মিয়ানমারের বিদ্রোহী নেতার আক্ষেপ
জান্তার প্রাণঘাতী বিমান হামলা উপেক্ষা করছে বিশ্ব
Printed Edition
রয়টার্স
বেসামরিকদের ওপর ক্ষমতাসীন জান্তার প্রাণঘাতী বিমান হামলার তীব্রতা বাড়ছে, অথচ বিশ্বনেতারা তা উপেক্ষা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন মিয়ানমারের প্রভাবশালী একটি জাতিগত বাহিনীর প্রধান। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশটিতে চলা সঙ্ঘাতে একমাত্র চীনই হস্তক্ষেপ করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। অনেক বছর পর গণমাধ্যমের সাথে এই সশস্ত্র নেতার প্রথম সাক্ষাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে কেবল রয়টার্সই উপস্থিত ছিল। ক্ষমতায় সামরিক বাহিনীর প্রভাবকে পাকাপোক্ত করা জান্তার নির্বাচনের কয়েকদিন পর এ সাক্ষাৎ হল।
‘বেসামরিকরা ভয়ানক দুর্ভোগে আছে, আমি চাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এটা এড়িয়ে না যাক,’ পাহাড়চূড়ায় নিজের ঘাঁটিতে বসে বলেছেন রিস্টোরেশন কাউন্সিল অব শান স্টেটের (আরসিএসএস) প্রধান জেনারেল ইয়াও সের্ক। জান্তা ১৫ মাসে হাজারের বেশি বেসামরিক এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে মিয়ানমার পিস মনিটর। এই তথ্যকে উদ্ধৃত করে সের্ক বলেন, দেশজুড়ে সামরিক বাহিনীর বোমা হামলার তীব্রতা বাড়ায় সৃষ্ট পরিস্থিতি থামাতে ব্যর্থ হয়েছে বিশ্ব।
‘আজকের দিনে, কার ওপর যে ভরসা করব সেটাই তো বুঝে উঠতে পারছি না আমরা,’ বলেছেন জেনারেল সের্ক। তার দলের হাতে আছে চীন ও থাইল্যান্ডের মধ্যে থাকা কৌশলগত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ। তাদের সদরদফতর লোই তাই লেং-এ, এটি থাই সীমান্তে বনজঙ্গলে আচ্ছাদিত পাহাড়ঘেরা এক প্রত্যন্ত এলাকা। ২০২১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন সরকার সামরিক বাহিনীর হাতে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই মিয়ানমারজুড়ে সঙ্ঘাত অব্যাহত আছে। সু চি নেতৃত্বাধীন ওই সরকারই ছিল অর্ধশতাব্দীর মধ্যে দেশটির প্রথম গণতান্ত্রিক প্রশাসন।
২০২৪ সালের পর থেকে বিমান হামলায় দেশটিতে অন্তত এক হাজার ৭২৮ বেসামরিকের মৃত্যু হয়েছে, যা একইসাথে বিমানবাহিনী না থাকা গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলোর অগ্রগতিও অনেকটাই থামিয়ে দিয়েছে। মিয়ানমারের জান্তা অবশ্য বেসামরিকদের ওপর হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তারা বলছে, তাদের হামলার নিশানা হচ্ছে কেবলই ‘সন্ত্রাসীরা’। শান ন্যাশনাল ডে-র কুচকাওয়াজের পর দেয়া বক্তব্যে ইয়াও সের্ক মিয়ানমারে ক্রিয়াশীল অসংখ্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান। যুদ্ধ থামাতে সামরিক বাহিনীর সাথে রাজনৈতিক সংলাপও লাগবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এসব প্রসঙ্গে মন্তব্য চেয়ে রয়টার্স জান্তার এক মুখপাত্রের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাৎক্ষণিকভাবে তিনি ফোন ধরেননি।
সমগ্র মিয়ানমারে না হলেও জানুয়ারিতে জান্তার উদ্যোগে যে ভোট হয়েছে তাতে সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট এক দল নিজেদের বিজয়ী দাবি করছে। ক্ষমতায় সামরিক বাহিনীর অবস্থানকে পাকাপোক্ত করা ও জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইংকে প্রেসিডেন্ট বানানোর লক্ষ্যে সাজানো বলে ওই নির্বাচনের ব্যাপক সমালোচনা করেছে জাতিসঙ্ঘ ও মিয়ানমারের মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো।
