ট্রাইব্যুনালে জেরায় বিটিসিএল ডিএমডি

ইন্টারনেট বন্ধে পলক ও বিটিআরসির সরাসরি নির্দেশ ছিল

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
  • মানবতাবিরোধী অপরাধ

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালীন ইন্টারনেট শাটডাউন ও এর ফলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)-এর উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা কামাল আহমেদের জেরা সম্পন্ন হয়েছে।

গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে বিটিসিএল-এর এই শীর্ষ কর্মকর্তাকে দীর্ঘ জেরা করেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের আইনজীবী আমিনুল গনি (টিটু)। জেরার পরতে পরতে উঠে আসে সেদিনের ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের নেপথ্য কারিগরদের ভূমিকা ও নির্দেশনার খুঁটিনাটি। জেরার শুরুতে আইনজীবী আমিনুল গনি টিটু ডিজিটাল আলামত ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সাক্ষী মির্জা কামাল আহমেদ জানান, ‘আইআইজি অপারেশন’ নামীয় গ্রুপটি আগে থেকেই সক্রিয় ছিল এবং বিটিসিএল-এর আনোয়ার হোসেন মাসুদ এটি পরিচালনা করতেন। তবে মাহরিন আহসান নামে কেউ গ্রুপটি ত্যাগ করেছিলেন কি না বা মোট সদস্য সংখ্যা কত ছিল, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য তিনি দিতে পারেননি। আইনজীবী প্রশ্ন করেন, প্রদর্শনী-১২ সিরিজের স্ক্রিনশটগুলো কে নিয়েছিলেন? জবাবে সাক্ষী জানান, তার অধীনস্থ আব্দুল ওয়াহাব এগুলো সংগ্রহ করেছিলেন, তবে কোন স্থান বা সময়ে বসে তা নেয়া হয়েছে তা তিনি বলতে পারবেন না। এমনকি সিডিআর (কল রেকর্ড) বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে সাক্ষী জানান, দাখিলকৃত নথিতে কে কোন টাওয়ারের অধীনে ছিল তা উল্লেখ নেই, তাই কল রেকর্ড দেখে কারো অবস্থান নিশ্চিত করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

ইন্টারনেট শাটডাউনের নির্দেশনার সময়রেখা নিয়ে জেরার মুখে সাক্ষী জানান, ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখ বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে বিটিআরসির মৌখিক নির্দেশনায় তিনি আইআইজি বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু করেন। ওই দিন রাত ৮টা ৫৭ মিনিটে তিনি জেনারেল ম্যানেজার সাইদুর রহমানকে (০১৯২....৫৮) ফোন করে চূড়ান্ত নির্দেশনা দেন, যার ২০ মিনিট পর পুরো দেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। আইনজীবী প্রশ্ন করেন, ১৮ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ইন্টারনেট ছিল কি না। জবাবে সাক্ষী বলেন, বিমানবন্দর, হাসপাতাল বা সংসদ ভবনে ইন্টারনেট ছিল কি না তা তার জানা নেই। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, মূল সংযোগ বন্ধ থাকলেও ‘ভিএসএটি’ প্রযুক্তির মাধ্যমে খুব সীমিত পরিসরে ইন্টারনেট চালু রাখা সম্ভব।

জেরার একপর্যায়ে কাঠগড়ায় থাকা সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও তার আইনজীবীর মধ্যে চিরকুট বিনিময় নিয়ে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পলক তার আইনজীবীকে চিরকুট লিখে পাঠালে বিচারক মোহিতুল আলম চৌধুরী বিরক্ত হয়ে তা বন্ধের নির্দেশ দেন। এ সময় পলক মাইক্রোফোন চেয়ে নিয়ে আদালতকে বলেন, ‘মাননীয় আদালত, আমি ইন্টারনেটের কারিগরি বিষয়গুলো কম বুঝি। তাই জেরায় কোনো অসঙ্গতি মনে হলে আমি চিরকুটের মাধ্যমে আইনজীবীকে অবহিত করি।’ বিচারক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাকে চিরকুট দেয়ার অনুমতি প্রদান করেন।

জেরার শেষ অংশে আইনজীবী আমিনুল গনি টিটু সরাসরি দাবি করেন যে, বিটিআরসি থেকে কোনো শাটডাউনের নির্দেশ ছিল না এবং সাক্ষী নিজের দায় এড়াতে সাবেক প্রতিমন্ত্রীর ওপর দায় চাপাচ্ছেন। এর জবাবে সাক্ষী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘ইহা সত্য নহে। বিটিআরসি এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক উভয়ে আমাকে সরাসরি নির্দেশনা দিয়েছিলেন।’ তিনি আরো পরিষ্কার করেন যে, ওই দিন রাত ৭টা ৪৫ মিনিটে বিটিআরসি হোয়াটসঅ্যাপে এবং ৮টা ৪৫ মিনিটে মহাপরিচালক সরাসরি ফোনে তাকে নির্দেশ দেন।

আইনজীবী প্রশ্ন করেন, পলকের নির্দেশনার আগেই কি তিনি শাটডাউন করেছিলেন? জবাবে সাক্ষী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, পলকের নির্দেশ পাওয়ার পরেই তিনি পরবর্তী ব্যবস্থা নিয়েছেন। পরিশেষে সাক্ষী অস্বীকার করেন যে তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পলকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছেন; বরং তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে জুলাইয়ের সেই হত্যাযজ্ঞের সময় ইন্টারনেট বন্ধে সাবেক প্রতিমন্ত্রীর ভূমিকা ছিল সন্দেহাতীত।

এই মামলায় পরবর্তী সাক্ষীর জবানবন্দী নেয়া হবে আগামী ৩ মে। সেদিন আন্দোলনের সময়ে যে ভবনে আগুন লাগানো হয়েছিল বলে প্রচার করা হচ্ছে, সেই ভবনটির মালিক সাক্ষী দেবেন বলেন নয়া দিগন্তকে প্রসিকিউশনের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

মামলায় পলক ছাড়াও অন্যতম প্রধান আসামি হিসেবে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনি বর্তমানে পলাতক থাকায় ট্রাইব্যুনালে তার হয়ে আইনি লড়াই করছেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী (স্টেট ডিফেন্স) মনজুর আলম।