ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ

পুতিনের সফর পশ্চিমাদের চোখে ভারতের তাৎপর্য কমাতে পারে

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সাম্প্রতিক ভারত সফরকে ঘিরে ভারতীয় গণমাধ্যমে উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও দ্য ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ বলছে- এই সফর কৌশলগত বাস্তবতার পরিবর্তে প্রতীকীকরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে বরং পশ্চিমা বিশ্বে ভারতের অবস্থানকে আরো জটিল করতে পারে। এই সফর বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার বদলে, পশ্চিমাদের চোখে তার গুরুত্ব কমিয়ে দিতে পারে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে যেন পুতিন-মোদি বৈঠককে একটি ‘মহাশক্তির জোট’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে মোদির কূটনৈতিক পদক্ষেপকে চাণক্য-শৈলী কৌশলের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূতরা টাইমস অব ইন্ডিয়ায় যৌথভাবে একটি উপ-সম্পাদকীয় লিখে পুতিন ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে তীব্র সমালোচনা করেন। পাল্টা হিসেবে একই পত্রিকায় রুশ রাষ্ট্রদূতের জবাব লেখাটি বিষয়টিকে কূটনৈতিক বিবাদে রূপ দেয়।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতদের নিবন্ধকে ‘অস্বাভাবিক ও অকূটনৈতিক’ মন্তব্য করে বিরক্তি প্রকাশ করে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিরোধ পশ্চিমা শক্তিগুলোর অসন্তোষের স্পষ্ট সঙ্কেত, যা ভারতের জন্য মোটেও শুভ নির্দেশনা নয়।

বাণিজ্যে রেকর্ড, কিন্তু কাঠামো দুর্বল : দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ৬৯ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড ছুঁয়েছে- কিন্তু ভারসাম্যহীনতায় তা কার্যত ভারতের জন্য ঝুঁকি। ভারত রাশিয়ায় রফতানি করে মাত্র পাঁচ বিলিয়ন ডলার পণ্য; বিপরীতে আমদানি করে ৬৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি- প্রধানত অপরিশোধিত তেল। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬০ বিলিয়ন ডলারে।

যদিও আশা ছিল- পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মাঝেও রাশিয়ার জ্বালানি প্রবাহ নিশ্চিত করার রোডম্যাপ এবং ভারতের রফতানি বাড়ানোর পথ তৈরি হবে- কিন্তু চূড়ান্ত বিবৃতিতে তেমন কোনো বড় চুক্তি হয়নি। পুতিন শুধু জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা কিছুটা আশ্বাসবহ হলেও সীমিত।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় ‘বড় প্রত্যাশা-ছোট অর্জন’ : রাশিয়ান প্রযুক্তির ওপর ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গভীর নির্ভরশীলতা রয়েছে- এস-৪০০ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র, মিগ ও সুখোই যুদ্ধবিমান এর প্রমাণ।

সফরকে ঘিরে ধারণা ছিল-

  • এস-৫০০ বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা,
  • পঞ্চম প্রজন্মের এস-৫৭ যুদ্ধবিমান,
  • বা যৌথ উৎপাদনসহ উন্নয়ন,

এসব বিষয়ে বড় ঘোষণা আসতে পারে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া- ট্যারিফ বৃদ্ধি, নতুন নিষেধাজ্ঞা বা কাটসা আইনের প্রয়োগ- বিবেচনায় রেখে দিল্লি সতর্ক থেকেছে। ফলে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের দাবি থাকলেও বাস্তবে ভারত ‘ঝুঁকি-নিয়ন্ত্রিত কূটনীতি’ করেছে।

অর্থনীতি-শ্রম-কারিগরি ক্ষেত্রে কিছু সুযোগ

সফরে কিছু বাস্তব অগ্রগতিও রয়েছে-

  • রাশিয়ায় ভারতীয় শ্রম ও দক্ষ কর্মী পাঠানোর নতুন উদ্যোগ
  • প্রতিরক্ষা-বহির্ভূত উৎপাদন সহযোগিতা
  • ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়নের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির অগ্রগতি

এগুলো ভারতের জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু কেন পশ্চিমা বিশ্বের চোখে ভারতের গুরুত্ব কমতে পারে? বিশ্লেষকদের মতে, সফরটি বিশ্ব ক্ষমতার ভারসাম্যে নাটকীয় পরিবর্তন আনবে না।

১. রাশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তি দুর্বল : রাশিয়ার অর্থনীতি মাত্র দুই ট্রিলিয়ন ডলার- বিশ্বব্যাপী জিডিপির মাত্র ২%। অন্য দিকে পশ্চিমা ব্লক (যুক্তরাষ্ট্র+ইউরোপ) বিশ্ব জিডিপির প্রায় ৪৫% নিয়ন্ত্রণ করে।

এই বাস্তবতায় পশ্চিমা অসন্তোষকে চ্যালেঞ্জ করে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে যাওয়া ভারতের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

২. পশ্চিমাদের আস্থায় ক্ষয় : বিশেষত ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতদের অসন্তোষ স্পষ্ট করে- ভারতকে তারা কম নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।

৩. ট্রাম্প বা শি জিনপিং- কেউই হয়তো বিশেষভাবে প্রভাবিত হবেন না

সফরের প্রতীকী ছবি বা ভাষণ হয়তো কৌশলগত সঙ্কেত দিয়েছে, কিন্তু বড় শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক হিসাব পাল্টানোর মতো শক্তি দেখাতে পারেনি।

পুতিন-মোদি বৈঠক দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক পুনর্ব্যক্ত করেছে ঠিকই, তবে সম্পর্কের সীমাবদ্ধতার দিকটিও উন্মোচিত করেছে। বাণিজ্য ঘাটতি, কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং পশ্চিমা অসন্তোষ- সব মিলিয়ে সফরটি ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন জটিলতা সৃষ্টি করেছে।