চাই বাবা-মা যেন সন্তানদের খেলোয়াড় বানান : আমিনুল

Printed Edition

ক্রীড়া প্রতিবেদক

দায়িত্ব পেলেই সবার সাথে বসাটা নতুন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীদের একটা রেওয়াজ হয়ে গেছে। বিভিন্ন ফেডারেশন এবং ক্রীড়া সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন, তাদের মতামত জানেন। নতুন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকও গতকাল বিভিন্ন গণমাধ্যমের ক্রীড়া সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করেন। জাতীয় দলের সাবেক এই গোলরক্ষক এবং অধিনায়ক নিজের মতামত দিয়েছেন। আবার মিডিয়া কর্মীদের বক্তব্য শুনেছেন। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে দুই ঘণ্টার এই মতবিনিময় সভা শেষে আমিনুল হক জানান, ‘সব বাবা-মা চান তার ছেলেমেয়েরা যেন লেখাপড়া শেষে ডাক্তার হোক। ইঞ্জিনিয়ার হোক। কিন্তু কেউ বলেন না তা ছেলে যেন খেলোয়াড় হয়। তবে আমরা সেই চিন্তা চেতনায় পরিবর্তন আনতে চাই। ক্রীড়াঙ্গনে এমন পরিবেশ আনতে চাই যাবে সব বাবা-মা চাইবে তার সন্তানরা যেন খেলোয়াড় হয়। লক্ষ্য খেলাকে যেন পেশা হিসেবে নিতে পারে ছেলেমেয়েরা।’ সে সাথে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের বেতনের আওতায় আনার কথা জানান তিনি। মন্ত্রী আরো জানান, দেশের ৪৯৫টি উপেজলায় ক্রীড়া অফিসার নিয়োগ দেয়া হবে। সাবেক খেলোয়াড়রাই পাবেন এই চাকরি। কারো বয়স বেশি হয়ে গেলে তাকে চুক্তি ভিত্তিতে নেয়া হবে। বলেন, আমি রাতারাতি কিছু বদল করতে পারব না। তবে পরিবর্তনের শুরুটা করে দিতে চাই।’ এর আগে আমিনুল ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদের স্মরণ করেন।

মাঠের মানুষ আমিনুল। দেশের সব বড় ক্লাবে খেলেছেন। ইনজুরির সাথে সংগ্রাম করে আবার জাতীয় দলে ফিরেছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২০০৩ সাফ ফুটবলে বাংলাদেশকে চ্যাম্পিয়ন করাতে ভূমিকা রেখেছেন। ২০১০ সালের এসএ গেমসে বাংলাদেশ দলকে স্বর্ণ এনে দিতেও তার অসামান্য অবদান। এরপর রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়েছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ক্রীড়া সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনীতির পাশাপাশি খেলাধুলা আয়োজন করেছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ক্রিকেট ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করেছেন। সারা দেশের বিভিন্ন দুস্থ এবং প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের আর্থিকসহায়তার ব্যবস্থা করেছেন। ফলে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের অধিকাংশ সমস্যা সম্পর্কে অবগত তিনি। আগে ক্ষমতার বাইরে থেকে সমস্যা দেখেছেন। এখন নিজেই ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। তাই এই সমস্যার সমাধানে আরো সক্রিয়ভাবে কাজ করার সুযোগ তার সামনে। এই অংশ হিসেবে মতামত নিলেন ক্রীড়া সাংবাদিকদের।

প্রথমেই মিডিয়া কর্মীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার কথা জানান তিনি। বলেন, ‘আমি সকল গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চাই। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সুন্দর ক্রীড়াবান্ধব পরিবেশ গড়ার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। উনার সাথে আমার এই বিষয়ে কথা হয়েছে।’ আমিনুল হক আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের শাসনামল এবং বিগত সরকারের দেড় বছরে ক্রীড়াঙ্গনের অবস্থার কথা তুলে ধরেন। এরপর জানান, আমরা শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক ক্রীড়াঙ্গনকে রাখতে চাই না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত এই খেলাকে ছড়িয়ে দিতে চাই। উপজেলা ক্রীড়া সংস্থাকেও আরো সক্রিয় করতে চাই। সাংবাদিকদের দাবি ছিল জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে অনুদানের টাকা আরো বাড়িয়ে দেয়ার। এ ছাড়া পরীক্ষিত ক্রীড়া সংগঠকদের বিভিন্ন জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও ফেডারেশনের সাথে সম্পৃক্ত করার দাবি জানান মিডিয়া কর্মীরা।

