরে গ্রামের বাড়িতে আনার পর রাতে হাউলি কেউটিল ঈদগাহ ময়দানে নামাজে জানাজা শেষে স্থানীয় কবর স্থানে দাফন করা হয়। নামাজে জানাজা শেষে বাবা উজ্জ্বল ফকির এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, তার মেয়ে প্রায় এক মাস আগে এ রোগে আক্রান্ত হলে প্রথমে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এরপর ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ওই হাসপাতালে অবস্থা আরো খারাপ হলে তাকে ঢামেক হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে প্রায় দুই সপ্তাহ চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নামাজে জানাজায় উপস্থিত গোয়ালন্দ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর নিজাম উদ্দিন বলেন, হাম-রুবেলায় গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে তেমন কোনো চিকিৎসা না থাকায় এ রোগে আক্রান্ত শিশুদের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। এতে করে এসব হাসপাতালে এই উপজেলার কতগুলো শিশু মারা গেছে তার সঠিক তথ্য হয়ত আমরা জানি না।

এ বিষয়ে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মারুফ হাসান বলেন, সারা দেশে হাম-রুবেলা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর এই প্রথম গোয়ালন্দে কোনো শিশু মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেল। এর আগে গোয়ালন্দে এ রোগে আক্রান্ত কোন শিশুর মৃত্যু হয়েছে কি না আমার জানা নেই।