বন্দুক ও রকেটচালিত গ্রেনেড লঞ্চার নিয়ে হাজারখানেক সেনার কুচকাওয়াজ দেখতে সীমান্তঘেঁষা সদরদফতরে জড়ো হওয়া হাজার হাজার মানুষের উদ্দেশে দেয়া ঝাঁজালো বক্তৃতায় ইয়াও সের্ক ক্ষমতাচ্যুত সু চি সরকারের প্রশংসা এবং মিন অং হ্লাইংয়ের কঠোর সমালোচনা করেছেন। জান্তার সাথে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা আরসিএসএসের এ নেতাকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাকাঠামোতে অত্যন্ত ঝানু খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি মিয়ানমারের এখনকার দুরাবস্থার জন্য ‘অতিরিক্ত অহঙ্কার, গর্ব ও লোভ দ্বারা পরিচালিত নেতৃত্ব, যারা ব্যক্তির ইচ্ছাকে জনগণের চাহিদার ওপর স্থান দেয়’ তাদেরকে দোষারোপ করেন। এর আগে এক বিবৃতিতে মিন অং হ্লাইং বিভিন্ন জাতিগত ও ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠীগুলোকে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিত্যাগ করে শান্তি আলোচনায় যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ওই আহ্বানকে ‘পুরনো বার্তা’ বলে উড়িয়ে দিয়ে ইয়াও সের্ক বলেছেন, ‘কেউ এটা গ্রহণ করেনি।’
নতুন সরকারকে তার কার্যক্রম দিয়ে বিবেচনা করবেন বলেও জানান তিনি। বলেছেন, নতুন করে যুদ্ধ শুরুর চেয়ে রাজনৈতিক সমাধানকেই তিনি প্রাধান্য দেবেন। এশিয়ার গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল খ্যাত এলাকায় বৈধ-অবৈধ সব ব্যবসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাব শান রাজ্যে অনেকগুলো সশস্ত্র গোষ্ঠী ক্রিয়াশীল, তাদের মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব যেমন আছে, তেমনি প্রতিনিয়ত তাদের শত্রু-মিত্রও বদলাচ্ছে।
সামরিক অভ্যুত্থান সেখানকার ক্ষমতার ভারসাম্যেও ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে, শান নয় এমন গোষ্ঠীগুলোও অনেক অঞ্চল দখলে নিয়ে নিয়েছে। চীনই এখানে মূল ক্রীড়নক, তারা বেশ কিছু গোষ্ঠীকে সমর্থনও দেয়। জান্তাকে স্থিতিশীল হওয়ার সুযোগ করে দিতে তারা অনেক সশস্ত্রগোষ্ঠীকে হামলা বন্ধে চাপও দিয়েছে। বেইজিং এখন জান্তাকেই তার বেল্ট অ্যান্ড রোড অবকাঠামো প্রকল্পের নিরাপত্তার নিশ্চয়তাদাতা বিবেচনা করছে।
এদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন গোষ্ঠী আরসিএসএসকে চীন সীমান্তসংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো থেকে বিতাড়িত করেছে। এর ফলে একটা ‘বহুধাবিভক্ত পরিস্থিতির’ সৃষ্টি হয়েছে, যা মিয়ানমারের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজ্যে অস্থিতিশীলতা ও অসন্তোষ আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে নভেম্বরে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ। ‘একটা দেশই মিয়ানমারে হস্তক্ষেপ করে, সেটা চীন এবং তারাই,’ রয়টার্সকে এমনটাই বলেছেন ইয়াও সের্ক। তবে এ নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে তিনি রাজি হননি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘চীন দীর্ঘ দিন ধরে অভ্যন্তরীণ শান্তি ও পুনর্মিলন প্রক্রিয়ায় গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে মিয়ানমারের সব পক্ষ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি অর্জন করেছে।’
বেইজিং সংলাপ ও পুনর্মিলন প্রক্রিয়াকে জোরদারে কাজ করা দলগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে, বলেছে তারা। আরসিএসএসের শনিবারের আয়োজনে দীর্ঘ দিন সশস্ত্র গোষ্ঠীটির বিরোধিতাকারী অনেক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ইয়াও সের্ক বলেছেন, তার লক্ষ্য হচ্ছে আস্থা গড়ে তোলা, আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা এবং একটি ফেডারেল সেনাবাহিনী গঠনে কাজ করা। এই ফেডারেল সেনাবাহিনী গড়ে তোলাই জান্তাবিরোধীদের অন্যতম মূল দাবি।
শানদের বিভিন্ন গোষ্ঠী একত্রিত হয়ে ভবিষ্যৎ ফেডারেল রাজ্যের মূলনীতিগুলো নিয়ে একমত হয়েছে, বলেছেন তিনি। জান্তাবিরোধী অন্যতম প্রভাবশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়নের মুখপাত্র সাও তাও নি ওই আয়োজনে উপস্থিত না থাকলেও চিঠি পাঠিয়েছেন। তাতে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের ঐক্য গড়ার গুরুত্বপূর্ণ সময় এটি।’ ‘আমাদের শান ভাইরা যে ওই পথ তৈরির চেষ্টা করছেন, তাতে আমরা গর্বিত,’ শানদের সাথে ‘হাতে হাত রেখে’ কাজ করার আশ্বাস দিয়ে টেলিফোনে এমনটাই বলেছেন নি।