দেশের মাঠের সঙ্কট। তা ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে। কিছু মাঠ আছে স্কুল কেন্দ্রিক। কিন্তু সেই মাঠ গুলো স্কুল কর্তৃপক্ষ স্কুল বন্ধের সাথে সাথে মাঠের গেটগুলো বন্ধ করে দেয়। এতে এলাকার ছেলেদের খেলার শেষ স্থান টুকুও বন্ধ থাকে। সাংবাদিকদের দাবি এই মাঠগুলো যেন সন্ধ্যা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকে সর্বসাধারণের জন্য। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী সাথে সাথেই জানান, ‘আমাদের নির্দেশনা থাকবে এই মাঠগুলো যেন সন্ধ্যা পর্যন্ত খেলার জন্য উন্মুক্ত থাকে।’ সাথে উল্লেখ করেন ঢাকা সিটি করপোরেশনের কয়েকটি ওয়ার্ডকে একত্রিত করে সেখানে খেলার মাঠ করা যায় কি না তা ব্যাপারে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। সে সাথে জেলা পর্যায়েও স্পোর্টস ভিলেজ করার জন্য জায়গা খোঁজার কথা বলেন আমিনুল। ফুটবলে হামজা চৌধুরীর মতো প্রবাসী ফুটবলারের আগমনের কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেন তিনি।

এসএ গেমস, কমনওয়েলথ গেমস, এশিয়ান গেমস এবং অলিম্পিক গেমস। এই গেমসগুলোর মধ্যে এসএ গেমসে কিভাবে আরো ভালো করা যায় সে বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। একই সাথে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী দলীয় ডিসিপ্লিনের সাথে ব্যক্তিগত যেসব ডিসিপ্লিনের সম্ভাবনা আছে এর উপর গুরুত্ব দেন। ব্যক্তিগত ডিসিপ্লিনের মধ্যে শ্যুটিং ও আরচ্যারিকে বেশি গুরুত্ব দেয়ার উপর জোর দেন মিডিয়া কর্মীরা।

বর্তমান সরকার প্রত্যেক স্কুলে চতুর্থ শ্রেণী থেকে পাঁচটি ডিসিপ্লিনের খেলা বাধ্যতামূলক করার কথা জানান। কোন পাঁচটি ডিসিপ্লিন হবে সে বিষয়ে বিভিন্ন মতামত এসেছে। ফুটবল, ক্রিকেটের পাশে হকিও গুরুত্ব পেয়েছে। এই ডিসিপ্লিনগুলো চূড়ান্ত করণে একটি কমিশন গঠনেরও কথা বলেন সাংবাদিকরা।

নিজস্ব মাঠ থাকা সত্ত্বেও হকি নিয়মিত আয়োজন করতে পারছে না লিগ। তিন-চার বছর পর পর টার্ফে গড়াচ্ছে হকি লিগ। অথচ এই হকিই সর্বশেষ অনূর্ধ্ব-২১ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছে- সেটাও নজরে আনা হয় ক্রীড়ামন্ত্রীর।

স্টেডিয়ামগুলোর দোকান ভাড়া বাবদ ভয়াবহ দুর্নীতি হচ্ছে। ক্রীড়া পরিষদের ভাণ্ডারে মাসে ভাড়া বাবদ জমা পড়ে ১০ হাজার টাকা করে। অথচ আসলে ভাড়া দেয়া হয় এক লাখ টাকার উপরে। সাংবাদিকদের কাছ থেকে এই তথ্য জেনে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী নড়েচড়ে বসেন। মিডিয়া কর্মীদের দাবি, এই দুর্নীতি বন্ধ করে এই টাকা বিভিন্ন ফেডারেশনকে অনুদান হিসেবে দেয়ার।

মিডিয়াকর্মীদের প্রস্তাব ছিল ক্রীড়া পরিষদে টেকনিক্যাল পদে সাবেক কোনো খেলোয়াড়কে দায়িত্ব দেয়া। যাতে যারা খেলা বুঝেন তারাই যেন এই দায়িত্বে থাকেন। জাতীয় স্টেডিয়াম কমপ্লেক্সে রাতের বেলায় যে কেউ হাঁটতে ভয় পান। নেশাখোরদের দখলে চলে যায়। দ্রুত এই এই সমস্যার সমাধানে আশ্বাস দেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী।