মার্কিন চাপ বাড়ায় ভেনিজুয়েলা ছাড়ছে কিউবান নিরাপত্তাবাহিনী

Printed Edition

রয়টার্স

অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সরকারের ওপর ওয়াশিংটনের তুমুল চাপের মুখে কিউবার নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও চিকিৎসকরা ভেনিজুয়েলা ছাড়ছেন। বিষয়টি সম্বন্ধে জ্ঞাত ১১টি স্ত্রূ রয়টাসর্কে এ খবর জানিয়েছে।

ভেনিজুয়েলা-কিউবা, লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী এ বাম ঘরানার জুটিটি ভেঙে দেয়ার চেষ্টার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল চাপের মুখেই এ ঘটনা ঘটছে।

যে কারণে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজও এখন তার সুরক্ষার দায়িত্ব ভেনিজুয়েলার দেহরক্ষীদের হাতেই সঁপেছেন বলে জানিয়েছে চারটি সূত্র। অথচ তার পূর্বসূরী দুই প্রেসিডেন্ট গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে অপহৃত নিকোলাস মাদুরো ও পরলোকগত গুগো শ্যাভেজ, দু’জনই তাদের নিরাপত্তার জন্য কিউবার বিশেষ বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।

গত ৩ জানুয়ারি মার্কিন বাহিনী ভেনিজুয়েলা থেকে মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় ৩২ কিউবানকে হত্যা করে বলে কিউবার সরকারের দেয়া তথ্য বলছে। এই ৩২ সেনা ও দেহরক্ষীরা ছিলেন ২০০০-এর দশকের শেষ দিকে হাভানা ও কারাকাসের মধ্যে যে নিবিড় নিরাপত্তা চুক্তির যাত্রা শুরু হয়েছি তারই অংশ। ওই চুক্তির আওতায় কিউবার গোয়েন্দা সংস্থার কর্মীরা ভেনিজুয়েলার সামরিক বাহিনী ও খুবই প্রভাবশালী গোয়েন্দা ইউনিট ডিজিসিআইএমের সর্বত্র ঢুকে পড়ার সুযোগ পেয়েছিল। সরকারবিরোধী তৎপরতা দমনে এই ডিজিসিআইএম-ই ছিল মূল ভূমিকায়।

‘চাভিস্তা সরকারের টিকে থাকার জন্য কিউবার প্রভাব অপরিহার্য ছিল’ বলেছেন নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক ও ভেনিজুয়েলা বিশেষজ্ঞ আলেহান্দ্রো ভেলাসকো। এখন ডিজিসিআইএমের ভেতরেও কিছু কিউবান উপদেষ্টাকে তাদের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভেনিজুয়েলার সাবেক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অনেক কিউবান চিকিৎসাকর্মী ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা বিমানে করে ভেনিজুয়েলা থেকে কিউবায় ফিরেছেন বলে জানিয়েছে দু’টি সূত্র। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে রদ্রিগেজের নির্দেশেই ওই কিউবানরা ভেনিজুয়েলা ছেড়েছেন বলে দাবি করেছে ভেনিজুয়েলার ক্ষমতাসীন পার্টির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র। এ কিউবানদের ভেনিজুয়েলার নতুন সরকারই দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে, নাকি তারা নিজের তাগিদেই ভেনিজুয়েলা ছেড়েছেন, অথবা হাভানাই তাদের ডেকে পাঠিয়েছে কি না অন্য সূত্রগুলো এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে কিছু জানাতে পারেনি। প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাহিনী ও গোয়েন্দা ইউনিট থেকে কিউবানদের সরিয়ে দেয়ার খবর আগে জানা যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে উৎখাত করার আগে, শ্যাভেজ আমলের কল্যাণমূলক কর্মসূচির অংশ হিসেবে হাজার হাজার কিউবান চিকিৎসক, নার্স ও খেলাধুলার প্রশিক্ষক ভেনিজুয়েলায় কাজ করতেন। এর বিনিময়ে ভেনিজুয়েলা কিউবায় তেল পাঠাত। জানুয়ারিতে কারাকাসে মার্কিন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবা-ভেনিজুয়েলার এ নিরাপত্তা সম্পর্ক গুঁড়িয়ে দেয়ার অঙ্গীকার করেন।

‘ভেনিজুয়েলার বিপুল অর্থ ও তেলের ওপর কিউবা অনেক বছর ধরে বেঁচেছিল। এর পরিবর্তে কিউবা ভেনিজুয়েলার শেষ দুই স্বৈরশাসককে ‘নিরাপত্তা সেবা’ দিয়েছিল, কিন্তু আর সেটি হবে না,” ১১ জানুয়ারি ট্রুথ সোশালে এমনটাই লিখেছিলেন ট্রাম্প।

কিউবার সাথে সম্পর্ক ছিন্নে ভেনিজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ভেনিজুয়েলার এখনকার নেতাদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক খুবই ভালো। ‘রদ্রিগেজের নিজের স্বার্থও যে আমাদের মূল লক্ষ্যগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, ওয়াশিংটন তা বিশ্বাস করে,’ বলেছেন তিনি। হাভানার কমিউনিস্টশাসিত সরকার উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্রের যে বিস্তৃত কৌশল রয়েছে, তার অংশ হিসেবেই তারা কিউবার সাথে ভেনিজুয়েলার সম্পর্কে ছেদ ঘটাতে চাইছে। গত বছরের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে ওয়াশিংটন কিউবায় ভেনিজুয়েলার তেল পাঠানোতেও অবরোধ দিয়ে রেখেছে, যা ক্যারিবীয় দ্বীপটিকে অর্থনৈতিকভাবে আরো নাজুক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে।

‘যুক্তরাষ্ট্র সরকার কিউবার সাথে কথা বলছে, দেশটির নেতাদের একটি চুক্তিতে পৌঁছানো উচিত’ বলেছেন ওই কর্মকর্তা। তেল অবরোধের নিন্দা এবং মার্কিন হস্তক্ষেপ প্রতিহতের অঙ্গীকার করা কিউবার সরকার বলেছে, তারা সমান শর্তে সংলাপে বসতে রাজি।

এসব বিষয়ে রয়টার্স মন্তব্য চাইলেও কিউবা বা ভেনিজুয়েলার সরকার তাতে সাড়া দেয়নি। দুই দেশ অবশ্য প্রকাশ্যে তাদের সম্পর্ক আরো মজবুত করার অঙ্গীকার নিয়মিতই ব্যক্ত করে যাচ্ছে। সাবেক এক মার্কসবাদী গেরিলার মেয়ে রদ্রিগেজ ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মাদুরোর দীর্ঘদিনের মিত্র এবং ভেনিজুয়েলার ক্ষমতাসীন সোশালিস্ট পার্টির প্রভাবশালী সদস্য। তার সাথে ব্যক্তিগতভাবেও কিউবা সরকারের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে, বলেছে ভেনিজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি সূত্র। কারাকাসে গত ৮ জানুয়ারি মার্কিন হামলায় নিহতদের ফুল দিয়ে স্মরণের এক অনুষ্ঠানেও ডেলসি রদ্রিগেজকে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজের পাশে দেখা গেছে। ‘সাহসী ভেনিজুয়েলার জনগণের প্রতি আমরা কিউবার গভীরতম সংহতি প্রকাশ করছি।