পতন থেমে মিশ্র আচরণ পুঁজিবাজার সূচকের

মুনাফায় প্রবৃদ্ধি ধরে রাখছে রবি অজিয়াটা

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

অবশেষে পতনের ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে পুঁজিবাজার। টানা চারটি কর্মদিবসে সূচক পতনের পর গতকাল সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে এসে পতন থামল। তবে লেনদেনে সময়ের একটি বড় অংশজুড়েই বিক্রয়চাপে একপ্রকার অস্থির ছিল দেশের দুই পুঁজিবাজার। দিনশেষে ঢাকা শেয়ারবাজারে সূচকের আচরণ ছিল মিশ্র। তবে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে সব সূচকেরই অবনতি ঘটে। উভয় বাজারেই লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানি ও ফান্ডের বেশির ভাগই দর হারায়।

আগের সপ্তাহে সূচকের টানা পতনের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে গতকালও লেনদেনের শুরুতে বিক্রয় চাপে ছিল বাজারগুলো। তবে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের ফলে প্রথম দিকের এ চাপ দ্রুতই সামলে নেয় পুঁজিবাজারগুলো। প্রথম ৫ মিনিটের মধ্যেই ঢাকা শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স পৌঁছে যায় ৫ হাজ্রা ৪৭৭ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকটির ১২ পয়েন্টে উন্নতি রেকর্ড করা হয়। লেনদেনের এ পর্যায়ে পুনরায় বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হলে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সূচকটি নেমে আসে ৫ হাজার ৪৪৭ পয়েন্টে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সূচকটি ফের ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে। টানা এক ঘণ্টা এ প্রবণতা টিকে থাকলে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ডিএসই সূচক পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৪৯১ পয়েন্টে। এটিই ছিল গতকাল পুঁজিবাজারটির সূচকের সর্বোচ্চ অবস্থান।

তবে লেনদেন যতই এগিয়ে যাচ্ছিল নতুন করে সৃষ্টি হচ্ছিল বিক্রয়চাপ। এ পর্যায়ে দর হারাচ্ছিল কিছুক্ষণ আগে মূল্যবৃদ্ধি ঘটা কোম্পানিগুলো। বেলা পৌনে ১টা পর্যন্ত এ চাপ অব্যাহত থাকলে ডিএসই সূচক নেমে আসে ৫ হাজার ৪৪২ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকটির অবনতি ঘটে ২৩ পয়েন্ট। আর এটিই ছিল গতকাল সূচকটির সর্বনি¤œ অবস্থান। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফের ঊর্ধ্বমুখী আচরণ দেখা যায় ডিএসই সূচকে। দিনের বাকি সময় আর বড় কোনো বিক্রয়চাপ সৃষ্টি না হলে প্রধান সূচকটি ১ দশমিক ৯১ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ দশমিক ৩২ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হলেও ডিএসই শরিয়াহ দশমিক ৩০ পয়েন্ট হারায়। তবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সব সূচকের কমবেশি অবনতি ঘটে। এখানে প্রধান সূচক সিএএসপিআই ৪৬ দশমিক ৭২ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৩ দশমিক ২১ ও ১৬ দশমিক ৩১ পয়েন্ট।

এ দিকে তালিকাভুক্ত টেলিযোগাযোগ খাতের বহুজাতিক কোম্পানি রবি আজিয়াটা পিএলসি মুনাফার প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছে। সর্বশেষ ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২৫ হিসাব বছরে মুনাফা বেড়েছে ৩৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ। আলোচ্য হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য ১৭ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে কোম্পানিটির পর্ষদ। ডিএসই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক মূল্যসংবেদনশীল তথ্যের মাধ্যমে বিষয়টি জানিয়েছে টেলিযোগাযোগ খাতের কোম্পানিটি।

প্রকাশিত তথ্যানুসারে, সমাপ্ত ২০২৫ হিসাব বছরে রবি আজিয়াটার শেয়ারপ্রতি সমন্বিত আয় (ইপিএস) হয়েছে ১ টাকা ৭৯ পয়সা, আগের হিসাব বছরে যা ছিল ১ টাকা ৩৪ পয়সা। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ১৩ টাকা ৩৪ পয়সায়। এর আগে ২০২৪ হিসাব বছরেও বিনিয়োগকারীদের ১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে কোম্পানিটির পর্ষদ। আগের বছরে রবি আজিয়াটার ইপিএস হয়েছে ১ টাকা ৩৪ পয়সা। একই সময় কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ছিল ১৩ টাকা ৮ পয়সা।

ডিএসই থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে কোম্পানিটি ২০২৩ অর্থবছরে ১০ শতাংশ ও ২০২২ অর্থবছরে ৭ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয় বিনিয়োগকারীদের। এবং এ সময়ের প্রতি বছরই তাদের শেয়ারপ্রতি আয় শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০২০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রবি আজিয়াটার অনুমোদিত মূলধন ৬ হাজার কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ৫ হাজার ২৩৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। সে হিসাবে এটিই দেশের পুঁজিবাাজারে তালিকাভুক্ত সবচেয়ে বড় মূলধনের কোম্পানি। মোট শেয়ার সংখ্যা ৫২৩ কোটি ৭৯ লাখ ৩২ হাজার ৮৯৫। এর ৯০ শতাংশই রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ২ দশমিক ৫০ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে বাকি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। রিজার্ভে রয়েছে ১ হাজার ৬২২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

কোম্পানিটির প্রবৃদ্ধির এ ধারাবাহিকতা ধীরে হলেও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে। গতকাল কোম্পানিটি দুই পুঁজিাবাজারেই লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির তালিকায় জায়গা করে নেয়।

গতকাল ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানি অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ। ৩৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকায় ২৩ লাখ ৭৭ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় কোম্পানিটির। ২৩ কোটি ৬২ লাখ টাকায় ২৭ লাখ ৭১ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে ব্র্যাক ব্যাংক ছিল দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসই’র লেনদেনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সিটি ব্যাংক, রবি অজিয়াটা, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, সায়হাম কটন মিলস, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট।

দিনের মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল বস্ত্র খাতের কোম্পানি সোনারগাঁও টেক্সটাইল। কোম্পানিটির ৯ দশমিক ০১ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গতকাল। ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, ইন্দো বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এবি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ইবিএল এনআরবি মিউচুয়াল ফান্ড, পপুলার লাইফ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট।

এ সময় ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষে ছিল ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ। কোম্পানিটির দরপতনের হার ছিল ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় স্থানে ছিল এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। ডিএসইর দরপতনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ফার কেমিক্যালস, ন্যাশনাল ব্যাংক, ফ্যামিলিটেক্স, ইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, আলহাজ টেক্সটাইলস, শ্যামপুর সুগার মিলস, আইসিবি থার্ড এনআরবি মিউচুয়াল ফান্ড ও তুং হাই টেক্সটাইলস।