মিরপুরে ১৫ জনকে হত্যার নির্দেশদাতা সালমান ও আনিসুল

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
  • মানবতাবিরোধী অপরাধ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক মন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে মিরপুর এলাকায় মোট ১৫ জনকে হত্যার নির্দেশদাতা এবং অসংখ্য লোককে গুরুতর জখম করে নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনকে উসকে দেয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, আন্দোলন দমনের অংশ হিসেবে কারফিউ জারি করে আন্দোলনকারীদের ‘শেষ করে দেয়ার’ পরামর্শদানসহ বিভিন্ন নির্দেশনায় তাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকার প্রমাণ রয়েছে।

নির্ধারিত দিনে অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠনের বিষয়ে গতকাল রোববার ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেলে এ বিষয়ে শুনানি ও আদেশ দেবেন বলে জানানো হয়।

ট্রাইব্যুনালের অন্য সদস্যরা হলেন, বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ দু’জনের বিরুদ্ধে গত বছরের জুলাই-আগস্ট মাসজুড়ে সারা দেশে সঙ্ঘটিত হত্যাকাণ্ডে উসকানি, সহযোগিতা ও পরিকল্পনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে রোববার শুনানি ও আদেশের জন্য রয়েছে। রোববার সকালে কারাগার থেকে পুলিশের প্রিজনভ্যানে তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। টিকে থাকার মরিয়া প্রয়াস হিসেবে মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি ঠেকানোর জন্য। আসামিরা

উসকানি/ প্ররোচনা/ সহায়তা/ সম্পৃক্ততায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী সশস্ত্র ক্যাডাররা ল্যাথান উইপন ব্যবহার করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ডিএমপির মিরপুর ২ নম্বর, ১০ নম্বর গোলচত্বরে, ১৩ নম্বর জুটপট্টিসহ আশপাশ এলাকায় আল আমিন, মাহফুজ আলম, সুজন মাহমুদ, আশরাফুল, মমিন ইসলাম, তোফাজ্জল হোসেন, মেহেরুন্নেছা, মতিউর রহমান, রনি, শাহদাত হোসেন, রুবেল তাহমিদ, ফজলু, মামুন মিয়া, মো: আনোয়ার হোসেনকে (মোট ১৫ জন) জনকে হত্যা করে এবং অসংখ্য লোককে গুরুতর জখম করে নির্যাতন চালায়।

আসামিরা হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন বন্ধে কোনোরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি বা হত্যা ও নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে কোনো শান্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি বরং উক্তরূপ কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থেকেছেন। ফলে দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্ট, ১৯৭৩ এর ৩ (২) (এ), (জি), (এইচ), ৪ (১), ৪ (২) এবং ৪ (৩) ধারায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছেন মর্মে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। যা একই আইনের ২০ (২), ২০-এ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

যেহেতু ২০২৪ এর জুলাই বিপ্লব চলাকালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি আসামি শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, আসামি সালমান এফ রহমান এবং আনিসুল হক তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ ও আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ তাদের অঙ্গসংগঠন ও ১৪ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দ এবং তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যক্তিগতভাবে ও দলগতভাবে দেশব্যাপী নিরস্ত্র মানুষের ওপর আক্রমণের মাধ্যমে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ সঙ্ঘটন করে তা দেশী-বিদেশী পত্র-পত্রিকা ও গণমাধ্যমসহ ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে এবং হচ্ছে যা বাংলাদেশের জনগণসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সর্বজনবিদিত।

তদুপরি ওই অপরাধগুলো জাতিসঙ্ঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক অনুসন্ধানে প্রমাণিত। উপরোক্ত অপরাধগুলো কমন নলেজ জুডিশিয়াল নোটিশ হিসেবে গ্রহণ করার এখতিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্ট, ১৯৭৩ এর ১৯ (৩) ধারার অধীনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, যেহেতু আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ তাদের অঙ্গসংগঠন ও ১৪ দলীয় জোট দলীয় ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিরীহ, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপরে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছে, যা তাদেরকে (ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন) অপরাধী সংগঠন হিসেবে গণ্য করার শামিল।

যেহেতু তদন্ত প্রতিবেদন, দালিলিক ও মৌখিক সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনায় আসামিদের বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লব চলাকালে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই থেকে শুরু হয়ে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ যা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনাল্্স) অ্যাক্ট, ১৯৭৩ এর ৩(২) (এ), (জি), (এইচ), ৪ (১) আসামি আনিসুল হকের প্ররোচনায় ২০২৪ সালের জুলাই আগস্টে সংঘটিত বৈষম্যবিরোধী ও একদফা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে করা ২৮৬টি মামলায় চার লাখের বেশি আসামি করা হয়েছে। আর আসামি সালমান এফ রহমান গণভবনে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সাথে বৈঠকে বলছে জীবন দিয়ে হলেও শেখ হাসিনাকে রক্ষা করবে। শেখ রেহানার সাথে ফোনে কথোপকথনের রেকর্ড রয়েছে।

২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট পুলিশ সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হককে আটক করে। পরে বিভিন্ন মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়। মামলার নথিপত্র আদালতে উপস্থাপনের পর পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানা গেছে।

ইনুর মামলায় তৃতীয় দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ

জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে কুষ্টিয়ায় ছয় হত্যাসহ আট অভিযোগের দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে তৃতীয় দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে।

গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ সাক্ষ্যগ্রহণ হয়। এ দিন ইনুর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো: কামরুল হোসেন। তিনি বর্তমানের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেকর্ড শাখায় কর্মরত আছেন।

এর আগে গত ২ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দিনের জেরা শেষ হয়। ওই দিন দুই নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেয়া বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহাকে জেরা করেন ইনুর আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী। এর আগের দিন ১ ডিসেম্বর সাক্ষ্য দেন তিনি।

এ মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে একই দিন জবানবন্দী দিয়েছেন মো: রাইসুল হক। তার বাড়ি মেহেরপুরে হলেও জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় কুষ্টিয়া শহরের একটি মেসে থাকতেন। ছাত্র-জনতার ওপর হামলার প্রত্যক্ষ নির্দেশদাতা ও উসকানিদাতা হাসানুল হক ইনু ছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তার কপালেও গুলি লেগেছিল। কিন্তু ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরেছেন। এ ছাড়া ছয়জন শহীদ হয়েছিলেন। এসবের জন্য ট্রাইব্যুনালের কাছে ইনুর সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছেন এই সাক্ষী।

এর আগে ৩০ নভেম্বর মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। একই দিন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিরুদ্ধে ইনুর করা রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানি হয়। তার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সিফাত মাহমুদ ও মনসুরুল হক। প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তি পেশ করেন চিফ প্রসিকিউটর। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে ইনুর আবেদনটি খারিজ করে দেন ট্রাইব্যুনাল। গত ২ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেয়া হয়।

ওই দিন আটটি অভিযোগই ইনুকে পড়ে শোনান বিচারক। একপর্যায়ে নিজেকে পুরোপুরি নির্দোষ দাবি করেন এই জাসদ সভাপতি। ২৮ অক্টোবর তার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনসুরুল হক। শুনানিতে কোনো অভিযোগ সত্য নয় জানিয়ে নিজের ক্লায়েন্টের অব্যাহতির আবেদন করেন তিনি। তবে ১৪ দলীয় জোটের শরিক নেতা হিসেবে কোনো দায় ইনু এড়াতে পারেন না বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন। ২৩ অক্টোবর ইনুর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম।

চলতি বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর এ মামলায় ইনুকে ট্রাইব্যুনালে হাজিরের নির্দেশ ছিল। ২৫ সেপ্টেম্বর এই জাসদ সভাপতির বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্টে গণহত্যায় সহযোগিতাসহ সুনির্দিষ্ট আটটি অভিযোগ এনে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। এরপর শুনানিতে আটটি অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়। শুনানি শেষে অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারি করেন আদালত।

গত বছরের ২৬ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন এই জাসদ নেতা। তবে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হিসেবে কুষ্টিয়ায় নিজ আসনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে হেরে যান তিনি।

উল্লেখ্য, জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে কুষ্টিয়া শহরে শহীদ হন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ। আহত হন বহু নিরীহ মানুষ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইনুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়। পরে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা। যাচাই-বাছাই শেষে উসকানি, ষড়যন্ত্রসহ সুনির্দিষ্ট আটটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। তার বিরুদ্ধে দেয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগটি ৩৯ পৃষ্ঠার। সাক্ষী করা হয়েছে ২০ জনকে। এ ছাড়া নথি হিসেবে তিনটি অডিও ও ছয়টি ভিডিও দিয়েছে প্রসিকিউশন।